বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ভারতের রাজনীতিতে কৃষি প্রশ্ন সামনে এল আবার

রাহুল গান্ধী ও বামপন্থী নেতারা ছাড়া রাকেশ টিকায়েতদের আন্দোলনে মূলধারার ভারতীয় রাজনীতিবিদদের আন্তরিক এবং লাগাতার অংশগ্রহণ ছিল সামান্যই। রাজনীতিবিদেরা ধরে নিয়েছিলেন যে এই আন্দোলন সফল হবে না। যেমনটি ঘটেছে গত সাত-আট বছর মোদির আমলে শ্রমিক, কৃষক, দলিত, মুসলমানসহ নিম্নবর্গের বিভিন্ন আন্দোলনে। কিন্তু বিক্ষুব্ধ কৃষিজীবীরা মাঠে ছিলেন নাছোড়বান্দার মতো। এঁদের মধ্যে ছিলেন বিপুল নারীও। অনেকে তাঁরা মাসের পর মাস ঘরবাড়ি ছেড়ে পথে পথে হেঁটেছেন তাঁদের পেশার সংকট নিয়ে। অনেকে পরিবারের ট্রাক্টরসহ বেরিয়েছেন। ধরেই নিয়েছিলেন, এই যাত্রা হবে দীর্ঘ। ‘লঙ্গর’ নামের গণরান্না, গণমিছিল, গণ–ইবাদত ছিল এই আন্দোলনের গত দেড় বছরের এক পরিচিত দৃশ্য।

আন্দোলন স্থলেই প্রত্যেক ধর্মের কৃষকেরা যার যার প্রার্থনাস্থল বানিয়ে নিয়েছিলেন। এমনকি আন্দোলনে সাথি হওয়া শিশু-কিশোরদের জন্য অবস্থান ধর্মঘটের এলাকাগুলোতে স্কুলও পরিচালনা করা হয়েছে নিয়মিতভাবে। কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে প্রবাসী ভারতীয়রা, বিশেষ করে শিখ সমাজ এই আন্দোলনের সমর্থনে মিছিল-সভা করে এর প্রতি আন্তর্জাতিক মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করেন। এর দিকে ইঙ্গিত করে বিজেপি সাংসদেরা বলতেন, পাকিস্তানের মতো ভারতের কিছু এলাকায় ‘শিখিস্তান’ বানাতে চায় এই আন্দোলন।

এই আন্দোলন যদিও পরিপূর্ণভাবে গ্রামীণ কৃষিসমাজের মতোই যৌথ চরিত্রের ছিল কিন্তু এর মধ্যে একজন রাকেশ টিকায়েত উঠে এসেছেন প্রবল সাহসী নেতা হিসেবে। বিজেপি ও আরএসএস নেতারা এবং তাদের সমর্থক প্রচারমাধ্যম এই কৃষকনেতাকেও বহুভাবে দেশের সামনে হেয় করার চেষ্টা করেছে। এমনও বলা হয়েছে, কিষান ইউনিয়ন বিদেশ থেকে অর্থকড়ি পেয়েছে, আর রাকেশ টিকায়েত হলেন ‘ডাকাত’।

এই আন্দোলনের বিজয়ের ব্যাপারে রাকেশ টিকায়েতের মনোবল ছিল সব সময় দৃঢ়। রাকেশের বাবাও ছিলেন একজন কৃষক সংগঠক। একদা পুলিশের চাকরি ছেড়ে রাকেশ বাবার কৃষক মিছিলে ঢুকে পড়েছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর সংগঠনের হাল ধরেন তিনি। তাঁর সেসব সিদ্ধান্ত ভারতের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে বলা যায়। রাকেশ এই মুহূর্তে নায়কের মতো মনোযোগ পাচ্ছেন ভারতে, বিশেষ করে কৃষি সমাজে। দেশটির রাজনীতিও নতুন এক নেতা পেল। অনিবার্যভাবে কৃষি প্রশ্ন কিছুটা হলেও সামনে আসবে সেখানে এখন।

যে কারণে মাদারীপুরের চরণ ট্যাপাদের স্মরণ

ভারতীয় কিষান ইউনিয়ন এবং রাষ্ট্রীয় কিষান মজদুর সংগঠনের সর্বশেষ এই বিজয় সমকালীন দক্ষিণ এশিয়ায় মনোযোগ–আকর্ষণী এক রাজনৈতিক ঘটনা হলেও একে এই অঞ্চলের রাজনীতির অহিংস ঐতিহ্যের সিলসিলা আকারেই দেখা যায়। এর সঙ্গে প্রবল মিল আছে ১৪৯ বছর আগে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহাসিক এক গণ-ধর্মঘটের। বাকেরগঞ্জ, ফরিদপুর ও যশোরজুড়ে ১৮৭২-৭৩ সালে প্রায় ছয় মাস স্থায়ী ওই শান্তিপূর্ণ গণ-ধর্মঘটের মূল শক্তি ছিল স্থানীয় নমশূদ্ররা। যার সূত্রপাত মাদারীপুরের আমগ্রামে। চরণ ট্যাপার পিতা-মাতার শ্রাদ্ধে ব্রাহ্মণ ও কায়েস্থদের নিমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যানের পর স্থানীয় অচ্ছুত সমাজ অপমানিত হয়ে চুপ করার পরিবর্তে উচ্চবর্ণের বিরুদ্ধে বয়কট আন্দোলনে নামে সে সময়। কোনো দল বা সংগঠন ছাড়াই ওই সমাবেশীকরণ ঘটে।

উচ্চবর্ণের চাপিয়ে দেওয়া অমর্যাদার স্মারক ‘চণ্ডাল’ পরিচয়ের পরিবর্তন চাইছিল ওই সামাজিক প্রতিরোধ। তাঁদের সঙ্গে সংহতিতে ছিল নিম্নবর্গের মুসলমান চাষিসমাজ—যাঁদের অনেকে চণ্ডালজীবনের বোঝা বদলাতে মাত্রই ধর্ম পাল্টিয়েছিল। এই উভয় বর্গ মিলে সেদিন বর্ণহিন্দুদের জমিজমা-বাড়িতে কোনো ধরনের কাজ করতে অস্বীকার করেন। এতে স্থানীয় কৃষি অর্থনীতি কার্যত অচল হওয়ার উপক্রম হয়।

প্রায় ছয় মাস পর অহিংস এই বয়কটের মূল পর্ব শেষ হলেও ১৮৯১ পর্যন্ত তার প্রলম্বিত ঢেউ বজায় ছিল এবং ১৯১১ নাগাদ বর্ণহিন্দুদের দেওয়া ‘চণ্ডাল’ পরিচয়ের প্রশাসনিক মৃত্যু ঘটে। ১৯২১ সালের শুমারি দলিল যার সাক্ষী হয়ে আছে।

অহিংসার বিজয়

অহিংস রাজনীতির শক্তি ও বর্ণবাদবিরোধী সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাস আলোচনা করতে গিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আন্তর্জাতিক পণ্ডিতেরা বরাবরই মহাত্মা গান্ধী ও মার্টিন লুথার কিংয়ের কথা বলেন। কিন্তু চরণ ট্যাপাদের জন্ম ও বিজয় তারও আগের ঘটনা। শান্তিপূর্ণ ও অহিংস ‘বয়কট’ধর্মী ওই আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল ইংরেজি অভিধানে বয়কট শব্দটি যুক্ত (১৮৮০) হওয়ার তিন বছর আগে। গান্ধীর বয়স তখন মাত্র তিন। লুথার কিংয়ের জন্ম হয়েছে আরও ৫৭ বছর পর। অথচ দক্ষিণ বাংলার নিম্নবর্গের ওই অর্জন ইউরোপ-আমেরিকায় দূরে থাক, দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরও ন্যূনতম মনোযোগ পায়নি আজও। যদিও সেই বিজয়ের ধারাবাহিকতায় নমশূদ্ররা উপমহাদেশজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ এক সামাজিক বর্গ হয়েছে ইতিমধ্যে। বাংলাদেশের নেতা যোগেন মণ্ডল হয়েছিলেন অবিভক্ত পাকিস্তানের মন্ত্রী।

দাবিদাওয়া আদায়ের পথ ও পদ্ধতি হিসেবে অহিংস পথের যে শক্তি চরণ ট্যাপা ও তাঁর সহযোদ্ধারা দেখিয়েছিলেন, সেটাই নতুন করে বাঙ্ময় করে তুলেছে রাকেশ টিকায়েতের কিষান বাহিনী। এ পথের মহানায়ক অবশ্যই গান্ধী ও লুথার কিং। চরণ ট্যাপারা সামান্য একটা ঢিলও না ছুড়ে মহাশক্তিধর ব্রাহ্মণ্যবাদের কাছ থেকে মনুষ্যত্বের স্বীকৃতি আদায় করেছিল দেড় শতাব্দী আগের বাংলায়। আর ভারতীয় কিষান ইউনিয়নের রাকেশ টিকায়েতরা দেখালেন আরএসএসের তুমুল সুনামিই ভারতীয় সমাজজীবনের শেষ কথা নয়। এই বিজয়ে তাঁদের কোনো গুলি-বন্দুক ব্যবহার করতে হয়নি গত দেড় বছরের সংগ্রামে। সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এই আন্দোলনের কর্মীরা ছিলেন অহিংস। অধিকাংশ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আন্দোলনরত কৃষকেরা ‘মহা-পঞ্চায়েত’ করে। পঞ্চায়েতের সিদ্ধান্ত অনেক সময়ই জনসমাজকে জানানো হতো মন্দির ও মসজিদের মাইক থেকে। স্থানীয় ‘সমাজ’ এই আন্দোলনের জয়-পরাজয়কে ক্ষমতার উত্থান-পতন আকারে নয়, সমাজের মান-মর্যাদা-ভবিষ্যৎ আকারে দেখছিল। রাকেশ ভাষণে প্রায়ই বলতেন, ‘কৃষকদের আন্দোলন হলো কৃষি সমাজের মর্যাদার প্রশ্ন।’ কৃষি সমাজের ওই মর্যাদা বাঁচাতেই দেড় বছর স্থায়ী এই আন্দোলনকালে মারা গেছেন সাড়ে সাত শ অংশগ্রহণকারী। অনেকে মারা গেছেন শীত ও বর্ষার কষ্টে। কেউ কেউ সত্যাগ্রহে অংশ নিয়ে প্রাণ দিয়েছেন। প্রতিপক্ষের জুলুমেও মরেছেন অনেকে। সব মিলে এই আন্দোলন ছিল আধুনিক ভারতের এক রাজনৈতিক মহাকাব্য।

এ রকম অহিংস প্রতিরোধের শক্তির জায়গা হলো তার আত্মার শক্তি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তার অঙ্গীকার। সহিংসতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা রাজনৈতিক শক্তি যখন মূলত প্রতিপক্ষের শরীরকে লক্ষ্য করে এগোয়, অহিংস অঙ্গীকার তখন বীজ বপন করে মানুষের বিবেকের গভীরে। গবেষকদের ভাষায়, অহিংস প্রতিরোধ সচরাচর আধ্যাত্মিক শক্তির মতো, যা প্রত্যেক প্রতিরোধকর্মীকে মানবিকভাবে অবিশ্বাস্য রকমে শক্তিশালী করে তোলে। প্রচলিত রাজনীতির চোখ দিয়ে সেই আধ্যাত্মিক আবেগ বোঝা যায় সামান্যই। কিষান আন্দোলনে গত বছর তীব্র শীতের গভীর রাতে উন্মুক্ত রাজপথে বৃদ্ধ শিখ কৃষকদের নির্জীব হয়ে বসে থাকার মাহাত্ম্যÄসে কারণেই বাস্তবে কোনো আলোকচিত্র ধারণ করতে পারেননি। ওটা ছিল আসলে পূর্বসূরিদের কৃষি ঐতিহ্য রক্ষায় পাঞ্জাবের চাষিদের আধ্যাত্মিক সাধনার মতো।

একইভাবে রাজৈরের আমবাগানের চরণ ট্যাপারা আত্মসম্মান ছাড়া মজুরি–শ্রম বন্ধ করে পেটেরÿক্ষুধার দীর্ঘ বাস্তবতা মেনে নিয়েছিলেন। এভাবে ঝুঁকি নিয়ে অচ্ছুত ‘চণ্ডাল’রা যে স্পর্শযোগ্য ‘নমশূদ্র’ পরিচয়ে উত্তরণের জন্য লড়তে পারেন, তা বর্ণহিন্দুদের পাশাপাশি ব্রিটিশ প্রশাসকেরাও শুরুতে ভাবতে পারেননি। চণ্ডালের আন্দোলনে মুসলমান চাষি যে সংহতি জানাতে পারেন, সেটা ছিল প্রতিপক্ষের চোখে নতুন বিস্ময়। ভারতীয় কিষানদের আন্দোলনেও মাসের পর মাস নানান পরিমণ্ডলের নাগরিক সমাজ খাবার থেকে শুরু করে সৌরবিদ্যুতের সেবা নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে। মূলধারার রাজনীতির জন্য এসব ছিল গভীর বিস্ময়ের দিক। কিন্তু বারবার এ রকমই ঘটছে উপমহাদেশে। ১৮৭২ সালে ঘটেছে দক্ষিণ বাংলায়; ২০২১-এ ঘটল কেন্দ্রীয় ভারতে। তার কিছু সময় আগেই বাংলাদেশ দেখেছে স্বল্প সময়ের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ও কোটা সংস্কার আন্দোলন।

নিজস্ব গণতন্ত্রের ভীষণ রকম দুঃসময়ে ভারত আবার গর্ব করার মতো এক সভ্য বিপ্লবের দেখা পেল। কিন্তু বাংলাদেশ কি আগামী বছর চরণ ট্যাপাদের আন্দোলনের ১৫০ বছর পূর্তি উদ্‌যাপন করতে রাজি হবে? যে উদ্‌যাপনের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের হৃদয়ে শিকড় বিস্তার করে থাকা অহিংস রাজনীতির ঐতিহাসিক আসক্তির সমকালীন তাৎপর্য বোঝা যেত।

  • আলতাফ পারভেজ: দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ে গবেষক

ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন