পুতিন বলেন, সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়ে যেসব সামরিক ইউনিট লুহানস্কের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার লড়াই করেছে, যুদ্ধসক্ষমতা বাড়াতে হলে এখন অবশ্যই তাদের বিশ্রাম নিতে হবে।

ইউক্রেনের একজন শীর্ষ প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক আল–জাজিরাকে বলেন, লুহনাস্কের নিয়ন্ত্রণ নিতে রুশ সেনারা দুই মাস ধরে যুদ্ধ করে যে কতটা ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত, এটা তারই নমুনা।

ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফ অব আর্মড ফোর্সেসের সাবেক উপপ্রধান ইহোর রোমানেঙ্কো আল–জাজিরাকে বলেন, এই ক্ষতি অনেক মারাত্মক। এ কারণে রাশিয়া তাদের যুদ্ধের ময়দান থেকে সরিয়ে নিচ্ছে। পুনরায় দল গঠন করে তাদের অন্য জায়গায় পাঠানো হচ্ছে।

default-image

লুহানস্কের গভর্নর সেরহেই হাইদাই টেলিগ্রামে বলেছেন, দখলদারেরা (রাশিয়া) সম্ভবত তাদের সমস্ত বাহিনীকে লাইসিচানস্ককে (জবরদখল করার জন্য) সেখানে পাঠিয়েছিল। লুহানস্কে এখন পর্যন্ত যে শহরটি ইউক্রেনীয় বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেটি লাইসিচানস্ক। তিনি বলেন, নৃশংস কৌশল নিয়ে তারা শহরটিতে হামলা চালায়। এতে শহরটির বেশির ভাগ প্রশাসনিক ভবন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে বলেও জানান তিনি। অন্যদিকে, লুহানস্কে রাশিয়াকে যে সামরিক মূল্য দিতে হয়েছে, তা নিয়ে সন্দেহ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসির চিন্তন প্রতিষ্ঠান জেমসটাউন ফাউন্ডেশনের রাশিয়াভিত্তিক সামরিক বিশ্লেষক পাভেল লুজিন আল–জাজিরাকে বলেন, এভাবে দখল করার কোনো মানে হয় না। বহুসংখ্যক সেনা হারিয়ে রাশিয়া মরুভূমি ছাড়া তেমন কিছুই তো পায় না।

ইউক্রেনে হামলা চালানোর দুই দিন আগে দনবাসের দুই স্বঘোষিত প্রজাতন্ত্র লুহানস্ক ও দোনেৎস্কের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের স্বাধীন হিসেবে স্বীকৃতি দেয় রাশিয়া। গত এপ্রিলের শুরুতে পুতিন বলেন, তাদের (বিচ্ছিন্নতাবাদীদের) ‘স্বাধীনতা’ ক্রেমলিনের নতুন অগ্রাধিকার। রুশ বাহিনী ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ ঘেরাও ও প্রবেশ করতে ব্যর্থ হওয়ার পর এবং পুরো উত্তর ইউক্রেন থেকে তাদের প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর পুতিন এমন ঘোষণা দেন।

লুহানস্কে ইউক্রেন–নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর বেশির ভাগ কৃষিজমি, যা বনজঙ্গল ও চারপাশে সেভেরস্কি দোনেৎস নদীবেষ্টিত। ইউক্রেনীয় সেনারা সেখানে অবারিতভাবে আগুন লাগিয়েছিলেন। এ কারণে এটি অতিক্রম করা রুশ বাহিনীর জন্য ছিল কঠিন ও প্রাণঘাতী।

ভারী কামান দিয়ে ইউক্রেনীয় সেনা অবস্থানে হামলা ও দিনে সর্বোচ্চ এক বা দুই কিলোমিটার অগ্রসর হওয়ার পরই রুশ বাহিনী লিসিচানস্ক দখল করতে সফল হয়েছিল। যদিও তারা লিসিচানস্কের কয়েক কিলোমিটার দক্ষিণে ইউক্রেনীয় সৈন্যদের একটি বৃহৎ দলকে ঘিরে ফেলতে ব্যর্থ হয়। পরে পিছু হটে। প্রচণ্ড গোলাবর্ষণের মুখে বেশির ভাগ সেনাকে হেঁটে দোনেৎস্কের সেভারস্ক ও বাখমুতের চারপাশের পাহাড়ে ফিরতে হয়। রুশ সেনাবাহিনীর জন্য দোনেৎস্কে আরও জটিল ও বিপজ্জনক পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে।

দোনেৎস্কের প্রায় অর্ধেক অঞ্চল এখনো ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। রুশ সীমান্তবর্তী এ এলাকায় প্রতিরক্ষাব্যূহ তৈরি করতে প্রায় আট বছর সময় ব্যয় করেছে ইউক্রেন সরকার।

default-image

সামরিক বিশেষজ্ঞ রোমানেঙ্কো বলছেন, দোনেৎস্কে আসন্ন হামলা চালাতে হাজারো সেনা নিয়ে কাজ করছে রাশিয়া। তবে তাদের কাছে পর্যাপ্ত সেনা ও রিজার্ভ সেনা নেই। তাই ইউক্রেনের অন্যান্য অঞ্চলে রুশ বাহিনীকে মোকাবিলায় সফল হচ্ছে ইউক্রেন।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির জন্মস্থান ক্রিভিরিভ অঞ্চলের দখল নিয়েছে রুশ বাহিনী। ক্রিভিরিভের মধ্যাঞ্চলে পাল্টা হামলা চালাতে শুরু করেছে কিয়েভ।

রাশিয়ার দখলকৃত ক্রিমিয়া উপদ্বীপসংলগ্ন দক্ষিণ ইউক্রেনের একটি প্রধান অঞ্চল খেরসনের গত মার্চের শুরুতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেয় রাশিয়া। পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে অঞ্চলটির বেশ কিছু গ্রাম আবার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে ইউক্রেনীয় বাহিনী।

রাশিয়ার সেনারা কৃষ্ণসাগরে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান স্নেক (জামিনি) আইল্যান্ড থেকেও চলে গেছেন। যুদ্ধের প্রথম দিনে সেখানে ইউক্রেনের সেনারা অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে রাশিয়ার একটি যুদ্ধজাহাজকে সেখান থেকে ফেরত পাঠিয়েছিলেন।

রোমানেঙ্কো বলছেন, তাদের জন্য এটা একটা যৌথ প্রক্রিয়া। একদিকে তারা দোনেৎস্কের দিকে আরও অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে খেরসনকে আবার দখলে না নিতে রুশ বাহিনীকে ঠেকানোর চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, প্রধান বাধা হচ্ছে রাশিয়ার যুদ্ধসক্ষমতার বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে ইউক্রেনের অক্ষমতা। কারণ, অস্ত্র সরবরাহের জন্য তারা পশ্চিমের ওপর পুরো নির্ভরশীল।

ইউক্রেনের এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ভারী কামান। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি হিমারস (হাই মোবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেম বা এইচআইএমএআরএস)।

প্রতিটি হিমারসে রয়েছে ছয়টি ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট। যেসব ক্ষেপণাস্ত্র ৩০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্য আঘাত হানতে সক্ষম। শুধু তা–ই নয়, নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে এটি বেশ সক্ষম।

ইউক্রেনের কাছে হিমারস সরবরাহ করায় এর প্রশংসা করে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, এসব (হিমারস) কিয়েভের প্রতি ওয়াশিংটনের সহযোগিতার সর্বোত্তম উদাহরণ।

কিন্তু ইউক্রেনকে হিমারস দিলেও এর সীমাও বেঁধে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইউক্রেন যেসব হিমারস পেয়েছে, তা দিয়ে ৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত হামলা করতে পারবে। এর কারণ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের ভয় হিমারস দিয়ে ইউক্রেন না আবার রাশিয়ার ভূখণ্ডে বোমা হামলা করে।

রোমানেঙ্কো বলছেন, দখলকৃত অথবা বিচ্ছিন্নতাবাদী নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোয় ইতিমধ্যে হিমারস দিয়ে একাধিক গোলাবারুদের গুদাম ধ্বংস করে দিয়েছে ইউক্রেনের সেনারা। কিন্তু রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ১২০ কিলোমিটার দূরে আঘাত হানতে পারে। এতে করে হিমারস হাতে পেলেও রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্রের কাছে তা অকার্যকর। তিনি বলেন, দুই পক্ষের সামরিক সক্ষমতা যখন সমান হবে, একমাত্র তখনই শত্রুদের রুখে দেওয়া সম্ভব হবে। এটা তখনই ঘটবে, যখন (ইউক্রেন) বিপুল পরিমাণ অস্ত্র সরবরাহ পাবে।

default-image

যদিও রাশিয়ার আরও বেশি ক্ষতি হয়েছে; বিপুল পরিমাণ সেনাসমাবেশের ঘোষণা দিতে ভয় পাচ্ছে ক্রেমলিন। এ ছাড়া পদাতিক বাহিনীর সেনা ও সামরিক সরঞ্জামের সংকট ও যুদ্ধবিমানের ব্যবহার খুব কম হওয়ায় রাশিয়ার প্রত্যাশিত অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করা হয়।

ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন