ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরাজয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ব্যক্তিগতভাবে কতটা কষ্ট পেয়েছেন, তা জানার উপায় নেই। তবে তিনি জো বাইডেনকে অভিনন্দন জানাতে বিন্দুমাত্র দেরি করেননি।

কষ্ট পাওয়ার কথাটা উঠল যেহেতু গত বছরের সেপ্টেম্বরে টেক্সাসের হিউস্টনে হাজার হাজার মানুষের সামনে ‘হাউডি মোদি’ অনুষ্ঠানে ‘বন্ধুর’ হাত ধরে ‘আব কি বার ট্রাম্প সরকার’ স্লোগানটা মোদিই দিয়েছিলেন। জমায়েত দেখে আপ্লুত মোদি হয়তো ক্ষণিকের জন্য ভুলে গিয়েছিলেন, তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী, ট্রাম্পের ক্যাম্পেইন ম্যানেজার নন। এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে নিজ রাজ্য গুজরাটের আহমেদাবাদে ‘নমস্তে ট্রাম্প’-এর আসরে সেই ভুল তিনি অবশ্য করেননি। হৃদ্যতাকে ছাপিয়ে দুই নেতার মাখামাখি এই ধারণাই দিয়ে এসেছে, ট্রাম্পকে দ্বিতীয় দফাতেও দেখতে পাওয়া সম্ভবত ‘ব্যক্তি’ মোদির ঐকান্তিক কামনা ছিল। হয়তো সেই কারণেই সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে এত আলোচনা।

বিজ্ঞাপন

রাজনৈতিক পালাবদলে সব সময় যে প্রশ্নটি বড় হয়ে ওঠে, তা এই সম্পর্ককেন্দ্রিক। যদিও রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কে সেই অর্থে ব্যক্তির প্রভাব বিশেষ থাকে না। তার প্রধান কারণ, সম্পর্ক তৈরি হয় দুই দেশের মধ্যে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের গত ২০ বছরের লেখচিত্র, যা বিল ক্লিনটন, জর্জ বুশ, বারাক ওবামা ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের জমানায় ঊর্ধ্বমুখী থেকেছে, জো বাইডেনের আমলে তা বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা তাই প্রায় নেই বললেই চলে।

এর প্রধান কারণ, ভারতীয় নেতৃত্বের কাছে বাইডেন আদৌ অচেনা নন। ওবামার ‘ভিপ’ (ভাইস প্রেসিডেন্ট) হওয়ার আগে থেকেই বাইডেন ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব গাঢ় করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছেন। সিনেটের বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটির চেয়ারম্যান থাকাকালে সেই লক্ষ্যে যা করেছেন, সেই ধারাবাহিকতা তিনি রক্ষা করেছেন ওবামার ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও। ২০০৮ সালের পরমাণু চুক্তির অন্যতম প্রধান কারিগরও ছিলেন তিনি। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের এক জোট করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ওবামার আমলেই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হিসেবে ভারতকে প্রথম প্রকাশ্যে সমর্থন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওবামা-বাইডেনের সেই আমলেই ভারত পেয়েছিল ‘গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সহযোগীর’ মর্যাদা। যে মর্যাদা অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি পেতে ভারতকে সাহায্য করেছিল। দুই দেশের মধ্যে এই সেদিন ভূস্থানিক সহযোগিতার জন্য যে ‘বেসিক এক্সচেঞ্জ অ্যান্ড কো-অপারেশন অ্যাগ্রিমেন্ট’ (বেকা) সই হলো, তার মাটি খোঁড়ার কাজটা শুরু করেছিলেন ওবামা-বাইডেন জুটিই। ২০০৬ সালে বাইডেন বলেছিলেন, ‘আমি স্বপ্ন দেখি, ২০২০ সালে পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ দুই দেশ হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত।’ সেই স্বপ্ন সার্থক করার দায় এখন সমানভাবে তাঁর ওপরই বর্তাল।

বেকা যখন সই হচ্ছে, তার মাস ছয়েক আগেই পূর্ব লাদাখে ঘটে গেছে ভারত ও চীনের সেনাদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। এর আগে থেকেই ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র দৃঢ়ভাবে ভারতের পাশে। পালাবদলের ফলে এখন তাই প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক আগের মতো তিক্ত থাকবে কি না। সেই প্রশ্নের পাশেই উঠে যাচ্ছে ভারত-চীন সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য অবস্থান।

এটা ভুললে চলবে না, চীনের সর্বগ্রাসী ও আগ্রাসী মনোভাবে যুক্তরাষ্ট্র বেশ কয়েক বছর ধরেই বিরক্ত ও সন্দিহান। চীন সম্পর্কিত মনোভাবে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের ফারাকও প্রায় নেই। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাইডেন তাঁর সম্ভাব্য সরকারের মনোভাবের যে রূপরেখা জানিয়েছেন, প্রচার দলিলে যা লেখা রয়েছে, তাতে চীন সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র একযোগে কাজ করবে, যেখানে চীন বা অন্য কোনো দেশকে প্রতিবেশীদের ভয় দেখাতে দেওয়া হবে না।’ চীনের সঙ্গে সীমান্ত সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র যে ভূমিকা নিয়েছিল, বাইডেনের ভূমিকা তা থেকে ভিন্ন হবে—এমন ভাবনা নয়াদিল্লির সাউথ ব্লককে আচ্ছন্ন করেনি। কূটনীতিকেরা ধারাবাহিকতা রক্ষা নিয়ে সন্দিহান নন।

চীনের বাণিজ্যিক মডেল যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পমহলকে বিরক্ত করেছে। বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের রাশ পড়েছে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনামের ওপরও। কোভিড-পরবর্তী চীনের আচরণ সেই বিরক্তিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। এতটাই যে বিভিন্ন শিল্প তাদের উৎপাদনস্থল চীন থেকে সরানোর কথা ভেবেছে। চিন্তা হচ্ছে ‘গ্লোবাল সাপ্লাই চেন’-এর সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণের। ট্রাম্পের আমলে চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সংঘাতের অভিমুখ বাইডেনের শাসনকালে ঘুরে যাবে—এমন মনে করার কোনো সংগত কারণ নেই। বদল না হওয়ার সম্ভাবনা মনোভাবেরও। জাতীয় স্বার্থের কথা ট্রাম্প যতটা ভাবতেন, বাইডেনও ততটাই ভাববেন। তবে হ্যাঁ, ট্রাম্পের ভাষা বাইডেনের মুখে শোনা যাবে না। ট্রাম্পের মতো আচরণও বাইডেন করবেন না।

চীন যাদের শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষার সঙ্গী, সেই পাকিস্তানের প্রতি বাইডেন প্রশাসনের মনোভাবেরও বদল হওয়ার সম্ভাবনা কম। তার প্রধান কারণ, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার প্রশ্নে বাইডেন কখনো দ্বিমত প্রকাশ করেননি। ওবামার ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকাকালে বাইডেন সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভারতের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে সহযোগিতার কথা বলেছিলেন। এবার প্রচার দলিলেও তিনি বলেছেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ায় সন্ত্রাসবাদের কোনো স্থান নেই। সেই সন্ত্রাস সীমান্তপারের হোক অথবা অন্য কিছু।’

বিজ্ঞাপন

পালাবদলের ফলে ভারত বরং কিছুটা আশার আলো দেখতে পারে ভিসা ক্ষেত্রে। উচ্চশিক্ষিত, দক্ষ কর্মী ও পেশাদারদের যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া-আসার বিষয়ে তিনি যে বেশ উদার, বাইডেন নিজেই তা প্রচার দলিলে জানিয়ে রেখেছেন। বলেছেন, এইচওয়ানবিসহ অন্যান্য জরুরি ভিসার সংখ্যা বাড়ানো তাঁর চিন্তায় রয়েছে। বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে এ-সংক্রান্ত যে ঊর্ধ্বসীমা রয়েছে, তা তুলে দেওয়া হতে পারে। অভিবাসন নীতিতে যে কাঠিন্য ট্রাম্প জমানায় ছিল, আশা করা হচ্ছে বাইডেনের জমানায় তা অনেকাংশেই শিথিল হবে। ভারতের কাছে বাইডেন তাই নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক হতে চলেছেন।

অবশ্য অস্বস্তির কারণও যে নেই, তা নয়। অস্বস্তি কাশ্মীর প্রশ্নে, মানবাধিকার রক্ষা এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি)-নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) নিয়ে।

জম্মু-কাশ্মীর নিয়ে ট্রাম্প মাথা ঘামাননি। ভাসা ভাসা কিছু মন্তব্য ছাড়া বিদায়ী প্রেসিডেন্ট এমন কিছু বলেননি ও করেননি, যাতে ভারতের কপালের ভাঁজ গভীর হয়। ভারতীয়-আমেরিকানদের মধ্যে ট্রাম্পের সমর্থনে প্রচারে সেটা ছিল এক বড় হাতিয়ার। বাইডেনের আমলে সেই নিশ্চিন্ততা সম্ভবত থাকবে না। প্রচার দলিলেই রয়েছে তার স্পষ্ট ইঙ্গিত। বলা হয়েছে, যেভাবে আসামে এনআরসি করা হয়, তারপর সিএএ চালু হয়, তা তাঁদের ‘হতাশার কারণ’। প্রচার শুরু হওয়ার পর কাশ্মীর প্রসঙ্গে বাইডেন বলেছিলেন, ‘জনতাকে ক্ষোভ প্রকাশ করতে না দেওয়া, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে বাধা দেওয়া, ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে রাখা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে।’ কাশ্মীর, মানবাধিকার রক্ষা, সিএএ জাতীয় আইন কিংবা বহুত্ববাদী চরিত্র নিয়ে ওয়াশিংটনের মন পেতে নয়াদিল্লিকে বাড়তি ঘাম ঝরাতে হতে পারে।

বাইডেনকে পাঠানো অভিনন্দন বার্তায় মোদি আগামী দিনের ঘনিষ্ঠ বোঝাপড়ার কথা বলেছেন। সেই বোঝাপড়ার জন্য কিছুটা বাড়তি পরিশ্রম অবশ্যই করতে হবে। সে ক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদির ‘সিলভার লাইনিং’ ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের এক টুকরো ভারতীয়ত্ব।

মন্তব্য পড়ুন 0