করোনা চিকিৎসা করাতে ঋণের বোঝা, বিকল্প ‘হাত পাতা’

আহমেদাবাদে একটি হাসপাতালে নিয়ে আসা হয় করোনা রোগীকে
ফাইল ছবি: রয়টার্স

সুপার্জা রেড্ডি ইয়েরুভা জুন মানে দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দেন। এর পর থেকে তাঁর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। ২৭ বছর বয়সী এই মা অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় নিয়মিত চেক-আপের জন্য হাসপাতালে গিয়েছিলেন। এরপরই তাঁর মধ্যে করোনার উপসর্গ দেখা দেয়। খুব অল্প সময়ের মধ্যে তাঁর ফুসফুস আক্রান্ত হয়। নিতে হয় হায়দরাবাদের একটি বেসরকারি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। এক মাস হতে চলল, এখনো সেখানে তিনি।

বিবিসির প্রতিবেদেন বলা হয়, সুপার্জার ছয় বছরের মেয়ে আর নবজাতক ছেলেকে নিয়ে স্ত্রীর সুস্থ হয়ে ফেরার অপেক্ষায় স্বামী বিজয় ইয়েরুভা। স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে চিন্তার পাশাপাশি বড় চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে চিকিৎসার খরচ। দীর্ঘ সময়ের এ চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে হিমশিম অবস্থা ইয়েরুভার। কারণ, হাসপাতালে এরই মধ্যে এসেছে ৬০ লাখ রুপি বিল। দিন দিন এ বিল বাড়ছে। এরই মধ্যে তিনি তাঁর স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা নিয়েছেন, ক্রেডিট কার্ডের সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছেন এবং ব্যাংক থেকে যতটুকু পেরেছেন, ততটা অর্থ তুলেছেন।

সচ্ছল প্রকৌশলী ইয়েরুভার মাসিক বেতন ২ লাখ ২০ হাজার রুপির মতো। তিনি কল্পনাও করেননি তাঁকে অর্থের জন্য মানুষের কাছে হাত পাততে হবে।

আমার পরিবারকে ভালো রাখার জন্য কঠোর পরিশ্রম করি। কোনো দিন কারও সাহায্য চাইনি। এখনো আমাকে মানুষের কাছে অর্থসহায়তা চাইতে হচ্ছে, যা খুব লজ্জা দিচ্ছে।
ইয়েরুভা

ইয়েরুভার এই দুর্দশা বর্তমানে ভারতের হাজারো পরিবারের। করোনা দুটি ঢেউয়ে বিপর্যস্ত দেশটিতে চিকিৎসা চালাতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে হাজারো পরিবার। অনেকে এই বড় অঙ্কের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে অনলাইনভিত্তিক সহায়তা দানকারী কয়েকটি প্ল্যাটফর্মের দ্বারস্থ হচ্ছেন। ভুক্তভোগীকে সহায়তা দিতে স্বাস্থ্যবিমা ও সরকারি সহায়তার বিকল্প হয়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি ওয়েবসাইট।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেটো, মিলাপ ও গিভ ইন্ডিয়া—এই তিনটি অনলাইনভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ভুক্তভোগীদের জন্য আর্থিক সাহায্যের আবেদন জানিয়ে পোস্ট দেয়। তা দেখে সামর্থ্যবান লোকজন সহায়তা করেন। এখন পর্যন্ত ১৬ কোটি ১০ লাখ ডলার সংগ্রহ হয়েছে। ২৭ লাখ দাতার কাছ থেকে এ অর্থ এসেছে।

কেটোর মাধ্যমে আবেদন জানিয়েছেন ইয়েরুভা। এই অনলাইনভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে করোনার দুটি ঢেউয়ের সময়ই তহবিল সংগ্রহের পরিমাণ চার গুণ বেড়েছে। ১২০০ কোভিড-রিলিফ ক্যাম্পেইনের মধ্য দিয়ে ৪ কোটি ডলারের বেশি অর্থ সংগ্রহ হয়েছে।
‘ক্রাউডফান্ডিং: দ্য স্টোরি অব পিপল’ বইয়ের দুই লেখক রাভিনা বানজে ও ইরফান বশির বলেন, অনেকে ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবার খরচের যে ঘাটতি থাকে, তা মেটাতে নিরাপদ বিকল্প হয়ে উঠছে গণসহায়তার এই অর্থ। এই করোনা মহামারির আগেও ভারতে লাখ লাখ অসুস্থ লোকজনের জন্য সর্বসাধারণের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন পড়ছে।

কেটো, মিলাপ ও গিভ ইন্ডিয়া—এই তিনটি অনলাইনভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ভুক্তভোগীদের জন্য আর্থিক সাহায্যের আবেদন জানিয়ে পোস্ট দেয়। তা দেখে সামর্থ্যবান লোকজন সহায়তা করেন।

ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল ও পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন অব ইন্ডিয়ার (পিএইচএফআই) ২০১৮ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১১-১২ সালে চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছে।

তবে এই করোনা মহামারিতে কতজন লোক চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে আর্থিকভাবে শেষ হয়ে গেছেন, সেই হিসাব নেই। ডিউক গ্লোবাল হেলথ ইনস্টিটিউট এবং পিএইচএফআইয়ের প্রাথমিক গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য থেকে বলা হচ্ছে, ভারতে দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ নিজেই নিজের কর্মসংস্থান তৈরি করছেন (সেলফ এমপ্লয়েড) এবং তাঁদের মধ্যে অর্ধেক মানুষ বেতনের অর্থে গুরুতর চিকিৎসার খরচ মেটাতে পারেন না।

ভারতের আজিম প্রেমজি ইউনিভার্সিটির গবেষকদের মতে, ভারতের অতিদরিদ্র শ্রেণির ওপর এই চাপ অনেক বেশি। গত বছর এই শ্রেণির মানুষের সংখ্যা ২৩ কোটি বেড়েছে।

ভারতে জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যয় করা হয়, যা বিশ্বে সর্বনিম্ন। এর ফলে দুই-তৃতীয়াংশ মানুষেরই স্বাস্থ্যবিমা নেই।

‘ক্রাউডফান্ডিং: দ্য স্টোরি অব পিপল’ বইয়ের লেখক ইরফান বশির বলেন, আচমকা জরুরি ভিত্তিতে বড় ধরনের চিকিৎসা হলো আর্থিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে লোকজনকে ধ্বংস করে দেওয়ার একটি পথ।

সবাই হয়তো ভালোভাবে নিজের সমস্যা খুলে বলতে পারেন না, আবার সবারই যে খুব দুঃখভরা গল্প থাকবে, বিষয়টি এমনও নয়।

২০১৮ সাল মোদি সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্য ইনস্যুরেন্স স্কিম ‘মোদিকেয়ার’–এর মাধ্যমে ভারতের অতিদরিদ্র ৫০ কোটি মানুষ বিনা মূল্যে চিকিৎসাসুবিধা পাবে। কিন্তু প্রক্সিমা কনসাল্টিং করোনায় আক্রান্ত রোগীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছে, ওই স্কিম পাওয়ার যোগ্য লোকজনের মধ্যে মাত্র ১৩ শতাংশ মানুষ করোনা চিকিৎসায় সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে এই বিমার সুবিধা দাবি করতে পেরেছেন। তবে হাসপাতালে ভর্তি না হলে এই স্কিমের সুবিধা পাওয়া যাবে না।

দিল্লিতে লোক নায়ক হাসপাতালের করোনা আইসোলেশন ও চিকিৎসা কেন্দ্র
ফাইল ছবি: রয়টার্স

নাগপুর শহরে চিন্ময়ী হিওয়াসে তাঁর ৫৭ বছর বয়সী বাবাকে নিয়ে তিন দিন হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে অক্সিজেন ও খালি শয্যার জন্য ছুটে বেড়িয়েছেন। শয্যা পাওয়ার পর মনে করেছেন, করোনা নিয়ে হয়তো তাঁর লড়াই শেষ হলো। কিন্তু এমআরআই স্ক্যানে ধরা পড়ে, অটো ইমিউন ডিজঅর্ডার ও ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে আক্রান্ত তিনি। এ জন্য তাঁর বাবার প্রতিদিন ৯৪ ডলার মূল্যের একটি ইনজেকশন লাগত। সব মিলিয়ে তাঁর খরচ এসেছে ৩৩ হাজার ৬৩৩ ডলার।

২৫ বছরের তরুণীর কাছে এই খরচ ছিল অকল্পনীয়। চিন্ময়ী মা–বাবার একমাত্র সন্তান। সম্প্রতি স্নাতক শেষ করেছেন। বিল দেখে তিনি হতভম্ব হয়ে যান। তাঁরা বাবা একটি বেসরকারি প্রকৌশল কলেজে চাকরি করেন। মাসিক বেতন ৬০৫ ডলার। এ দিয়েই চলে সংসার।

স্বাস্থ্যবিমার বাইরে চিকিৎসায় তাঁদের সব জমানো অর্থ শেষ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে তাঁরা বন্ধুদের কাছে হাত পাতেন। পাশাপাশি অনলাইনেও অর্থসহায়তা জোগাড় করতে থাকেন। চিন্ময়ী বলেন, ‘অনলাইনে সহায়তা চেয়ে চিকিৎসার প্রায় অর্ধেক খরচ সংগ্রহ করতে পেরেছি। এটা যে কত বড় উপকার বোঝাতে পারব না।’

ভারতে জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যয় করা হয়, যা বিশ্বে সর্বনিম্ন। এর ফলে দুই-তৃতীয়াংশ মানুষেরই স্বাস্থ্যবিমা নেই।

‘ক্রাউডফান্ডিং: দ্য স্টোরি অব পিপল’ বইয়ের আরেক লেখক রাভিনা বানজে বলেন, যাঁদের বেসরকারি হাসপাতালের খরচ চালানোর সামর্থ্য নেই, তাঁদের জন্য মূলত অনলাইনে এই আর্থিক সহায়তা চাওয়া হয়।

প্রায়ই দেখা যায়, সাধারণত তহবিল সংগ্রহকারীর পরিবার বা বন্ধুরাই দাতা হয়ে থাকেন। কিন্তু কিছু বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, ভারত বা বাইরের দেশ থেকে সেলিব্রিটি ও অজানা অনেকে এই সহায়তা দিয়ে থাকেন। সেসব রোগীর গল্প যত বেশি মর্মস্পর্শী হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তার ওপর ভিত্তি করে আসে অর্থ।

বানাজে ও বশির এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁদের ভাষ্য, সবাই হয়তো ভালোভাবে নিজের সমস্যা খুলে বলতে পারেন না, আবার সবারই যে খুব দুঃখভরা গল্প থাকবে, বিষয়টি এমনও নয়।

দেশটির অর্ধেক মানুষেরও ইন্টারনেট সুবিধা নেই। ফলে এক বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য অনলাইনে এই আর্থিক সহায়তা চাওয়ার বিষয়টি ‘তথ্যগত বৈষম্য’ হয়ে উঠতে পারে।
অনলাইনে এই সহায়তা পাওয়ার পরও চিন্ময়ীর আর্থিক সমস্যা শেষ হতে অনেক বাকি। তাঁদের ঋণ পরিশোধ করতে হবে। আর বাবার চিকিৎসা চালাতে হবে লম্বা সময়।

অন্যদের সাহায্য ছাড়া আমরা টেনেটুনে নিজেরাই ইনজেকশনের খরচটা জোগাড় করতে পারব। কিন্তু যাঁরা এ ধরনের সহায়তা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন, তাঁদের অবস্থা তাহলে কী হয়, তা আমি চিন্তাও করতে পারছি না।
চিন্ময়ী

হায়দরাবাদের ইয়েরুভা তাঁর সম্পত্তি, এমনকি বাড়িও বিক্রির মনস্থির করেছেন। তিনি বলেন, ‘স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে হয়তো আমার কয়েক বছর লেগে যাবে। কিন্তু সবার আগে আমি চাই আমার স্ত্রী ফিরে আসুক। আমাদের সন্তানদের জন্য তাদের মা ফিরে আসুক।’

বিবিসি অবলম্বনে লিপি রাণী সাহা