default-image

ঝাড়ু-ঝড়ে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ও কংগ্রেসকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিল্লি দখল করল আম আদমি পার্টি (এএপি)। ৭০ আসনবিশিষ্ট বিধানসভায় এই দল ৬৭ আসন জিতল। বাকি তিনটি আসন জিতল বিজেপি।
বিজেপির মুখ্যমন্ত্রিত্বের দাবিদার ভারতের প্রথম নারী আইপিএস (ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিস) কর্মকর্তা কিরণ বেদী কৃষ্ণনগর কেন্দ্রে আড়াই হাজার ভোটে হেরেছেন। এটি ছিল বিজেপির দুর্গ। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হর্ষবর্ধন আগেরবার এখান থেকে ২৫ হাজার ভোটে জিতেছিলেন। এই প্রথম কংগ্রেস দিল্লিতে একটি আসনও পেল না। সব দিক থেকে দিল্লি বিধানসভার এবারের ভোট ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব হয়ে রইল।
কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকার গড়েও ৪৯ দিন রাজত্বের পর গত বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি ইস্তফা দিয়েছিলেন এএপির প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল। সেই ১৪ ফেব্রুয়ারিই ঐতিহাসিক রামলীলা ময়দানে তিনি ও তাঁর মন্ত্রিসভা শপথ নেবেন—এটাই দলের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত। জয় নিশ্চিত ও নিরঙ্কুশ জানার পর কেজরিওয়াল দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, এই রায় অত্যাশ্চর্য। তিনি এ কথাও বলেন, এই জয় সততা ও সত্যের জয়। একই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দেন, কেউ যেন উদ্ধত না হয়। যাঁর আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়ে কেজরিওয়ালের রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল, সেই প্রবীণ গান্ধীবাদী আন্না হাজারে কেজরিওয়ালকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। পাশাপাশি একদা তাঁর শিষ্যকে এ কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন, অতীতে যে ভুল তিনি করেছিলেন, তার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটান। আর তিনি যেন এমন সাধারণই থাকেন, সাধারণ জীবন যাপন করেন।
কেজরিওয়ালকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও। ভাবি মুখ্যমন্ত্রীকে তিনি চায়ের আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেছেন, চলুন, হাতে হাত মিলিয়ে আমরা নতুন দিল্লি গড়ে তুলি। মোদির উদ্দেশে এএপি নেতা কুমার বিশ্বাস বলেছিলেন, বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোকে তিনি যত স্নেহ করেন, সেই স্নেহ-ভালোবাসা দিল্লির সরকার যেন পায়। জবাবে মোদি বলেছেন, দিল্লির বিকাশে কেন্দ্র পূর্ণ সহযোগিতা করবে। একের পর এক কেন্দ্রে পরাজয় নিশ্চিত জেনে দিল্লির প্রচারাভিযানের নেতৃত্বে থাকা কংগ্রেস নেতা অজয় মাকেন দলের সাধারণ সম্পাদক পদে ইস্তফা দেন। তাঁর জামানতও বাজেয়াপ্ত হয়েছে। জামানাত বাজেয়াপ্ত হয়েছে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির কন্যা শর্মিষ্ঠারও। তিনি গ্রেটার কৈলাস কেন্দ্রে কংগ্রেসের প্রার্থী ছিলেন। আশ্চর্যের বিষয়, যে দিল্লি টানা ১৫ বছর কংগ্রেস শাসন করেছে, সেখানে ৫৩ কেন্দ্রে জামানত হারিয়েছে তারা। দলের ইতিহাসে এটাও অভূতপূর্ব। কিরণ বেদীও হারের পর কেজরিওয়ালকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে তিনি হারের দায় পার্টির ওপর চাপিয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘দল যেভাবে বলেছে সেভাবেই আমি চলেছি। এটা তাই দলের পরাজয়।’
গতকাল মঙ্গলবার ভোট গণনা শুরু হয় সকাল আটটা থেকে। ১৭টি গণনা কেন্দ্রে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে প্রথম গোনা হয় পোস্টাল ব্যালট। তখন থেকেই এএপি এগিয়ে। এরপর ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন খোলা হয়। একের পর এক মেশিনের ফল এএপির দিকে আসতে থাকে। সেই সঙ্গে শুরু হয় উল্লাস। পশ্চিম দিল্লিতে প্যাটেল নগরে এএপির কার্যালয়ের সামনে মঞ্চ বাঁধা হয় আগের রাতে। মঙ্গলবার সকাল থেকেই সেই অঞ্চল লোকে লোকারণ্য। হাতে ঝাড়ু, মাথায় আম আদমি টুপি এবং জাতীয় পতাকা হাতে অতি সাধারণ মানুষ এক একটি জয়ের খবরে উল্লসিত হতে থাকে। পাশাপাশি পণ্ডিত পন্থ মার্গে রাজ্য বিজেপির অফিসে ঘনাতে থাকে বিষণ্নতা। ঝকঝকে দিন হলেও দুপুর ১২টার আগেই সেখানে নেমে আসে অন্ধকার। সমর্থকদের হা-হুতাশের মাঝে অশোকা রোডে দলের সদর দপ্তরে মাঝারি মাপের নেতারা নিজেদের মধ্যে ব্যস্ত থাকেন বিপর্যয়ের বিশ্লেষণে।
কী করে এএপির পক্ষে এই অস্বাভাবিক জয় সম্ভব হলো? কিংবা কেন বিজেপি ও কংগ্রেসের এই বিপর্যয়? কারণ বিশ্লেষণের প্রথমেই উঠে আসছে ভোটের সময় নির্বাচনে ভুল করা। এক বছর রাষ্ট্রপতি শাসনের আওতায় দিল্লিকে না রেখে লোকসভা ভোটের সময়েই দিল্লির ভোট করা হলে এই বিপর্যয় ঘটত না। তখন মোদি হাওয়া ছিল, এএপিও তখন তেমন সংগঠিত ছিল না। বিজেপির দ্বিতীয় ভুল কিরণ বেদীকে দলে টেনে তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী ঘোষণা করা। দলের ইতিহাসে এমন কখনো ঘটেনি। কিরণকে দলে টানার প্রশ্নে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘও (আরএসএস) চরম অখুশি ছিল। এই সিদ্ধান্তে দিল্লির যুযুধান নেতারাও একজোট হয়ে ‘বহিরাগত’ কিরণকে ‘শিক্ষা’ দিতে সচেষ্ট হলেন। তৃতীয় ভুল, বিদ্যুৎ-পানির বিল কমানোর বিষয়ে এএপি স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিলেও বিজেপি ‘পপুলিজম’-এর ধারকাছ দিয়ে হাঁটেনি। এএপি যেখানে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে প্রথম থেকেই সরব, বিজেপি সেখানে একটা কথাও বলেনি। অথচ গত দুই মাসে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৩ রুপি কমেছে। কিন্তু নিত্যদিনের বাজারে সেই মূল্যহ্রাসের কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। দুর্নীতি রোধ ও অটো-রিকশাচালক-হকারদের ওপর পুলিশি ‘অত্যাচারের’ বিরুদ্ধে এএপি প্রথম থেকেই সরব। বিজেপি সেখানে একেবারেই নীরব। বিজেপির প্রচারে মোদির সাফল্য, ভারতের অগ্রগতি, আন্তর্জাতিক স্তরে দেশের উন্নীত হওয়া এবং অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে ভারতের উত্থান প্রাধান্য পেয়েছে, যেখানে এএপি তুলে ধরেছে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত মানুষের দৈনন্দিন জীবন যাপনের দুর্দশা ঘোচানোর অঙ্গীকার। আর এসবের মধ্য দিয়ে এএপি ভেঙে দিয়েছে জাতপাত, ধর্ম, আঞ্চলিকতা ও ধনী-দরিদ্র-মধ্যবিত্তের বেড়া।
কিন্তু শুধু এই-ই নয়। কংগ্রেসের অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া এই নির্বাচনে এএপির কাছে যেমন পৌষ মাস হয়ে এসেছে, তেমনই বিজেপির কাছে হয়েছে সর্বনাশের কারণ। এক বছর আগে দিল্লি বিধানসভার ভোটে কংগ্রেস পেয়েছিল ২৫ শতাংশ ভোট ও আটটি আসন। গত লোকসভা ভোটে সেই হার ১৫ শতাংশে নেমে যায়। এবার কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র ৯ শতাংশ ভোট। কংগ্রেস হীনবল দেখে তাদের ত্যাগ করেছে মুসলমান ও তফসিল ভোটার। এই বিপুল সমর্থন যেমন পাল্লা ঝুলিয়েছে এএপির, তেমনই হয়ে দাঁড়িয়েছে বিজেপির সর্বনাশের কারণ।
প্রশ্ন উঠছে নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে। তবে কি মোদি-হাওয়া ফিকে হতে শুরু করেছে? নিশ্চিত করে এই উত্তর দেওয়ার সময় এখনো হয়নি। যদিও এটাও ঠিক, গত নয় মাসে সাধারণের জনজীবনে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন এখনো ঘটেনি। বিশেষত মূল্যবৃদ্ধি রোখার ক্ষেত্রে। এই বছরের অক্টোবরে বিহার বিধানসভার ভোট। রাষ্ট্রীয় জনতা দলের (আরজেডি) নেতা লালুপ্রসাদ বলে দিয়েছেন, বিজেপি-বিরোধিতায় ওই রাজ্যে বিরোধীরা একজোট। তিন দিনের মাথায় পশ্চিমবঙ্গে দুটি উপনির্বাচন। বিজেপি সেখানে কেমন করে, সে দিকেও রয়েছে রাজনীতিকদের নজর। এই ধাক্কা কাশ্মীরে সরকার গঠনে বিজেপির উদ্যোগে ধাক্কা দেবে কি না সেই প্রশ্ন উঠছে। সেই সঙ্গে রয়েছে এই আগ্রহ, আসন্ন বাজেটে মূল্যবৃদ্ধিতে বিপন্ন মধ্যবিত্তদের জন্য কোনো সুখবর আসে কি না।

বিজ্ঞাপন
ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন