পরিস্থিতি কিন্তু রাজ্যের শাসক দলের মোটেই অনুকূলে নয়। কেননা এই ৯টি জেলার মধ্যেই রয়েছে নেপাল ঘেঁষা লখিমপুর খেরি। গত অক্টোবরে শান্তিপূর্ণ মিছিলে গাড়িবহর চালিয়ে যেখানে চারজন কৃষককে মেরে ফেলা হয়েছিল। সেই ঘটনার দায় কৃষকেরা চাপিয়েছিলেন জেলার ব্রাহ্মণ নেতা মোদি মন্ত্রিসভার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অজয় মিশ্র টেনির ছেলে আশিস মিশ্রের ওপর। সুপ্রিম কোর্টের চাপে হত্যার দায়ে শেষ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ছেলে আশিসকে। ভোটের আগে যিনি আপাতত জামিনে মুক্ত।

এই লখিমপুর খেরির মোট আটটি বিধানসভা আসনের সব কয়টি গতবার বিজেপি জিতেছিল। অথচ এই জেলায় তো বটেই, আশপাশের জেলা পিলিভিট, সীতাপুর বা উন্নাওয়ের বেশ কিছু কেন্দ্রে কৃষক বিক্ষোভের দরুন বিজেপি প্রার্থীরা এবার সেভাবে প্রচারেই নামতে পারেননি। উন্নাওয়ের ধর্ষণ ও হত্যা মামলা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যোগী-সরকারের যোগ্যতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন তুলেছে, তেমন ক্ষুব্ধ রেখেছে এই জেলাগুলোতে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা দলিত সমাজকে। এবারের ভোটে বহুজন নেত্রী মায়াবতীর নিষ্ক্রিয়তা বিভ্রান্তিতে ভোগা দলিতদের কোন দিকে টানবে, এই পর্ব থেকে সেই আগ্রহ বাড়বে। কৃষক, দলিত ও অন্য অনগ্রসরদের ভোটে ভাগ বসানোর পাশাপাশি অখিলেশ-জয়ন্তের জোট আজকের পর্বে জাট, যাদব ও মুসলমানদের সিংহভাগ সমর্থন আদায় করতে পারলে মুখ্যমন্ত্রী যোগী তো বটেই, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকেও চিন্তায় ফেলবে। বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি, রাজ্য ও কেন্দ্রের প্রশাসনিক আনুকূল্য ও অর্থবলেরও পরীক্ষা এই পর্ব থেকে শুরু হলো।

আজ ভোট হচ্ছে একসময় কংগ্রেসের দুর্গ বলে পরিচিত সোনিয়া গান্ধীর নির্বাচনী কেন্দ্র রায়বেরিলিতেও। গতবারও সেখানে দুটি আসন কংগ্রেস জিতেছিল। এবার একটিও ধরে রাখতে পারবে কি না সন্দেহ। কেননা যে দুই বিধায়ক রায়বেরিলিতে কংগ্রেসকে ভাসিয়ে রেখেছিলেন, ভোটের আগে সোনিয়ার হাত ছেড়ে তাঁরা বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। প্রার্থীও হয়েছেন। বলতে গেলে, এবার উত্তর প্রদেশের ভোটে কংগ্রেস প্রকৃত অর্থেই অনাথ। গতবারের জয়ীরা অধিকাংশ দল ছেড়েছেন। শরীর-স্বাস্থ্য ভালো নয় বলে সোনিয়া এক দিনের জন্যও প্রচারে যেতে পারেননি। শেষ বেলায় শুধু এক ভিডিও বার্তা দিয়েছেন। রাহুল গান্ধীও পাঞ্জাব, গোয়া ও উত্তরাখণ্ড নিয়ে ব্যস্ত থাকায় উত্তর প্রদেশের দিকে নজর দিতে পারেননি। দলের সব দায় একার কাঁধে তুলে নিয়েছেন প্রিয়াঙ্কা। জাতপাতের লড়াইয়ে না ঢুকে হীনবল কংগ্রেসের জন্য কোরামিনের জোগান দিতে তিনি নারীদের টার্গেট করে এগিয়েছেন। স্লোগান দিয়েছেন ‘লাড়কি হুঁ, লড় সকতি হুঁ’। কিছুটা সাড়াও যে পাননি, তা নয়। তবে আগেই জানিয়েছেন, ২০২৭ সালকে নজরে রেখে তিনি এগোচ্ছেন। এবারের লড়াই তারই জমি তৈরির প্রস্তুতি।

উত্তর প্রদেশে প্রথম তিন দফার ভোট পুরোপুরি বিজেপি বনাম সমাজবাদী জোটের মধ্যে আবদ্ধ থেকেছে। প্রথম দুই দফার নির্ণায়ক যদি জাট, যাদব ও মুসলমান ঐক্য হয়ে থাকে, তাহলে তৃতীয় দফা ছিল পুরোপুরি যাদবভূমির চরিত্রনির্ভর। সমাজবাদী দলের গড় হিসেবে পরিচিত তৃতীয় পর্বে যাদবদের সঙ্গে মুসলমানদের সখ্য এবার দৃঢ়তর হয়েছে। ফলে প্রথম তিন পর্ব বিরোধীদের উৎফুল্ল রেখেছে। বিজেপি ক্ষতি স্বীকারে দ্বিধা করছে না, কিন্তু তাদের ধারণায়, আগেরবার যে বিপুল সমর্থন তারা আদায় করেছিল, তা নিশ্চিতভাবেই এবার তলানিতে ঠেকবে না। ফলে আসন কমলেও লড়াইয়ের আঙিনার ভেতরেই থাকবে তারা। সেটা কতখানি কার্যকর, আজ এবং আগামী তিন পর্ব তা বুঝিয়ে দেবে।

এই প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখতে বিজেপির চেষ্টায় কিন্তু ত্রুটি নেই। বিরোধী জোটের মুখ যেখানে প্রধানত অখিলেশ যাদব ও জয়ন্ত চৌধুরী, বিজেপি সেখানে কার্পেট বম্বিংয়ের মতো হাজির করছে নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ, রাজনাথ সিং, জে পি নাড্ডা, যোগী আদিত্যনাথদের। কিন্তু তবু, প্রচারের ঢং দেখে মনে হতেই পারে বিজেপি হয়তো একটু খেই হারিয়ে ফেলছে। প্রচারের অভিমুখ তাই দিনদিন বদলে যাচ্ছে।

যেমন, শুরুর দিনগুলোয় শাসকদলীয় নেতাদের প্রচারে উঠে আসছিল কেন্দ্র-রাজ্য প্রশাসনে ‘ডবল ইঞ্জিন’ বহাল থাকার তাৎপর্য। উদাহরণ হিসেবে দাখিল হচ্ছিল পাঁচ বছরের উন্নয়নের খতিয়ান। কিন্তু অচিরেই তা বদলে যায়। উন্নয়নের বদলে উঠে আসে মন্দির-মসজিদ, জিন্না-গন্না (আখ), ভাইসাব-ভাইজান, দেশপ্রেম-দেশদ্রোহ, হিন্দুস্তান-পাকিস্তান, হিন্দু-মুসলমান। চতুর্থ দফার প্রচারে প্রধানমন্ত্রী নিজেই আচমকা টেনে আনেন সন্ত্রাসবাদ প্রসঙ্গ। ২০০৮ সালে আহমেদাবাদ বিস্ফোরণ প্রসঙ্গে সমাজবাদীদের নির্বাচনী প্রতীক সাইকেলের অবতারণা করে বলেন, ‘বিস্ফোরক রাখা হয়েছিল সাইকেলে। আমি হয়রান হয়ে যাই এটা ভেবে যে সমাজবাদী পার্টির প্রতীক সাইকেলে কেন বিস্ফোরক রাখা হবে?’ এ কথা বলার মধ্য দিয়ে তিনি সমাজবাদী ও সন্ত্রাসবাদের যোগসাজশের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিলেও ইতিমধ্যেই বলাবলি শুরু হয়েছে, এই উক্তি পশ্চিমবঙ্গের ভোটে মমতাকে ‘দিদি, ও দিদি’ কটাক্ষের মতো ব্যুমেরাং হয়ে উঠবে কি না। অখিলেশও ছাড়েননি। পাল্টা আক্রমণ করে বলেছেন, সাইকেলের অপমান মানে সাধারণ মানুষের অপমান। মানুষই জবাব দেবে।

চতুর্থ দফার প্রচার শেষ হয়ে যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী পঞ্চম দফার প্রচার শুরু করেছেন নতুন বিষয় টেনে। কে জানে, এটাই তাঁর তুরুপের শেষ তাস কি না? ইউক্রেন সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রথম তিনি প্রকাশ্যে তাঁকেই ভোট দেওয়ার আবেদন জানালেন। বললেন, বিশ্ব পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক নয়। অনেক কিছু ঘটে যেতে পারে। এই অবস্থায় দেশের প্রয়োজন দৃঢ় ও কঠোর নেতৃত্ব। দেশবাসীকে সেই নেতৃত্বই বেছে নিতে হবে।

এখানেও কেন যেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোঁয়া! পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে তৃণমূল নেত্রী বলেছিলেন, রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা আসনে তিনিই প্রার্থী। নরেন্দ্র মোদির কণ্ঠেও কি সেই সুর? উন্নয়ন, হিন্দুত্ববাদ, সন্ত্রাসবাদ, ধর্মীয় মেরুকরণ হয়ে ইস্পাত কঠিন নেতৃত্ব! মরা-বাঁচার লড়াইয়ে বারবার গোলপোস্ট বদল কিসের লক্ষণ? আজকের চতুর্থ দফার ভোট সেই ইঙ্গিত স্পষ্ট করতে পারে।

ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন