ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) শাসিত হরিয়ানা রাজ্যের গুরুগ্রামের (সাবেক নাম গুরগাঁও) পাতৌদি শহরে গতকাল শনিবার দুপুরে বড়দিনের অনুষ্ঠানে অন্তত ২০ জন হিন্দুত্ববাদী একটি স্কুলে ঢুকে পড়েন। তাঁদের একজন ভাষণও দেন। সে বলে, ‘আমরা যিশুকে অসম্মান করি না। কিন্তু ভারতীয় সংস্কৃতিকে এরা ধ্বংস করছে। এদের রুখতে আপনারা সাহায্য করুন। সবাই চিৎকার করে বলুন জয় শ্রীরাম, সনাতন ধর্মের জয়।’ মুঠোফোনে তোলা চিত্রে ঘটনাটি দেখা যায়।

default-image

ঘটনাস্থল থেকে চিত্রটি প্রথম আলোকে পাঠান মহর্ষি সিং নামের স্থানীয় এক ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, ‘অনুষ্ঠানে বাচ্চারা ছিল, তারা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে মধ্যাহ্নভোজ শেষ না করেই বাসায় ফিরে যায়।’ ভারতে মুসলিম ও শিখের পর এবার খ্রিষ্টানদের ওপর আক্রমণ বাড়ছে বলেও মন্তব্য করেন পাঠান মহর্ষি সিং।

হিন্দুত্ববাদীদের বক্তব্য ছিল, স্কুলে ধর্মান্তকরণ করা হচ্ছিল। পুলিশ সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে, এ রকম কিছু হয়নি। এটা হিন্দুত্ববাদীদের বোঝানোর পর তারা ঘটনাস্থল থেকে চলে যায়। উল্লেখ্য, সপ্তাহ কয়েক আগে গুরুগ্রামে মুসলিমদের নামাজ পড়ায় বাধা দেওয়া হয়। নামাজ পড়ার ৩৭টি সরকার অনুমোদিত স্থান থেকে হিন্দুত্ববাদীদের চাপে আটটি স্থান বাদ দিতে বাধ্য হয় পুলিশ।

default-image

গতকাল উত্তর প্রদেশ রাজ্যের বিভিন্ন স্থানেও সান্তা ক্লজের কুশপুত্তলিকা পোড়ায় হিন্দুত্ববাদীরা, মিছিল করে গেরুয়া পতাকা নিয়ে, জয় শ্রীরাম ধ্বনিও দেয়। আতঙ্কগ্রস্ত খ্রিষ্টানরা অনেক জায়গাতেই বড় মাপের অনুষ্ঠান করেনি বলে উত্তর প্রদেশের সাংবাদিকরা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন।

পুরো ডিসেম্বরে ভারতে খ্রিষ্টানদের ওপর হামলা হয়েছে। দিন দশেক আগে গুজরাটে স্বয়ং মাদার তেরেসার মিশনারিজ অব চ্যারিটির বিরুদ্ধে জোর করে ধর্মান্তকরণের অভিযোগ আনা হয়। বলা হয়, মিশনারিজ অব চ্যারিটির একটি আবাসে ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত ধর্মান্তকরণ হয়েছে। প্রায় একই সময়ে একই কারণে মধ্যপ্রদেশের বিদিশা জেলার সেন্ট জোসেফ স্কুলে হামলা চালান হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কর্মীরা। মিশনারিজ এবং সেন্ট জোসেফ স্কুল কর্তৃপক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

পশ্চিমবঙ্গেও ২০ থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ধর্মান্তকরণবিরোধী কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে বলে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুরেন্দ্র জৈন জানিয়েছেন। যদিও পশ্চিমবঙ্গে এখনো কোনো ধর্মাবলম্বীর ওপর হামলার খবর পাওয়া যায়নি। উত্তর-পূর্ব ভারতে হিন্দুত্ববাদীদের প্রভাব বাড়লেও সেখানে খ্রিষ্টানদের সংখ্যা বেশি থাকায়, কোনো সংঘাতের খবর পাওয়া যায়নি।

দক্ষিণ ভারতের বিজেপিশাসিত রাজ্য কর্ণাটক থেকে অনেকগুলো হামলার খবর পাওয়া গেছে। এর অন্যতম কারণ, কর্ণাটক গত বৃহস্পতিবার ধর্মান্তরবিরোধী বিল পাস করেছে। এ বিলে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির ধর্ম কোনোভাবে পরিবর্তন করা বা করানো যাবে না। অতীতে এ ধরনের আইন হয়েছে বিজেপিশাসিত রাজ্য উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ এবং হিমাচল প্রদেশে। এ তিন রাজ্যে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার বেড়েছে বলে বিজেপির রাজনৈতিকবিরোধী, সংখ্যালঘু ও মানবাধিকার সংগঠন মনে করে। মানবাধিকার সংগঠন পিপলস ইউনিয়ন অব সিভিল লিবার্টিজের সভাপতি ওয়াই জে রাজেন্দ্র বলেন, বিলটি সংবিধানের ২৫ নম্বর শর্তকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করেছে। শর্ত ২৫–এ বলা হয়েছে, যেকোনো মানুষের যেকোনো ধর্ম পালন ও অভ্যাসের স্বাধীনতা রয়েছে।

বৃহস্পতিবার দক্ষিণ কর্নাটকের চিক্কাবাল্লাপুর জেলার ১৬০ বছরের সেন্ট জোসেফ গির্জায় আক্রমণ করে ভাঙ্গা হয় এক সন্তের মূর্তি। এর সপ্তাহখানেক আগে দক্ষিণ কর্নাটকের কলোর জেলায় খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বই পুড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রায় একই সময় পশ্চিম কর্নাটকের হুব্বালি জেলার এক গির্জায় ঢুকে হিন্দুত্ববাদীরা স্লোগান দেয়। ইভানজেলিক্যাল ফেলোশিপ অব ইন্ডিয়া নামের একটি খ্রিষ্টান সংগঠনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন থেকে উদ্ধৃত করে দক্ষিণ ভারতের প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বরের মধ্যে কর্নাটকে খ্রিষ্টান সম্প্রদায় ৩৯ বার আক্রান্ত হয়েছে।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন একসঙ্গে একটি রিপোর্টও সম্প্রতি প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, খ্রিষ্টানদের ওপর (নভেম্বর পর্যন্ত) ৩০৫টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে শুধু ৩ অক্টোবরে ঘটেছে ১৮টি ঘটনা। সেপ্টেম্বরে সবচেয়ে বেশি, ৬৯টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।

খ্রিষ্টানদের ওপর এ ধারাবাহিক আক্রমণ সম্পর্কে একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে আমেরিকার দৈনিক ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ বলেছে, ‘খ্রিষ্টানবিরোধী বাহিনী ভারতের গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্ছে, গির্জায় হামলা চালাচ্ছে, ধর্মীয় পুস্তক পোড়াচ্ছে, স্কুল আক্রমণ করছে, প্রার্থনাকারী ব্যক্তিদের হেনস্তা করছে। সরকারি নথি ও একাধিক সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে বলা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীন দলের সদস্য ও পুলিশ আক্রমণকারী ব্যক্তিদের সাহায্য করছে।’

অক্টোবরের শেষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পোপ ফ্রান্সিসের সঙ্গে ভ্যাটিকানে গিয়ে দেখা করলেও খ্রিষ্টানদের ওপর এ ধারাবাহিক আক্রমণ নিয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেননি।

ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন