করোনা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, রদবদলে স্বাস্থ্যমন্ত্রীদের সরালেন মোদি

হর্ষবর্ধন ও অশ্বিনী চৌবে

মন্ত্রিসভার রদবদল ঘটালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় ৪৩ জন শপথ নিলেন মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে, যাঁদের মধ্যে রয়েছেন বেশ কিছু পুরোনো মুখ, যাঁরা আগে পূর্ণ মন্ত্রী অথবা স্বাধীন ভারপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী ছিলেন না। প্রত্যাশামতো মন্ত্রী হয়েছেন কংগ্রেস থেকে যোগ দেওয়া জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া, আসামের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল, উত্তর প্রদেশের শরিক আপনা দলের অনুপ্রিয়া প্যাটেল।

বিহারের শরিক জনতা দল যেমন যোগ দিল মন্ত্রিসভায়, তেমনই ওই রাজ্যের পুরোনো শরিক লোকজনশক্তি পার্টি ভেঙে বেরিয়ে আসা নেতা পশুপতিনাথ পারশ মন্ত্রী হলেন।

সব মিলিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার মোট সদস্যসংখ্যা ৭৭। কিন্তু নতুন যাঁরা এলেন বা পুরোনো যাঁদের পদোন্নতি ঘটল তাঁরা নন, তাঁদের ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠলেন বাদ যাওয়া পরিচিত মন্ত্রীরা।

বাস্তবিকই মোদির দ্বিতীয় দফার শাসনকালে এই প্রথম রদবদলের চমক তাই যতটা না নতুন মুখবাহিত, তার চেয়ে বেশি অতি পরিচিত পুরোনো মুখের বিসর্জনে। পুরোনো মন্ত্রিসভার যে ১২ জন সদস্যকে গতকাল সন্ধ্যায় বাদ দেওয়া হলো, তাঁদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হর্ষবর্ধন, যিনি ছিলেন দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী। শুধু হর্ষবর্ধন নন, বাদ পড়েছেন তাঁর ডেপুটি অশ্বিনী চৌবেও। তাঁদের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে বড় হয়ে উঠছে কোভিড মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি।

মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়লেন আইন ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ, পরিবেশমন্ত্রী ও সরকারি মুখপাত্র প্রকাশ জাভড়েকরও। অটল বিহারি বাজপেয়ির আমল থেকে সব মন্ত্রিসভার এই দুই সদস্যকে বাদ দেওয়ার কারণ ঠিক কী, সন্ধ্যায় সেটাও হয়ে ওঠে প্রধান গবেষণার বিষয়। রবিশঙ্কর সম্প্রতি নতুন তথ্যপ্রযুক্তি আইন নিয়ে টুইটার, ফেসবুকের মতো বহুজাতিক ডিজিটাল গণমাধ্যমের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছিলেন। অনবরত হুমকি দিচ্ছিলেন দেশের আইন মানার। সেটাই তাঁর কাল হলো কি না, সেই আলোচনা বড় হয়ে ওঠে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষবর্ধন ও তাঁর ডেপুটি অশ্বিনী চৌবেকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দেওয়ার অর্থ প্রকারান্তরে কোভিড মোকাবিলায় সরকারের ব্যর্থতা স্বীকার করে নেওয়া। দেড় বছর ধরে কোভিডের মোকাবিলা সরকার যেভাবে করে এসেছে, তাতে বারবার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে খোদ প্রধানমন্ত্রীকে। দেশজুড়ে অক্সিজেনের হাহাকার, হাসপাতালের বেডের জন্য অন্তহীন প্রতীক্ষা, চিকিৎসার অভাবে অগুনতি মৃত্যুসহ কোভিডের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার দায় প্রধানমন্ত্রীকে নিতে হয়েছে। তার জন্য দায়ী যে তাঁর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, রদবদলের আগে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী দুজনকেই সরিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত তা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিলেন।

হর্ষবর্ধন নিজে চিকিৎসক। দিল্লিতে চিকিৎসক হিসেবে তাঁর সুনামও রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোভিডকালে তিনি বারবার অনভিপ্রেত বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। সে জন্য বিরোধীদের গালমন্দ করতেও পিছপা হননি। গত এপ্রিল-মে মাসে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সামাল দিতে সরকারের যখন হিমশিম হাল, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যখন ভারতে কোভিডে মৃত্যুর সংখ্যা ঘিরে সংশয় প্রকাশ করা হচ্ছিল, কংগ্রেস যখন সোজাসুজি তাঁর পদত্যাগ দাবিতে সরব, হর্ষবর্ধন তখন রাহুল গান্ধীকে ‘শকুনের’ সঙ্গে তুলনা করে বলেছিলেন, উনি লাশের রাজনীতি করছেন। কোভিডের দরুন আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচিত মোদির প্রয়োজন ছিল ব্যর্থতার দায় কারও একজনের ঘাড়ে চাপানোর।

অতঃপর হর্ষবর্ধন ও অশ্বিনী চৌবেই হয়ে ওঠেন বলির পাঁঠা। জর্ডানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদত্যাগ করেছিলেন কোভিডে ছয়জনের মৃত্যুর দায় ঘাড়ে নিয়ে। হর্ষবর্ধনদের মোদি সরালেন সরকারিভাবে চার লাখ ভারতীয়ের মৃত্যুর পর।

মন্ত্রিসভা রদবদলে ব্যাপক হারে পুরোনো মন্ত্রীদের এমন পদত্যাগ আগে হয়নি। এঁদের মধ্যে রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের দুই মন্ত্রীও। রাজ্য রাজনীতিতে বিজেপির উত্থানের সঙ্গে শুরু থেকেই জড়িয়ে ছিলেন গায়ক বাবুল সুপ্রিয়। ২০১৪ সালে লোকসভার ভোটে আসানসোলে প্রচারে গিয়ে মোদি প্রকাশ্যে জনতাকে বলেছিলেন, ‘মুঝে বাবুল চাহিয়ে’।

আসানসোলের জনতা বাবুলকে জিতিয়েছিল। মোদিও তাঁকে মন্ত্রী করেছিলেন। পাঁচ বছর পর বাবুল ওই কেন্দ্রে জেতেন দ্বিগুণ ভোট বেশি পেয়ে। সেই বাবুল এবারের বিধানসভা ভোটে নিজে যেমন হেরেছেন, তেমনই হারিয়েছেন আসানসোলের সাত বিধানসভার পাঁচটি। রাজ্য রাজনীতিতে তো বটেই, মোদির কাছেও বাবুলের গুরুত্ব যে কমে গেছে, তাঁকে পদত্যাগ করতে বলা তার প্রমাণ। একইভাবে সরে যেতে হলো রাজ্যের দ্বিতীয় মন্ত্রী রায়গঞ্জের সাংসদ দেবশ্রী চৌধুরীকেও। দুই বছর ধরে নারী ও শিশুকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তো বটেই, রাজ্য রাজনীতিতেও দাগ কাটার মতো কিছুই তিনি করে যেতে পারেননি।

এই দুজনের বদলে মোদির মন্ত্রিসভায় জায়গা পেলেন চারজন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন উত্তরবঙ্গের সেই দুই নেতা যাঁরা সম্প্রতি পৃথক উত্তরবঙ্গের দাবি জানিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছেন। জন বার্লা ও নিশীথ প্রামাণিক। গত বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের যে অঞ্চলে বিজেপি ভালো করেছে, এই দুজন সেই উত্তরবঙ্গের প্রতিনিধি। স্পষ্টতই এঁদের মন্ত্রী করে বিজেপি উত্তরবঙ্গের ‘অবহেলার’ দিকেই নজর ফেরাতে চাইছে। দক্ষিণবঙ্গের দুই মন্ত্রী বনগাঁর সাংসদ শান্তনু ঠাকুর ও বাঁকুড়ার চিকিৎসক সুভাষ সরকার।

দক্ষিণবঙ্গে বিজেপির বাজি যে মতুয়ারা, এই রদবদলের মধ্য দিয়ে তা বোঝানো হচ্ছে। বনগাঁ কেন্দ্র থেকে জেতা মতুয়া নেতা শান্তনু ঠাকুরকে মোদি মন্ত্রী করলেন।

নাগরিকত্বের প্রশ্নে শান্তনু প্রবল সংশয় ও সন্দেহ প্রকাশ করলেও মতুয়াদের যে বিজেপি হতাশ করতে চায় না, এই সিদ্ধান্ত তার প্রমাণ। গত মার্চে বাংলাদেশ সফরের সময় শান্তনুকে সঙ্গে নিয়ে মোদি ওড়াকান্দি গিয়েছিলেন ঠাকুর হরিচাঁদ ও ঠাকুর গুরুচাঁদের মতুয়া ধামে। শান্তনু প্রথম মতুয়া, যিনি কেন্দ্রে মন্ত্রী হলেন। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের লক্ষ্য দক্ষিণবঙ্গে আগামী লোকসভা ভোটে মতুয়া সমর্থন নিশ্চিত করা।

বিজেপির দাবি, এই রদবদলের আগে মন্ত্রীদের কাজের খতিয়ান করা হয়েছে। হর্ষবর্ধন, অশ্বিনী চৌবে, রবিশঙ্কর প্রসাদ অথবা প্রকাশ জাভড়েকরদের অপসারণ যদি কাজের নিরিখে হয়ে থাকে, বিরোধীদের দাবি, তা হলে হর্ষবর্ধনের সঙ্গে বাদ যাওয়ার কথা অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ ও কৃষিমন্ত্রী নরেন্দ্র সিং টোমারের। বরাবর ছোট মন্ত্রিসভার কথা বলে আসা প্রধানমন্ত্রী এই সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে নজর দিলেন প্রধানত উত্তর প্রদেশসহ পাঁচ রাজ্যের দিকে, যেখানে আগামী বছরের গোড়ায় ভোট। উত্তর প্রদেশ থেকে স্থান পেলেন বাড়তি সাত মন্ত্রী এবং তা করতে গিয়ে নজর দেওয়া হয়েছে জাতের সমীকরণের দিকে। গুরুত্ব পেয়েছেন তফসিলি ও অনগ্রসর শ্রেণির নেতারা। তা ছাড়া প্রতিষ্ঠিত নেতাদের চেয়েও প্রধানমন্ত্রী বেশি ভরসা রাখতে চেয়েছেন অল্প বয়সী, শিক্ষিত, কর্মঠদের প্রতি।