বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আজ শুক্রবার সকালে জাতির প্রতি ভাষণে নরেন্দ্র মোদি বলেন, রাজ্যসভার শীতকালীন অধিবেশনেই আইনগুলো প্রত্যাহারের আনুষ্ঠানিক কাজ শেষ করবে সরকার। অধিবেশন শুরু হচ্ছে ২৯ নভেম্বর। আইন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে আন্দোলনকারী কৃষকদের খেত-খামারে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবনে সব সময় কৃষকদের কথা ভেবেছি। কৃষকের হিতে সবকিছু করেছি। আসুন, সবকিছু নতুনভাবে শুরু করা যাক।’

দেড় বছর আগে কোভিড পরিস্থিতির সময় এই তিন কৃষি আইন প্রণয়নে কেন্দ্র অধ্যাদেশ জারি করেছিল। তারপর গত বছরের সেপ্টেম্বরে সংসদের খণ্ডকালীন অধিবেশনে প্রায় বিনা আলোচনায় বিরোধীদের দাবি উপেক্ষা করে তিন আইন পাস করা হয়।

প্রথমটি ‘অত্যাবশ্যক পণ্য (সংশোধনী) আইন’ বা ‘দ্য এসেনশিয়াল কমোডিটিজ (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট’। দ্বিতীয়টি ‘কৃষি পণ্য লেনদেন ও বাণিজ্য উন্নয়ন আইন’ বা ‘ফারমার্স প্রডিউস ট্রেড অ্যান্ড কমার্স (প্রমোশন অ্যান্ড ফ্যাসিলিয়েশন) অ্যাক্ট’। তৃতীয়টি ‘কৃষক সুরক্ষা ও ক্ষমতায়ন (মূল্য এবং কৃষি পরিষেবাসংক্রান্ত) আইন’ বা ‘ফারমার্স (এমপাওয়ারমেন্ট অ্যান্ড প্রোটেকশন) অ্যাগ্রিমেন্ট অন প্রাইস অ্যান্ড ফার্ম সার্ভিসেস অ্যাক্ট’।

মোদি সরকারের দাবি ছিল, মূলত তিনটি উদ্দেশ্য পূরণের জন্য এই তিনটি কৃষি আইন কার্যকর করা হচ্ছে। প্রথমটি হচ্ছে কৃষিক্ষেত্রে ফড়িয়া বা দালালদের আধিপত্য কমিয়ে কৃষকের আয় বাড়ানো। দ্বিতীয়টি হচ্ছে রাজ্যগুলোতে চুক্তিভিত্তিক চাষের ব্যবস্থা আইনসিদ্ধ করা ও তৃতীয়টি হচ্ছে কৃষিপণ্য বিপণন নিয়ে যে আইন রয়েছে, তা দূর করে আন্তরাজ্য কৃষিপণ্যের অবাধ বাণিজ্যের রাস্তা খুলে দেওয়া।

অত্যাবশ্যক পণ্য (সংশোধনী) আইনের মাধ্যমে বেসরকারি সংস্থাগুলোকে সরাসরি কৃষকদের থেকে কৃষিপণ্য কিনে মজুত ও বিক্রির অধিকার দেওয়া হয়। আন্দোলনকারী কৃষক এবং বিরোধীদের অভিযোগ, এই আইন আসলে সরকারি সহায়ক মূল্য তুলে দেওয়ার গোড়াপত্তন। কৃষকের উৎপাদিত কৃষিপণ্য কেনার দায় সরকার নিজেদের ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাইছে। আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়, বর্তমানে সরকার কৃষকদের যে পরিমাণ সহায়ক মূল্য দেয়, তা বেসরকারি সংস্থা বা কোনো ব্যবসায়ী দেবেন না। তা ছাড়া সরকার চাল, ডাল, গম, ভোজ্যতেল, তৈলবীজ ইত্যাদি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য মজুতের ঊর্ধ্বসীমা বলে কিছু না রাখায় অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ঘুরপথে চলে যাবে বড় ব্যবসায়ীদের হাতে।

বিতর্কিত কৃষি আইন বিষয়ে বিবিসি জানিয়েছে, নতুন আইনে একসঙ্গে খামারের পণ্য বিক্রয়, মূল্য নির্ধারণ ও সংরক্ষণ সম্পর্কিত নীতিগুলো শিথিল করা হয়। এ নীতিগুলো কয়েক দশক ধরে ভারতের কৃষকদের মুক্ত বাজার থেকে রক্ষা করেছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর মধ্যে একটি হলো, আইনে কৃষকদের পণ্যগুলো সরাসরি বেসরকারি ক্রেতাদের কাছে বাজারমূল্যে বিক্রি করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। অধিকাংশ কৃষক বর্তমানে তাঁদের বেশির ভাগ পণ্য সরকারনিয়ন্ত্রিত পাইকারি বাজারে বিক্রি করেন। এ আইনে ক্রেতারা ভবিষ্যতে বিক্রির জন্য চাল, গম এবং ডালের মতো খাবার মজুত করার অনুমতি পাবেন, যা আগে সরকারি-অনুমোদিত এজেন্টরা করতে পারত।

বিক্ষোভকারীরা বলছেন, কৃষিপণ্য বিক্রয় এবং উচ্চ ভর্তুকির ভারতের কঠোর আইন কয়েক দশক ধরে কৃষকদের বাজার শক্তি থেকে রক্ষা করেছে, তাই এটি পরিবর্তন করার দরকার নেই। কিন্তু সরকারের যুক্তি ছিল, ছোট কৃষকদের চাষকে লাভজনক করার সময় এসেছে এবং নতুন আইনে তা করা সম্ভব হবে।

নরেন্দ্র মোদি তাঁর বক্তৃতায় বলেছেন, দেশের ছোট কৃষকদের কথা ভেবেই তিনটি কৃষি বিল আনা হয়েছিল। দেশের কৃষক সংগঠন, কৃষি অর্থনীতিবিদদের এই দাবি বহুদিনের।
এদিকে কেন্দ্রের তিনটি কৃষি আইন প্রত্যাহারের ঘোষণার পরপর একের পর এক ‘জয়’ ঘোষণা করছেন বিরোধী নেতারা। রাহুল গান্ধী থেকে শুরু করে ডেরেক ও’ব্রায়েন—সবাই কেন্দ্রকে তোপ দেগে কৃষকদের জয়ের উল্লেখ করেছেন। আর কৃষি আইন প্রত্যাহারে কৃষকদের ‘আন্তরিক শুভেচ্ছা’ জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

টুইট বার্তায় মমতা লেখেন, ‘যাঁরা নিরলসভাবে লড়াই করেছেন এবং বিজেপির নিষ্ঠুরতায় বিভ্রান্ত হননি, সেই সব কৃষককে আমার আন্তরিক অভিনন্দন। এটি আপনাদের বিজয়! এই লড়াইয়ে যাঁরা তাঁদের প্রিয়জনকে হারিয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা।’

এ প্রসঙ্গে রাহুল গান্ধী টুইট করে লেখেন, ‘সত্যাগ্রহের মাধ্যমে দেশের অন্নদাতারা তাঁদের মাথা ঝুঁকিয়ে দিলেন, যাঁরা ঔদ্ধত্যে পরিপূর্ণ ছিলেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে এই জয়ে সবাইকে শুভেচ্ছা। জয় হিন্দ, জয় কিষান!’

ভারতীয় কিষান ইউনিয়ন (বিকেইউ) নেতা রাকেশ টিকায়েত বলেছেন, বিতর্কিত কৃষি আইন দেশটির পার্লামেন্টে বাতিল হলেই কেবল তাঁদের চলমান আন্দোলন প্রত্যাহার করা হবে।

এদিকে মোদির সমর্থনে টুইট বার্তায় অমিত শাহ বলেছেন, কৃষি আইন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘোষণা এক দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ।

ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন