default-image

ব্যক্তিগত সম্পদ গোপন করতে যুক্তরাজ্যের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। তাঁর এই প্রচেষ্টা সফলও হয়েছিল। ফলে এখনো মানুষ অন্ধকারে, ব্রিটিশ রাজপরিবার, বিশেষ করে রানি কত সম্পদের মালিক।

এ–বিষয়ক নথি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের হাতে এসেছে। যুক্তরাজ্যের জাতীয় তথ্যভান্ডার থেকে এসব নথি পাওয়া গেছে। এর থেকে জানা গেছে, রানির আইনজীবীরা তাঁর সম্পদ লুকাতে প্রস্তাবিত একটি আইন পরিবর্তনে কীভাবে ব্রিটিশ সরকারের মন্ত্রীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন।

বিজ্ঞাপন

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে জানানো হয়, ঘটনাটি ১৯৭৩ সালের। সম্পদের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে যুক্তরাজ্যের তৎকালীন সরকার একটি বিল পার্লামেন্টে এনেছিল। কিন্তু রানি এতে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। এরপর প্রস্তাবিত ওই বিলে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য উদ্যোগী হন তাঁর ব্যক্তিগত আইনজীবীরা। রানির ওই চাপের কারণে সরকার বাধ্য হয় প্রস্তাবিত ওই বিলে নতুন একটি ধারা যুক্ত করতে।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, আইনে নতুন ধারাটি যুক্ত করার পর রাষ্ট্র–সমর্থিত একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করা হয়, যা মূলত ব্যবহার হয়েছে রানির ব্যক্তিগত সম্পদ ও বিনিয়োগ গোপন করতে। ব্রিটিশ রাজপরিবার এই সুবিধা ভোগ করেছে অন্তত ২০১১ সাল পর্যন্ত। এরপর সুবিধার পরিসর কমলেও আজ পর্যন্ত জানা যায়নি, রানির সম্পদের পরিমাণ কত।

রানি এই সুযোগ নিতে পেরেছেন মূলত রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার সুবাদে। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে কোনো বিল পাস করার আগে রানির অনুমতি নিতে হয়। এই প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া কিছু না হলেও তা ব্রিটিশ রাজপরিবার, তথা রানিকে বাড়তি সুবিধা দেয়। এতে তিনি আগেভাগেই জেনে যান, খসড়া বিলে কী রয়েছে।

গার্ডিয়ানের হাতে আসা নথিগুলো পর্যালোচনা করেছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবিধানিক আইন বিষয়ের বিশেষজ্ঞ টমাস অ্যাডামস। তিনি বলেন, এসব নথি থেকে বোঝা গেছে, আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে রানির প্রভাব কতটা। এ ধরনের প্রভাব লবিস্টরা কেবল স্বপ্নেই কামনা করতে পারেন।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে জানানো হয়, কোম্পানি স্বচ্ছতা বিলটির খসড়া তৈরি করেছিল যুক্তরাজ্যের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সরকার। বিলটি পার্লামেন্টে ওঠার আগে এ বিষয়ে আলোচনার জন্য সরকারের বাণিজ্য ও শিল্প দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন সুপরিচিত আইনপ্রতিষ্ঠান ফারের অ্যান্ড কোম্পানির তৎকালীন অংশীদার ম্যাথিউ ফারের। বিনিয়োগকারীদের গোপন বিনিয়োগের মাধ্যমে কোনো নিবন্ধিত কোম্পানির উল্লেখযোগ্য শেয়ার কেনা বন্ধের ব্যবস্থা ছিল বিলটিতে। এ ছাড়া এতে চাহিদার ভিত্তিতে শেয়ারের মালিকদের নাম–পরিচয় প্রকাশেরও বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছিল।

যুক্তরাজ্যের জাতীয় তথ্যভান্ডার থেকে প্রাপ্ত নথি থেকে জানা গেছে, সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে ম্যাথিউ ফারের জানান, এই বিলটি আইনে পরিণত হলে নিবন্ধিত কোম্পানিতে রানির বিনিয়োগ প্রকাশ হয়ে পড়তে পারে। কাজেই বিলটি নিয়ে রানির দ্বিমত রয়েছে। ম্যাথিউ ফারের রাজপরিবারকে ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করেন।

এ ব্যাপারে একটি নথিতে সিএম ড্রাকার নামের এক সরকারি কর্মকর্তা ১৯৭৩ সালের ৯ নভেম্বর লেখেন, ‘আমি ম্যাথিউ ফারেরের সঙ্গে কথা বলেছি। আমার যতটুকু মনে আছে, তাঁর মক্কেল কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের নাম প্রকাশের বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি যুক্তি তুলে ধরেছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে বলেছেন, শেয়ারহোল্ডারের নাম প্রকাশের বিষয়টি যে কারও জন্য বিব্রতকরও হতে পারে।’

বিজ্ঞাপন

ওই নথি লেখার তিন দিন পর তৎকালীন আরেক সরকারি কর্মকর্তা সিডব্লিউ রবার্টস দ্বিতীয় একটি নথি লেখেন। এতে তিনি সমস্যাটির সারমর্ম তুলে ধরেন। তিনি লেখেন, রানির শেয়ার ও অর্থ লেনদেনের তথ্য প্রকাশ হলে তা বিতর্কের সৃষ্টি করবে বলে উদ্বিগ্ন ম্যাথিউ ফারের।

পরের মাসেই এডওয়ার্ড হিথের সরকার সমস্যাটির একটি সমাধান বের করে। কনজারভেটিভ পার্টির তৎকালীন সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী জিওফ্রে হোয়ে তাঁর এক সহকর্মীকে দেওয়া একটি নথিতে লেখেন, ‘ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের সহযোগিতায় আমার দপ্তর একটি সমাধানে পৌঁছেছে।’ তিনি জানান, ওই বিলে একটি ধারা যুক্ত করা হবে, যেখানে এই আইনের আওতা থেকে সুনির্দিষ্ট কিছু কোম্পানিকে ছাড় দিতে সরকারকে ক্ষমতা দেওয়া হবে।

এরপর ব্রিটিশ সরকার একটি কাগুজে কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে, যাতে বিশেষ শ্রেণির ধনাঢ্য বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করতে পারেন। এই কোম্পানিকে ওই আইন থেকে ছাড় দেওয়া হয়। এর ফলে আগ্রহী কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে কিছুতেই বোঝার উপায় থাকল না, ব্রিটিশ রাজপরিবারের পক্ষে ওই কোম্পানির মালিকানায় কতগুলো শেয়ার রয়েছে।

ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন