ইকোনমিস্ট: আপনি কি সব সময় এমন সাহসী ছিলেন? এত শক্তিশালী মানুষ হতে যা প্রয়োজন?

জেলেনস্কি: এটা সাহসী হওয়ার কোনো ব্যাপার নয়। আমি যেভাবে সবকিছু করি, এবারও তা–ই করেছি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে আমরা কেউই এর জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। আপনি বলতে পারেন না, ‘আমি যদি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট হতাম, তাহলে আমিও এভাবেই করতাম।’ কারণ, আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না এর মানে কী। এমনকি আপনি এটাও ভাবতে পারতেন না আপনি কী করতেন। এ ক্ষেত্রে আমার সঙ্গেও তা–ই হয়েছে এবং সবাই আমার সঙ্গে আছেন।

ইকোনমিস্ট: কিন্তু আপনি কি শাসনপদ্ধতি পরিবর্তন করেছেন?

জেলেনস্কি: হ্যাঁ, অবশ্যই। যা ঘটছে, আমি তা বুঝতে পেরেছিলাম। কয়েক মাস আগেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম কী ঘটছে। এটা অনেক বড় গল্প। এটা শুধু ইউক্রেন নয়, গোটা বিশ্বের বিষয়, বিশ্বের রাজনীতিকদের বিষয়। আমার মনে হয় জেতার পরই আমরা এটা নিয়ে কথা বলতে পারব। আমি নিশ্চিত, আমরা জয়ী হব। আর এ জন্যই বলছি, আমি কোনো নায়ক নই। আমি বুঝেছিলাম কী ঘটছে। আমি ইউক্রেন নিয়ে মনোভাব বদলাতে চেয়েছি। কার কাছে কত অস্ত্র আছে কিংবা কত অর্থ, তেল বা গ্যাস আছে, একটা পর্যায়ে এটা কোনো বিষয়ই নয়। এ জন্য আমাদের সংস্থা থাকতে হবে। এটাই প্রথম বিষয়, যেটা আমি বুঝতে পেরেছিলাম।

ইকোনমিস্ট: রাশিয়ার সঙ্গে বিরোধ কী নিয়ে হতে পারে, আপনি কখন বুঝতে পারলেন, সেই মুহূর্তের কথা মনে করতে পারেন?

জেলেনস্কি: আমার মনে হয় আমি যখন প্রেসিডেন্ট হলাম, এটা তখনকার কথা। আমি বুঝতে পেরেছিলাম কিছু বিষয় ঠিক এভাবে ঘটছে কেন এবং আমি অনেক বিশ্বনেতার কাছে সৎ থাকার চেষ্টা করেছিলাম। অবশ্যই এর মধ্যে রাশিয়াও রয়েছে। আমাদের বৈঠক হয়েছে। আপনি মনে করতে পারেন আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ, আমাদের সেই প্রথম ও শেষবারের মতো ২০১৯ সালে নরমান্ডি ফোরের আলোচনায় পুতিনের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল।

default-image

এমন সিদ্ধান্তে আসতে শুরু করেছিলাম যে আমরা কারও অংশ হব না। আমি ইউক্রেন নিয়ে মনোভাব বদলাতে চেয়েছি। কারণ, এটা পরিষ্কার করার জন্য—ইউক্রেনের মানুষ যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও রাশিয়ার মানুষের মতোই মানুষ। আমরা সবাই এক। আমরা সবাই একই অবস্থানে। এটা কার কাছে কত অস্ত্র, অর্থ, তেল, গ্যাস বা অন্য কিছু আছে। আমি সবার আগে এটাই বুঝেছিলাম। আমি প্রথমেই বুঝেছিলাম যে আমাদের মতো মানুষের জন্য সংস্থা আছে। মানুষ হলো নেতা আর রাজনৈতিক নেতাদের কেউ কেউ পরাজিত। আমরা এভাবে কাজ শুরু করি এবং এ নীতিতে এগিয়ে চলি।

ইকোনমিস্ট: তাই এখন আপনি পশ্চিমা নেতাদের বদলে পশ্চিমের মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন?

জেলেনস্কি: হ্যাঁ, অবশ্যই। আমি তা–ই মনে করি। আমার মনে হয় রাজনীতিবিদেরা মাঝেমধ্যে তথ্যের একটা ফাঁকা অবস্থানে বাস করেন। আমরা যা দেখছি, তা হলো পুতিন এখন রয়েছেন একটি বদ্ধ পরিবেশে। তাই তিনি জানেন না। তাঁর সঙ্গে যা কিছু ঘটছে, এর সবকিছুর বর্ণনা আমি দিতে পারব না। আমি বর্ণনা দিতে পারব না, কারণ আমি জানি, প্রতিদিন, প্রতি সপ্তাহে অথবা প্রতি দুই সপ্তাহে কাদের সঙ্গে তিনি কথা বলেন। আমাদের কাছে সে তথ্য নেই। এর মানে তিনি বুঝতে পারছেন না অথবা তিনি জানেন না বাইরে কী ঘটছে। এমনকি যুদ্ধ যখন শুরু হলো, তখন আমিও জানতাম না এবং আমি সবার সঙ্গে বেশ খোলাখুলিভাবে কথা বলি। আমিও যদি আমার অফিসে বসে থাকতাম এবং তিন বা চার দিন বাইরে না যেতাম, তাহলে বিশ্বে কী ঘটছে, সেসব সম্পর্কে সঠিক তথ্য হয়তো পেতাম না।

ইকোনমিস্ট: হঠাৎ যখন যুদ্ধ শুরু হলো, তৎক্ষণাৎ কি আপনি বুঝলেন এবং ভাবলেন, ‘মানুষ চাইছে আমি এটাই করি এবং আমি তা–ই করছি।’ নাকি এটা আপনার সিদ্ধান্ত ছিল এবং আপনি তখন ভেবেছিলেন, ‘এখন আমি এটা করছি এবং আপনাদের আমাকে সমর্থন করতে হবে?’

জেলেনস্কি: আমার মনে হয় এটা (যুদ্ধ) যখন শুরু হলো, তখন কেউই বুঝতে পারেনি কী করতে হবে। আমি কিয়েভে আমার বাসভবনে আমার ঘরেই ছিলাম। ওই মুহূর্তে আমি ছিলাম ঘরে। তখন বাজে ভোররাত ৪টা ৫০ মিনিট। আমার স্ত্রী ও সন্তানেরাও আমার সঙ্গে ছিল। তারা জেগে উঠল। তারা আমাকে বলল, বাইরে বিকট বিস্ফোরণ হচ্ছে। তারা জানত না কী ঘটছে। আমরা জানতাম, তারা (হামলা করার) প্রস্তুতি নিচ্ছে।

default-image

অবশ্যই আমরা এটা জানতাম। প্রথম আমরা যেটা করলাম, জরুরি অবস্থা জারি করলাম। কয়েক দিন পর জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা পরিষদের বৈঠকে আমরা মার্শাল ল (সামরিক শাসন) ঘোষণা করলাম। আমরা বুঝতে পেরেছিলাম রুশরা হামলা করতে পারে। কিন্তু এভাবে যে তারা হামলা করতে, তা বুঝতে পারিনি।

ইকোনমিস্ট: এখন কথা বলা যাক, যুদ্ধের এই পর্যায়ে আমরা কোথায় আছি সেটা নিয়ে। আচ্ছা, আপনি কি মনে করেন, আপনার (ইউক্রেনের) জেতার কোনো সুযোগ আছে?

জেলেনস্কি: আমরা জয়ে বিশ্বাসী। এটা ছাড়া অন্য কিছু বিশ্বাস করা অসম্ভব। আমরা অবশ্যই জিতব, কারণ এটা আমাদের বাড়ি, আমাদের ভূমি, আমাদের স্বাধীনতা। জয়টা এখন শুধু সময়ের ব্যাপার।

ইকোনমিস্ট: ইউক্রেন যদি জয়ী হয়, তাহলে সেই জয় কেমন হবে?

জেলেনস্কি: জয় মানে হলো যতটা পারা যায় সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচানো। কারণ, এটা ছাড়া আর কোনো কিছুর মানে হয় না। আমাদের জন্য এই ভূমি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটা ভূমিই। আমি জানি না যুদ্ধ কত দিন চলবে, কিন্তু আমাদের নিয়ন্ত্রণে শেষ শহরটি থাকা পর্যন্ত আমরা লড়াই করব। যুদ্ধের শুরুতে মানুষ বুঝতে পারছিল না পূর্ণমাত্রার একটা যুদ্ধ কেমন হবে। ওই সময় আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে মানুষের কী করা উচিত, কী উচিত নয়। আমার দায়িত্ব সব মানুষকে এমন বার্তা দেওয়া ও জানানো, কীভাবে তারা এর মোকাবিলা করবে।

যখন আপনি দেখাবেন ইউক্রেনের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে, তখন আপনার নিজের মতো করেই তা দেখাতে হবে। এ ধরনের একটি সিদ্ধান্ত ছিল যে এখানেই হবে নাকি চলে যাওয়া হবে। আমরা সবাই একইভাবে আহত হয়েছি। আমার সিদ্ধান্ত ছিল মানুষকে এই বার্তা দেওয়া—হামলার জবাব আমরা কীভাবে দেব। এটা হলো কীভাবে এ যুদ্ধ শুরু হলো এবং এর শেষটা কীভাবে হবে। এটার (যুদ্ধের) শেষ যখন হবে, তখনো আমরা এখানে দাঁড়িয়েই আত্মরক্ষার লড়াই চালিয়ে যাব।

default-image

ইউক্রেনের বিজয় কেমন হবে—এ প্রশ্নের এটাই জবাব। আমরা হয়তো ক্ষণিকের জন্য জয়ী হব, হয়তো সব সমস্যার সমাধান হবে না, কিন্তু কোন পথে যাব, সে সিদ্ধান্ত আমরা নিয়েছি।

ইকোনমিস্ট: পুতিনের সঙ্গে কি দীর্ঘস্থায়ী শান্তির কোনো সম্ভাবনা আছে?

জেলেনস্কি: আমি জানি না। আমি এমনকি এটাও জানি না, পুতিনও এ প্রশ্নের উত্তর জানেন কি না। আমার মনে হয়, তাঁর সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে অনেকগুলো বিষয় কাজ করে। যেখানে রাশিয়া আছে, সেই অঞ্চলের স্থিতিশীলতায় পুতিনের সিদ্ধান্ত ভূমিকা রাখবে। যা ঘটেছে, তার ফলে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সম্পর্ক কীভাবে পরিবর্তিত হবে, তা একটি বড় বিষয়। এটার কোনো উত্তর আমার কাছে নেই। এটা একটা বড় সমস্যা। আসলেই এটা অনেক বড় একটা সমস্যা।

ইকোনমিস্ট: আপনি বলেছেন, পুতিনের সঙ্গে মুখোমুখি আলোচনায় বসতে চান। দেখা হলে তাঁকে কী বলবেন?

জেলেনস্কি: অনেক কিছু বলার আছে। আমাদের কথা বলা দরকার। এটা একটা প্রশ্ন বা একটা উত্তরের বিষয় নয়। এটা সিদ্ধান্তের ব্যাপার। আমাদের নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে কথা বলতে হবে। কয়েক মাস বা কয়েক বছর ধরে আলোচনা হতে পারে। কিছু বিষয়ে আমাদের এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়ার জন্য আমাদের কথা বলা দরকার। আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার যে আমরা আর লড়াই-সংঘাতে জড়াব না। এটাই আমার দর্শন। এবার ধাপে ধাপে সবকিছু করা হোক। এক ধাপে একটি সিদ্ধান্তে আসা দরকার। আমরা সবকিছু নিয়ে কথা বলতে পারি। তবে আমরা সবকিছুতে ছাড় দিতে পারি না। আমাদের এটা বুঝতে হবে ইউক্রেন আমাদের মাতৃভূমি। যা ঘটছে, সেটা তাঁকে বুঝতে হবে। যদি সম্ভব হয় আমাদের একে অপরকে বুঝতে হবে। এটা সম্মানের কোনো বিষয় নয়, এটা ভালোবাসা বা অন্য কিছু। এটা অনুভূতির বিষয় নয়। এটা নির্দিষ্ট বিষয়। এখানে একটা সমস্যা আছে। সেটা বিস্তারিত আলোচনা করে সমাধান করতে হবে।

*আল আমিন সজীব

ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন