তবে যেসব রুশ নাগরিক প্রকাশ্যে ইউক্রেন যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন, তাঁদের এখন প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে। অনেকে দেশ ছাড়ছেন। অনেকে চুপ থাকার পথ বেছে নিচ্ছেন।

সম্প্রতি রাশিয়ার জরিপ প্রতিষ্ঠান লেভাদা একটি জনমত জরিপ প্রকাশ করেছে। জরিপে দেখা গেছে, এখন পুতিনের প্রতি ৮৩ শতাংশ রুশ নাগরিকের সমর্থন রয়েছে। অথচ গত জানুয়ারি মাসে তা ছিল ৬৯ শতাংশ। অর্থাৎ পুতিনের জনপ্রিয়তা অনেক বেড়েছে।

জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৮১ শতাংশ বলেছেন, তাঁরা ইউক্রেন যুদ্ধকে সমর্থন করেন। তাঁরা মনে করেন, ইউক্রেনের রুশভাষীদের রক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।

বিশ্লেষকেরা অবশ্য সতর্ক করে বলেছেন, ইউক্রেনে হামলার জেরে রাশিয়ার ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে চলছে পশ্চিমারা। ফলে আগামী মাসগুলোতে রাশিয়া চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। আর তখন হয়তো রুশ নাগরিকদের মনোভাবে আবার বদল আসতে পারে।

কোনো কোনো পর্যবেক্ষক আবার বলছেন, যুদ্ধকালে পরিচালিত জনমত জরিপের তাৎপর্য সীমিত। কারণ, এ সময় অনেক রুশ নাগরিক ভিন্নমত প্রকাশ করতে ভয় পান। দেশটিতে পাস হওয়া নতুন আইন অনুযায়ী, কেউ ক্রেমলিনের বক্তব্যের বাইরে গেলে তাঁর ১৫ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। এ ভয়েও অনেকে প্রকৃত মত প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতে পারেন।

default-image

ইউক্রেন সীমান্তবর্তী রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর রোস্তভ-অন-দনের অধিকারকর্মী সের্গেই শালিগিন বলেন, তাঁর দুই বন্ধু শুরুতে তাঁর সঙ্গে গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন তাঁরা যুদ্ধের সমর্থক শিবিরে ভিড়েছেন। তাঁরা তাঁকে মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামে রুশ প্রোপাগান্ডা পোস্ট পাঠাচ্ছেন। এসব পোস্টে বলা হচ্ছে, ইউক্রেনীয় ফ্যাসিবাদীরা নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে।

শালিগিন বলেন, গৃহযুদ্ধের মতো করে এখন বিভেদরেখা টানা হচ্ছে। তিনিসহ রাশিয়ার অন্য পর্যবেক্ষকেরা সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন, চলমান যুদ্ধের বেশির ভাগ সমর্থককে বিশেষভাবে উত্সাহী বলে তাঁদের মনে হয়নি।

খ্যাতিমান রুশ সমাজবিজ্ঞানী সের্গেই বেলানোভস্কি বলেন, ‘আমি এখানে স্বতঃস্ফূর্ততা দেখছি না। বরং আমি এখানে যা দেখতে পাচ্ছি, তা হলো উদাসীনতা।’

লেভাদার জরিপে দেখা গেছে, ৮১ শতাংশ রুশ নাগরিক এ যুদ্ধকে সমর্থন করছেন। তবে জরিপে এ-ও দেখা গেছে, ৩৫ শতাংশ রুশ নাগরিক বলেছেন, সত্যিকার অর্থে এ ব্যাপারে তাঁদের কোনো আগ্রহ নেই। অর্থাৎ জরিপ অনুযায়ী, রুশ নাগরিকদের একটা তাৎপর্যপূর্ণ অংশ কোনো ধরনের আগ্রহ ছাড়াই এ যুদ্ধকে সমর্থন করছেন।

কিন্তু রাশিয়ায় যাঁরা টেলিভিশন দেখেন, তাঁদের নিশানা করে সরকারি প্রচারণা চালানো হচ্ছে। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত চ্যানেলগুলোতে বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান কমিয়ে সংবাদ ও টক শো বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

সাম্প্রতিক এক শুক্রবার ক্রেমলিন নিয়ন্ত্রিত চ্যানেল ওয়ানে ১৫ ঘণ্টা সংবাদভিত্তিক অনুষ্ঠান দেখানো হয়। অথচ ইউক্রেনে রুশ অভিযান শুরুর আগে এ চ্যানেলে শুক্রবার পাঁচ ঘণ্টা সংবাদভিত্তিক অনুষ্ঠান দেখানো হতো।

গত মাসে চ্যানেল ওয়ানে ‘অ্যান্টিফেক’ নামের নতুন একটি অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু হয়। পশ্চিমাদের ছড়ানো ‘ভুয়া তথ্য’ নিরূপণ করাই এ অনুষ্ঠানের লক্ষ্য।

টেলিফোনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাইবেরিয়ার একটি শহরের ব্যবসায়ী স্তানিসলাভ ব্রিকভ বলেন, যুদ্ধ খারাপ কাজ। কিন্তু রাশিয়াকে এ খারাপ কাজ করতে বাধ্য করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তাই রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি ঐক্য প্রকাশ করা ছাড়া রুশ নাগরিকদের কিছু করার ছিল না। যে সেনাসদস্যরা তাঁদের জীবনবাজি রেখে রাশিয়ার স্বার্থ সুরক্ষায় কাজ করছেন, তাঁদের পাশে না দাঁড়ানোটা লজ্জার বিষয় হতো।

মিখাইল নামের ৩৫ বছর বয়সী এক বন্ধুর কথা উল্লেখ করেন ব্রিকভ। তিনি বলেন, মিখাইল একসময় সরকারের সমালোচনা করতেন। কিন্তু তিনি এখন মনে করেন, সব মতবিরোধ এখন দূরে সরিয়ে রাখার সময় এটা।

মিখাইল বলেন, ‘আমাদের সীমানার বাইরে সব জায়গায় যখন আমাদের বিরুদ্ধে লোকজন সরব, তখন অন্তত এ সময়ের জন্য হলেও আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’

রাশিয়ায় যাঁরা এখনো যুদ্ধের বিরোধিতা করছেন, তাঁদের ব্যাপক অপবাদ-হয়রানি-হেনস্তার মুখে পড়তে হচ্ছে। তাঁদের শত্রুপক্ষের দোসর বলে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে।

গত ১৬ মার্চ রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, পশ্চিমাপন্থী রুশ নাগরিকেরা নোংরা ও বিশ্বাসঘাতক। তাঁদের সমাজ থেকে উৎখাত করতে হবে।

গত দুই সপ্তাহে রাশিয়ার বেশ কয়েক অধিকারকর্মী, সাংবাদিক, বিরোধী নেতা নিজেদের বাড়িতে ফিরে দরজায় বিভিন্ন অক্ষর ও শব্দ লেখা দেখতে পান। অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা কারও দরজায় ‘জেড’, কারও দরজায় ‘বিশ্বাসঘাতক’, কারও দরজায় ‘দালাল’ লিখে গেছেন।

মার্চের শুরুর দিকে একটি উদারপন্থী রেডিও স্টেশন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। রেডিও স্টেশনটির সাবেক প্রধান সম্পাদক আলেক্সি ভেনেদিকতভ বলেন, গত সপ্তাহে তিনি তাঁর বাড়ির দরজায় একটি শূকরের বিচ্ছিন্ন মাথা পেয়েছেন। তার সঙ্গে একটি স্টিকারও ছিল। এতে লেখা ছিল ‘ইহুদি শূকর’।

বিক্ষোভকারী একটি সংগঠনের সদস্য লুসি স্টেইনও সম্প্রতি তাঁর অ্যাপার্টমেন্টের দরজার সামনে নিজের একটি ছবি পেয়েছেন। সেখানে লেখা ছিল, ‘নিজের মাতৃভূমিকে বেচে দিয়ো না।’

ইউক্রেনে রুশ অভিযান শুরুর পরের সপ্তাহগুলোতে রাশিয়ায় ব্যাপক যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ হয়। এ বিক্ষোভকে কেন্দ্র দেশজুড়ে ১৫ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখন রাশিয়ায় যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ কমে এসেছে।

যুদ্ধ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করায় নানা আশঙ্কা থেকে ইতিমধ্যে অনেক রাশিয়ান দেশ ছেড়েছেন। একটি বাণিজ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, কমপক্ষে ৫০ হাজার প্রযুক্তিকর্মী রাশিয়া ত্যাগ করেছেন।

সবচেয়ে বেশি বিক্ষোভ হওয়া স্থানগুলোর মধ্যে সেন্ট পিটার্সবার্গ অন্যতম। স্থানীয় বিরোধী আইনপ্রণেতা বরিস ভিশনেভস্কি বলেন, প্রথম দুই সপ্তাহে যুদ্ধ বন্ধের জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করার অনুরোধসংবলিত প্রায় ১০০টি চিঠি পান তিনি। এ সময়ে পাওয়া মাত্র একটি চিঠিতে যুদ্ধের প্রতি সমর্থন জানানো হয়েছিল। তবে যুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আইনে পুতিন স্বাক্ষর করার পর চিঠি আসার পরিমাণ কমে গেছে।

টেলিফোন সাক্ষাৎকারে মস্কোর এক রাজনীতি বিশ্লেষক বলেন, গত মাসে তাঁকে বেশ কয়েকবার শহরের বিভিন্ন পুলিশ স্টেশনে যেতে হয়েছে। কারণ, বিক্ষোভকালে তাঁর কিশোর ছেলেকে কয়েকবার গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ছেলেকে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে। অধিকারকর্মীদের যাঁরা অনলাইনে উত্ত্যক্ত করেন, তাঁদের কাছে তাঁর ছেলের নাম পৌঁছে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

default-image

মস্কোর এ রাজনীতি বিশ্লেষক আরও বলেন, যে পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে, তাঁদের যুদ্ধের ব্যাপারে আগ্রাসী বা স্বতঃস্ফূর্ত কোনোটিই মনে হয়নি তাঁর। তবে সব মিলিয়ে তিনি বিশ্বাস করেন, বেশির ভাগ রুশ নাগরিক এখন প্রকাশ্যে যুদ্ধের বিরোধিতা করতে ভয় পান। তাঁরা মেনে নিয়েছেন, এ ব্যাপারে তাঁদের কিছু করার নেই।

ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই রুশ রাজনীতি বিশ্লেষক বলেন, অন্য কেউ রুশ জনগণের সবকিছু ঠিক করে দিচ্ছেন। এই জ্ঞাত নিষ্ক্রিয়তাই তাঁদের ট্র্যাজেডি।

সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন