বিজ্ঞাপন

ফিরহাদ হাকিম কলকাতা করপোরেশনের মুখ্য প্রশাসক। পশ্চিমবঙ্গে এই মুহূর্তে কোভিড সংক্রমণ ছড়াচ্ছে—এই সময় ফিরহাদ হাকিমকে গ্রেপ্তার করার বিষয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র কুনাল ঘোষ বলেছেন, রাজ্যে অরাজকতা সৃষ্টি করাই কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের লক্ষ্য। প্রশ্ন উঠছে, মাত্র সপ্তাহ দু-এক আগে ৭০ শতাংশেরও বেশি আসন পেয়ে বিধানসভায় জিতে আসা তৃণমূল কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের পুরোনো মামলায় এখনই কেন গ্রেপ্তারের সিদ্ধান্ত নিল সিবিআই।

এই প্রশ্নের উত্তর এখনই পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু যেটা পরিষ্কার তা হলো, ফিরহাদ হাকিম ও সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের মতো দুজন অভিজ্ঞ মন্ত্রীকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার একটি নির্দিষ্ট বার্তা দিতে চাইছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে। সম্ভবত সেই বার্তাটি হলো, এখন থেকে লাগাতার তৃণমূল কংগ্রেসকে বিব্রত করার চেষ্টা করবে কেন্দ্রের সরকার। বিষয়টি আঁচ করেই তৃণমূল কংগ্রেস আজ গ্রেপ্তারকে ‘প্রতিহিংসার রাজনীতি’ বলে চিহ্নিত করেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও সিবিআই দপ্তরে পৌঁছে বলেছেন, তাঁকেও তাঁর মন্ত্রীদের সঙ্গে গ্রেপ্তার করতে হবে। বিজেপি বলেছে, আইন আইনের পথেই চলবে।

দুই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর গ্রেপ্তারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে খানিকটা বিপাকে পড়বেন, তা অনস্বীকার্য। এর মধ্যে ফিরহাদ হাকিমের গ্রেপ্তার তাঁকে বেশি সমস্যায় ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে যাকে তাঁর সবচেয়ে কাছের লোক বলে মনে করা হয়, তিনি ফিরহাদ হাকিম। তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকেই মমতার ঘনিষ্ঠ ফিরহাদ। ২০০৯ সালে প্রথমবার দক্ষিণ কলকাতার একটি উপনির্বাচনে জিতে তিনি বিধানসভার সদস্য হন। পরের তিনটি নির্বাচনেই জেতেন ফিরহাদ। ২০১১ সাল থেকে ফিরহাদ তৃণমূল কংগ্রেসের মন্ত্রিসভার সদস্য, এবারেও তিনি জিতেছেন এবং পুরোনো মন্ত্রণালয় পুর ও নগরোন্নয়ন পেয়েছেন। কলকাতার মেয়র হন ফিরহাদ ২০১৮ সালে। ১৯৪৬ সালে কলকাতার শেষ মুসলিম মেয়র হয়েছিলেন মুসলিম লীগের সৈয়দ মোহাম্মদ ওসমান, তারপর ২০১৮ সালে হলেন ফিরহাদ। নির্বাচন না হওয়ার কারণে তিনি আপাতত করপোরেশনের মুখ্য প্রশাসকের পদে আছেন।

default-image

পশ্চিমবঙ্গে অনেক নেতাকেই মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতা বলে মনে করা হলেও ফিরহাদ হাকিমকে তা মনে করা হয় না। ফিরহাদ নিজেও তা পছন্দ করেন না বলে অতীতে জানিয়েছেন। মনে করা হয়, ফিরহাদ হাকিমের দক্ষিণ কলকাতার নির্বাচনী কেন্দ্রে যেহেতু সব ভাষাভাষী মানুষই আছেন, তাই তিনি সবার সঙ্গেই সমদূরত্ব ও একই রকমের ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখতে পছন্দ করেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্ভবত সবচেয়ে কাছের নেতা হওয়ার কারণে তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরেও যেকোনো বড় ধরনের সমস্যা সামলাতে ডাক পরে ফিরহাদ হাকিমের। তিনি নিজেও অনেক সময় ঘনিষ্ঠ মহলে বলেছেন যে তাঁর ওপরে কিছু চাপ কমানো হলে তিনি অখুশি হবেন না। কিন্তু চাপ কমেনি বরং কলকাতার মেয়রের ওপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশ্বাস বেড়েছে। তৃণমূল নেত্রীর বিশ্বাসভাজন একজন নেতার গ্রেপ্তার, তৃণমূল দলকে যে চিন্তায় ফেলবে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভার আর এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হলেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়। ফিরহাদ যদি শারীরিক কর্মক্ষমতায় এগিয়ে থাকেন, তবে সুব্রত আছেন অভিজ্ঞতায়। ১৯৭১ সালে বালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে প্রথমবার জয়ী হয়েছিলেন তরুণ সুব্রত। এবার জিতে ৫০ বছর ধরে বালিগঞ্জ থেকে বিধানসভায় যাওয়ার রেকর্ড গড়লেন সত্তরোর্ধ্ব এই নেতা। কংগ্রেসের ছাত্রনেতা হিসেবে রাজনৈতিক জীবন শুরু করে সুব্রত একসময় ইন্দিরা গান্ধীর যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ ছিলেন, কংগ্রেসের যুবনেত্রী হিসেবে তাঁকে একসময় নির্দেশ দিতেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আবার সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে মাঝেমধ্যে মতবিরোধও হয় মমতার। কিন্তু তা সত্ত্বেও সুব্রত মুখোপাধ্যায়কে সব সময় তাঁর মন্ত্রিসভায় স্থান দিয়েছেন মমতা, উপদেষ্টা হিসেবে তাঁকে সামনে রেখেছেন। গত মাসে নির্বাচনী কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেছেন বর্ষীয়ান এই নেতা। নির্বাচন জেতার পর সুব্রতকে পুরোনো মন্ত্রক পঞ্চায়েত ও জনস্বাস্থ্য কারিগরিও দিয়েছেন মমতা। এই উপদেষ্টাকেও আজ গ্রেপ্তার করল সিবিআই, এটাও তৃণমূল নেত্রীর জন্য একটা বড় ধাক্কা।

যদিও তৃণমূল কংগ্রেস মনে করছে, তাঁদের কাউকেই বেশি দিন নিজেদের হেফাজতে রাখতে পারবে না সিবিআই। তৃণমূল জানিয়েছে এই গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে তাঁরা আদালতে যাবে।

ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন