মুনাওয়াদ সালমান পেশায় একজন প্রকৌশলী। ভারতের হায়দরাবাদের গুগল কার্যালয়ে কাজ করতেন ৩০ বছর বয়সী এই যুবক। কিন্তু গত বছর অক্টোবরের শেষের দিকে হায়দরাবাদ বিমানবন্দর থেকে তাঁকে আটক করে পুলিশ। কী তাঁর অপরাধ? পুলিশের দাবি, মুনাওয়াদ সৌদি আরব যাচ্ছিলেন। সেখান থেকে ইরাকে গিয়ে জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) উচ্চ পদে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর।

পুলিশের বরাত দিয়ে ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদনে জানানো হয়, আইএসে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করার বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই ইন্টারনেটে সংগঠনটির নানা ধরনের তথ্য নিয়ে পড়াশোনা করেন মুনাওয়াদ। তাঁর ইন্টারনেটে করা চ্যাটিং থেকে তথ্য জেনে তাঁকে আটক করেন পুলিশের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। সম্প্রতি ভারতের গোয়েন্দা পুলিশ ‘অপারেশন চক্রব্যূহ’ নামের নতুন একটি অভিযান চালু করেছে। এই গোয়েন্দা দলের সদস্যরা ইন্টারনেটের বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটে অ্যাকাউন্ট খুলে সন্দেভাজনদের সঙ্গে চ্যাটিং করেন। প্রথমে তাঁরা ফেসবুক, ইয়াহুসহ অন্যান্য ম্যাজেঞ্জারে সন্দেহভাজন জিহাদি তরুণদের সঙ্গে আলোচনা চালান। বিভিন্নভাবে তাঁদের প্রলুব্ধ করে তথ্য বের করে নেন গোয়েন্দা পুলিশ। এরপরেই চ্যাট রুম থেকে বের তাঁরা ইমেইলের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান করেন। এ থেকে প্রাপ্ত তথ্য নিয়েই অভিযান চালান তাঁরা।

একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তার ভাষ্য, সালমান মুনাওয়াদের সঙ্গে এজেন্সির কর্মকর্তারা আইএসপ্রধান আবু বাকার আল-বাগদাদির ছবিসংবলিত একটি অ্যাকাউন্ট থেকে চ্যাট শুরু করেন। তারপর ধীরে ধীরে তাঁর কাছ থেকে সব তথ্য বের করে আনেন। এভাবেই সালমানকে আটক করেন তাঁরা। শুধু তাই নয়, এই অনলাইন চ্যাটিংয়ের মাধ্যমেই গত ছয় মাসে আরও ১২০ জন তরুণকে শনাক্ত করেছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা, যারা স্বেচ্ছায় আইএসে যোগ দিতে চায়। কিন্তু এই মুহূর্তে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না গোয়েন্দা পুলিশ। তবে সব সময় পুলিশের নজরদারিতেই আছেন তাঁরা।

একইভাবে ভারতের বেঙ্গালুরুতে আইএসের হয়ে প্রচার চালানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় মেহদী মাসরুর বিশ্বাস নামের অপর এক তরুণকে। তিনি একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত বছর ডিসেম্বরের শেষের দিকে ‘অপারেশন চক্রব্যূহ’ চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

অনলাইনে তরুণ জিহাদিদের নজরদারি করার জন্য ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে গোয়েন্দা পুলিশকে একটি অভিয়ান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। গত বছরের নভেম্বরে গুয়াহাটিতে পুলিশের বার্ষিক সম্মেলনে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (আইবি) এ ব্যাপারে একটি প্রাথমিকভাবে প্রস্তাব উপস্থাপন করে। সাইবার জগতের সবকিছু নজরদারি করা যাবে ভেবে শুরুতেই এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান দেশটির পুলিশপ্রধান। পরে প্রস্তাবটি আরও উন্নত করে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো, ন্যাশনাল টেকনিক্যাল রিসার্চ অর্গানাইজেশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিসসহ অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজারের (এনএসএ) কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদন পাস হওয়ার পরেই শুরু হয় ‘অপারেশন চক্রব্যূহ’। এই দলের বিশেষজ্ঞরা খুব দ্রুত মানুষের মানসিক অবস্থার বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করতে সক্ষম। এখন এই অভিযান বিশ্বের অনেক দেশেই চলছে বলে জানিয়েছেন একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা।

দিল্লি পুলিশের বিশেষ শাখার সাবেক প্রধান কার্নাল সিং বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের জীবনের বাড়তি ঝুঁকি থেকে যায়। কারণ, আমরা সব সময় জানি না যে, আসলে কোন ব্যক্তিটি জঙ্গি সংগঠনের সদস্য বা সদস্য হতে চাচ্ছে। তাই বাইরে থেকে বাড়তি কিছু খোঁজ-খবর ও তথ্য সংগ্রহ করতে হয়; যা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।’

ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর সাবেক পরিচালক রাজেন্দর কুমার বলেন, ‘জিহাদিরা অনেক বেশি প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন হয়। তারা জানে, কীভাবে প্রক্সি সার্ভার ব্যবহার করে ইন্টারনেটের পুরো সুবিধাটা নেওয়া যায়। এটাই তাদের বড় অস্ত্র। আপনি যদি তার একটি টুইটার অ্যাকাউন্ড বন্ধ করে দেন, তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই সে আরও একটি অ্যাকাউন্ট খুলে ফেলবে।’

জাতীয় তদন্ত সংস্থার একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘জিহাদিরা ঘোর উগ্রপন্থী। তারা তাদের বিশ্বাসে অটুট। একবার ইয়াসিন ভাটকাল নামের আল-কায়েদার একজন প্রচারকারীকে আটক করা হয়। আমরা তাকে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি।’

ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির প্রধান শারদ কুমার বলেন, ‘ইন্টারনেটে জিহাদি প্রচারণায় খুব সহজেই তরুণেরা প্রলুব্ধ হচ্ছেন। তাঁরা ভারতসহ যেকোনো জায়গার জন্য খুবই ভয়ংকর হয়ে উঠছেন। আমরা তাঁদের এই কর্মকাণ্ড অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেব।’

বিজ্ঞাপন
ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন