বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

শুক্রবার ছিল শিখ ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র ‘গুরু পরব’। শিখদের প্রথম গুরু নানক দেবের জন্মবার্ষিকী। এ উপলক্ষে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের কারতারপুর করিডর দেড় বছর বন্ধ থাকার পর গত বৃহস্পতিবার খুলে দেওয়া হয়। পাকিস্তানের সাড়ে চার কিলোমিটার অভ্যন্তরে কারতারপুরে গুরু নানক দেহ রেখেছিলেন। সেখানকার দরবার সাহেব গুরুদ্বার শিখ ধর্মাবলম্বীদের কাছে তাই অতি পবিত্র। গুরু নানক দেবের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষকেই প্রধানমন্ত্রী তাই এ ঘোষণার উপযুক্ত সময় বলে মনে করেছেন।

default-image

সেই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে আন্দোলনকারী কৃষকদের খেত-খামারে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবনে সব সময় কৃষকদের কথা ভেবেছি। কৃষকের হিতে সবকিছু করেছি। লক্ষ কোটি টাকা সরকার খরচ করেছে। কৃষকের হিতেই এই তিন আইন। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমাদের সেবায় ও তপস্যায় নিশ্চয় কিছু ঘাটতি থেকে গিয়েছে। কিছু কৃষককে এই যুগান্তকারী আইন সন্তুষ্ট করতে পারেনি। আসুন, সবকিছু নতুনভাবে শুরু করা যাক।’

দেড় বছর আগে কোভিড পরিস্থিতির সময় এই তিন কৃষি আইন প্রণয়নে কেন্দ্র অর্ডিন্যান্স জারি করেছিল। তারপর গত বছর সেপ্টেম্বরে সংসদের খণ্ডকালীন অধিবেশনে প্রায় বিনা আলোচনায় বিরোধীদের দাবি উপেক্ষা করে তিন আইন পাস করানো হয়। আরও বিবেচনার জন্য আইনগুলো সংসদীয় কমিটিতে পাঠানোর দাবিও নাকচ করা হয়। সেই থেকে দেশের প্রায় ৪০টি কৃষক সংগঠন এক জোট হয়ে ‘সংযুক্ত কৃষক মোর্চা’ গঠন করে আন্দোলনকে রাজধানী দিল্লির প্রান্তে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। দিল্লির তিন সীমান্তে সেই থেকে অবস্থান করছেন হাজার হাজার কৃষক। শীত, বর্ষা, গ্রীষ্মের দাবদাহও তাঁদের টলাতে পারেনি। সরকারের যাবতীয় দমন-পীড়ন সত্ত্বেও কৃষকেরা ফিরে যাননি। বরং সময়-সময় রেল, সড়ক অবরোধ করেছেন। হরিয়ানা-পাঞ্জাবে বিজেপি মন্ত্রী-নেতাদের ঘেরাও করেছেন। সরকারের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক সত্ত্বেও সরকার আইন প্রত্যাহারে রাজি হয়নি।

default-image

অবশেষে সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কেন্দ্রকে আইন স্থগিত রাখার পরামর্শ দেন। শেষ পর্যন্ত তাতেও কৃষককুল সন্তুষ্ট না হওয়ায় ও দিল্লি অবরোধ তুলে না নেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী বাধ্য হলেন মাথা নোয়াতে। গত সাত বছরের শাসনামলে সরকার কোনো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ফিরিয়ে নেয়নি। সেই নিরিখে এটাই মোদি সরকারের প্রথম চরিত্রবিরোধী সিদ্ধান্ত।

পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবনে সব সময় কৃষকদের কথা ভেবেছি। কৃষকের হিতে সবকিছু করেছি। লক্ষ কোটি টাকা সরকার খরচ করেছে। কৃষকের হিতেই এই তিন আইন। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমাদের সেবায় ও তপস্যায় নিশ্চয় কিছু ঘাটতি থেকে গিয়েছে। কিছু কৃষককে এই যুগান্তকারী আইন সন্তুষ্ট করতে পারেনি। আসুন, সবকিছু নতুনভাবে শুরু করা যাক
নরেন্দ্র মোদি, ভারতের প্রধানমন্ত্রী

কিন্তু তা করার আগে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ১৫ মিনিটের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, এই তিন আইন কৃষকদের স্বার্থরক্ষায় কতটা প্রয়োজনীয়। আইনগুলোর লক্ষ্য যে দেশের ছোট কৃষক, যাঁদের জমির পরিমাণ দুই হেক্টরের চেয়ে কম, সে কথাও তিনি বলেন। কিন্তু তারপর জোর দিয়ে বলেন, ‘এত দিন ধরে সৎভাবে দেশের সেবা করছি। সততার সঙ্গে সব করেছি। এই সৎ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কিছু কৃষককে আমরা সন্তুষ্ট করতে পারিনি। নতুন আইনের সুফল বোঝাতে পারিনি। আজ গুরু পরবের দিন কাউকে দোষারোপ করতে চাই না। তিন আইন প্রত্যাহার করে নিচ্ছি।’
দেড় বছরের বেশি সময় ধরে যে দাবি সরকার মানেনি, বারবার যে আইনকে ‘যুগান্তকারী’ সিদ্ধান্ত বলে বর্ণনা করা হয়েছে, হঠাৎ কেন প্রধানমন্ত্রী তা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিলেন? উত্তরটা রয়েছে আগামী বছরের গোড়ায় উত্তর প্রদেশসহ পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের মধ্যে।

পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরাখন্ড, গোয়া ও উত্তর প্রদেশে আগামী বছর ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচন। গোয়া ছাড়া বাকি চার রাজ্যেই কৃষক আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়েছে। উত্তরাখণ্ড লাগোয়া হিমাচল প্রদেশেও ভোট সামনের বছরের শেষে। সেখানে সাম্প্রতিক উপনির্বাচনে শাসক বিজেপি চারটি আসনেই কংগ্রেসের কাছে হেরেছে। পাঞ্জাব-হরিয়ানায় বিজেপির কোনো আশা নেই। তারা সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন উত্তর প্রদেশ নিয়ে। এ রাজ্যের পশ্চিম প্রান্তের সব কটি জেলা কৃষক আন্দোলনে উত্তাল। কৃষকেরা সর্বত্র ‘বিজেপিকে ভোট নয়’ দাবি জানিয়েছে এখন থেকেই। প্রচারও শুরু হয়েছে। রাজ্যে আদিত্যনাথের সরকারও নানাভাবে জেরবার। কোভিড মোকাবিলার ব্যর্থতা, পুলিশি বর্বরতা এবং রাজ্য পরিচালনায় অত্যধিক ‘ঠাকুরবাদ’ নানাভাবে প্রতিরোধ বাড়িয়েছে। বিজেপি জয় সম্পর্কে আশান্বিত নয়।

default-image

সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন জনমত সমীক্ষাও জানাচ্ছে, বিজেপি ক্ষমতা ধরে রাখতে হয়তো পারবে, কিন্তু আসন কমবে শতাধিক। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সম্প্রতি নির্বাচনী সফরে গিয়ে প্রকাশ্য জনসভায় সরাসরি বলেন, রাজ্যে না জিততে পারলে দিল্লি শাসন করা কঠিন। বোঝাই যাচ্ছে, এই পরিস্থিতিতে ‘দেশের অন্নদাতাদের’ অখুশি রেখে প্রধানমন্ত্রী ভোটে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে রাজি নন। স্বভাববহির্ভূত কাজ করে জেদ ভেঙে কৃষকদের সমর্থন পেতে তাই তিনি মরিয়া। সে জন্য ‘গুরু পরব’–এর পবিত্র তিথিকে বেছে নিয়ে বিতর্কিত তিন কৃষি আইন প্রত্যাহারের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী উত্তর প্রদেশে রওনা হলেন। ২০২৪ সালে দিল্লির মসনদে ফিরতে হলে ২০২২ সালে ‘মিনি ইন্ডিয়া’ বলে পরিচিত উত্তর প্রদেশ তাঁকে জিততেই হবে।

ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন