২০২৪ সালে ভারতের লোকসভা নির্বাচন। বিগত দুই লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির কাছে ব্যাপক ব্যবধানে হারে ভারতের সর্বপ্রাচীন রাজনৈতিক দল কংগ্রেস। তাই আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কংগ্রেসকে পুনরুজ্জীবিত করতে একটি কৌশল দিয়ে সাহায্য করার জন্য দলটির পক্ষ থেকেই প্রশান্ত কিশোরকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তিনি বলছেন, ‘আমরা সাবধানে একটি কৌশল প্রণয়ন করি। কংগ্রেস নেতৃত্ব মূল্যায়নের পর এ ব্যাপারে একমত হয় যে এটা দলের জন্য ভালো। কিন্তু কীভাবে কৌশলটি কার্যকর হবে, তা নিয়ে আমাদের মধ্যে বনিবনা হচ্ছিল না।’ তাই কংগ্রেসে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান প্রশান্ত।

এমপাওয়ার্ড অ্যাকশন গ্রুপ (ইএজি) নামে সম্প্রতি কংগ্রেসে নতুন একটি নীতিনির্ধারণী কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রশান্ত কিশোরকে ওই কমিটিতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু কয়েক দিন জনমনে গুঞ্জন চলার পর এ প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে টুইট করে প্রশান্ত কিশোর বলেন, ‘আমার মত হলো, আমার চেয়ে বরং রূপান্তরমূলক সংস্কারের মাধ্যমে গভীর মূলে থাকা কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান করার জন্য কংগ্রেসের নেতৃত্ব ও সম্মিলিত ইচ্ছাশক্তির বেশি প্রয়োজন।’

প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় ইএজি গঠনে দলের সমস্যামূলক সিদ্ধান্তও একটি কারণ বলে জানান প্রশান্ত কিশোর। তিনি বলেন, ‘ইএজি কমিটির কোনো গঠনতান্ত্রিক যোগ্যতা ছিল না। সব সদস্য মনোনীত। আমি এটাকে সমস্যা মনে করেছি, কারণ এই কমিটি দলের গঠনতন্ত্র মেনে হয়নি এবং ভবিষ্যতে এটা নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হবে।’

প্রশান্ত কিশোর বলছেন, কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার আগে তার সঙ্গে দলটির নেতাদের গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে এবং একটি কৌশলের ব্যাপারে উভয় পক্ষ একমত হয়েছিল। তাঁর কথায়, ‘ভবিষ্যতে কংগ্রেস কীভাবে তাদের হারানো গৌরব ফিরে পাবে, সেটাই ছিল আমার কৌশল। সেখানে কোনো এক বা দুটো নির্বাচনে জয়ের লক্ষ্য ছিল না। এর লক্ষ্য ছিল দেশে একটা শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবার কংগ্রেসের অবস্থান সংহত করতে সহায়তা করা।’

২০১৪ সালের ভোটে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কাছে ব্যাপক ব্যবধানে হারার পর থেকেই হারিয়ে যাওয়া অবস্থান ফিরে পাওয়ার জন্য ধুঁকছে কংগ্রেস। এরপর ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজেপির কাছে দলটি হেরে যায়। এ ছাড়া বেশ কিছু রাজ্যের বিধানসভার ভোটেও হেরেছে কংগ্রেস। কিছু রাজ্যে কংগ্রেস সরকার গঠন করলেও এর জন্য কংগ্রেসকে কৃতিত্ব দেওয়া হচ্ছে না। বলা হচ্ছে, স্থানীয় নেতারা মাঠে লড়াই করেছেন বলেই কংগ্রেস ক্ষমতায়।

বিভিন্ন দলের হয়ে কাজ করে ভারতের ভোটারদের প্রভাবিত করা এবং এই রাজনীতিকদের জয় ছিনিয়ে আনতে প্রশান্ত কিশোরকে সফল একজন বলে মনে করা হয়। ২০১০ সালে গুজরাটের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একজন উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেওয়ার আগে বহু বছর স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে কাজ করেছেন তিনি।

২০১৪ সালে মোদির উপদেষ্টা হিসেবে তাঁর দল বিজেপিকে বিপুল ভোটে জয় এনে দেওয়ার ক্ষেত্রে একজন যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে কাজ করার কৃতিত্ব পেয়ে প্রশান্তের খ্যাতি ছড়ায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও উদ্ভাবনী নির্বাচনী প্রচারণা কৌশলের মাধ্যমে রাজনীতিকদের জনপ্রিয় মুখ হিসেবে তুলে ধরার মাধ্যমে প্রশান্ত কিশোর কাজ করেন।

মোদির জয়ের পর বিজেপির সঙ্গ ছাড়েন প্রশান্ত কিশোর। এরপর তিনি একাধিক দলের হয়ে কাজ করেছেন। এর মধ্যে দিল্লি ও পাঞ্জাবে ক্ষমতাসীন আম আদমি পার্টি (আপ) ও পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসও রয়েছে। তাঁর হাত ধরে সর্বশেষ গত বছরের মে মাসের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় জয় পায় তৃণমূল কংগ্রেস। ‘কিংমেকার’ হিসেবে পরিচিত প্রশান্ত কিশোর যে দলের হয়ে কাজ করেন, সেই দল জেতে বলে সুনাম আছে। তবে ২০১৭ সালে এসে তাঁর এই সুনামে ভাটা পড়ে। সে বছর কংগ্রেসের হয়ে উত্তর প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ড বিধানসভা নির্বাচনে কাজ করেন তিনি। তবে দুই রাজ্যে পরাজয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে প্রশান্তের সম্পর্ক ছিন্ন হয়।

তবে এরপরও তিনি যতগুলো দলের হয়ে কাজ করেছেন, প্রায় সব দলই সফল হয়েছে। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি জনতা দলে (সংযুক্ত) যোগ দেন। এরপর আঞ্চলিক এই দলের সহসভাপতি হিসেবে নিযুক্ত হন। কিন্তু বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন নিয়ে মতবিরোধ থেকে ২০২০ সালে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। বিবিসি বলছে, প্রশান্ত কিশোর যদি কংগ্রেসে যোগ দিতেন, তাহলে কয়েক দশক ধরে দলটিকে নেতৃত্ব দেওয়া গান্ধী পরিবারের জন্য সেটা দারুণ এক বিষয় হতো।

ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন