বিজ্ঞাপন

ঘটনাটি ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ গুজরাটের গান্ধীনগর শহরের। শিশুটি একবার নয়, দু–দুবার অপহৃত হয়। কিন্তু কেন, সেই কারণ খুঁজে বের করেছে বিবিসি গুজরাট।

দেশটির নারী ও শিশু উন্নয়ন দপ্তরের হিসাবে গত বছর ভারতে ৪৩ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ হয়। আর গুজরাটে প্রতিবছর সরকারি হিসাবে এ সংখ্যা ৩ হাজার ৫০০। শিশু অধিকারকর্মীদের দাবি, বাস্তবে এ সংখ্যা আরও বেশি হবে। কারণ, দরিদ্র বাবা-মায়েরা অনেক সময় সন্তান হারানোর বিষয়টি নথিভুক্ত করেন না। তবে মিনা ও তাঁর স্বামী কানু তাৎক্ষণিক পুলিশের কাছে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন।
স্থানীয় পুলিশ ইন্সপেক্টর এইচপি জালা এ ঘটনার তদন্তে নামেন। তিনি বলেন, মিনা ওই নারী সম্পর্কে কিছুই জানতেন না, এমনকি নামও। তিনি ও তাঁর দল প্রথমে ওই এলাকার সিসিটিভি ফুটেজের সহায়তা নেন। সেখানেই তাঁরা প্রথম সূত্র খুঁজে পান। দেখেন এক নারী শাড়ির নিচে কিছু একটা নিয়ে প্রধান সড়কের দিকে হাঁটছেন। এতেই তাদের সন্দেহ জাগে।

এ নিয়ে প্রায় ৫০০ রিকশাচালকের সঙ্গে কথা বলেছে তদন্ত দলটি। তাঁদের কাছ পাওয়া অনেক তথ্য মিলিয়ে দেখা যায় ফুটেজে যে নারীকে দেখা গেছে তিনি একটি রিকশা নিয়ে পাশের গ্রামে গেছেন। প্রত্যক্ষদর্শী একজন বলেন, তাঁর কোলে একটি শিশু ছিল।
পুলিশ এবার ওই গ্রামের সিসিটিভি ফুটেজ স্ক্যান করেন। সেখানে মূল সড়কের পাশে থাকা দোকানদারদের এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সেখান থেকে জানা যায়, ওই নারী আরেক গ্রামে চলে গেছেন। সর্বশেষ তাঁকে সেখানে দেখা গেছে।

পরে ওই এলাকায় তল্লাশি চালাতে চালাতে পরিত্যক্ত একটি ফার্মে গিয়ে নারীর পোশাক ও আধার কার্ড পাওয়া যায়। আধার কার্ডে থাকা সেই ঠিকানায় যায় পুলিশ। সেখানে তারা এক নারীকে শিশুসহ দেখতে পায়। পুলিশ ভাবে যাক অবশেষে পাওয়া গেল। কিন্তু বিধি বাম। এই শিশুটি অপহৃত মিনার না। এই নারী জানান তাঁর স্বামী আরেক নারীর সঙ্গে পালিয়ে গেছে। ওই নারী যাওয়ার আগে তাঁর জিনিসপত্র এমনকি আধার কার্ডও চুরি করে পালায়। কোলের শিশুটি কার জানতে চাইলে বলেন, এ শিশু তাঁর দ্বিতীয় সংসারের।

এরপর পুলিশ মিনার সন্তানের অপহরণকারীকে খুঁজতে নামে। আধার কার্ডধারী ওই নারীর দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী পুলিশ সেখানে গিয়ে এক শিশুসহ ওই দম্পতিকে খুঁজে পায়। পরে ডিএনএ পরীক্ষার মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয় ওই শিশুটি মিনার। গ্রেপ্তার করা হয় এই দম্পতিকে। পরে তাঁরা জামিনে ছাড়া পান।

এই নারীর বিরুদ্ধে মিনার সন্তানকে অপহরণ এবং তাঁর স্বামীর আগের স্ত্রীর পোশাক ও আইডি কার্ড ব্যবহার করে তাঁকে ফাঁসানোর অভিযোগ আনা হয়। তাঁর স্বামীর দাবি, তিনি এ ঘটনার কিছুই জানেন না। ধরেই নিয়েছেন এটি তাঁর সন্তান। কারণ, তাঁর স্ত্রীও অন্তঃসত্ত্বা ছিল।

পরে এই নারী বলেন, তিনি এক মৃত সন্তানের জন্ম দেন। এবং ভয় পাচ্ছিলেন তিনি যদি ছেলেসন্তান ছাড়া বাড়ি ফেরেন তাহলে হয়তো স্বামী তাঁকে ছেড়ে যাবে।
সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা দীপক ভায়াস বলেন, এখানে বাবা-মায়েদের মধ্যে মেয়ের পরিবর্তে ছেলেসন্তানের প্রতি বেশি আকাঙ্ক্ষা থাকে। যা–ই হোক না কেন তারা ছেলে সন্তান চায়। আর এ কারণে গরিব পরিবারের ছেলেসন্তান অপহরণের শিকার হয়।

এই দম্পতির কাছ থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করে প্রকৃত বাবা-মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেয় পুলিশ। সন্তানকে ফিরে পেয়ে মিনা-কানুর জীবনে আনন্দ ফিরে আসে। তবে তা দীর্ঘমেয়াদি হয়নি। দুই মাস পর ৯ জুন আবারও নিখোঁজ হয় শিশুটি।

সেদিন ছেলেকে গাছের নিচে দোলনায় শুইয়ে বাইরে ফেলনা জিনিসপত্র কুড়াতে গিয়েছিলেন। কিন্তু ফিরে এসে দেখেন দোলনা ফাঁকা। দ্রুতই বিষয়টি পুলিশকে জানান এই দম্পতি। আর পুলিশ কর্মকর্তা জালা তাঁদের আবার দেখে অবাক হয়ে যান। আবারও একই অভিযোগ। পুলিশ আগের মতো ওই এলাকার সিসিটিভির ফুটেজ যাচাই করে দেখতে শুরু করে। দেখা যায় একজন ব্যক্তি এক শিশুকে নিয়ে মোটরসাইকেলে চেপে যাচ্ছেন। পুলিশ ওই ব্যক্তিকে খুঁজে বের করেন। জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পারে, সেদিন তিনি মোটরসাইকেল চালাননি, চালিয়েছে তাঁর এক বন্ধু। তাঁর বাড়ি পার্শ্ববর্তী রাজস্থান রাজ্যে। পরে পুলিশ রাজস্থান পুলিশের সঙ্গে মিলে ওই ব্যক্তির বাড়িতে অভিযান চালান। পাওয়া যায় মিনার সন্তানকে। পরে এই দম্পতিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের কোনো সন্তান নেই।

জালা বলেন, শিশুটিকে চুরি করা এই ব্যক্তি মিনার স্বামীর সঙ্গে কনস্ট্রাকশনের কাজ করেন।

চার দিন পর মিনার কোলে আবার ফিরে আসে তাঁর মানিক। পুলিশেরও এখন এই পরিবার বিশেষ করে শিশুটির সঙ্গে মায়ার বন্ধন তৈরি হয়েছে। মিনা বলেন, ‘আমি ছেলেকে চোখের আড়াল হতে দিই না। কারণ, দুই মাসের মধ্যে দুবার তাকে অপহরণ করা হয়।’

২৫ বছর বয়সী মিনা আরও বলেন, ‘পুলিশ প্রায়ই তাঁর ছেলেকে দেখতে আসে। সময় কাটায়। আসার সময় উপহার নিয়ে আসে। আমাদের চেয়ে বেশি তারা ভালোবাসে।’ জালাও মিনার মতোই বলেন, ‘আমরাও আমাদের চোখের আড়াল করতে পারি না শিশুটিকে।’

ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন