default-image

করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় ভোট নিয়ে উত্তেজনায় হঠাৎ ভাটার টান লক্ষ করা যাচ্ছে রাজ্যজুড়ে। এরই মধ্যে চার জেলার ৪৩ আসনে আজ বৃহস্পতিবার নির্বাচন হতে চলেছে। জেলাগুলো হলো উত্তর দিনাজপুর, পূর্ব বর্ধমান, নদীয়া ও উত্তর ২৪ পরগনা।

ষষ্ঠ ধাপের এই নির্বাচনে তপসিলি জাতিভুক্ত নমশূদ্র বা মতুয়া সম্প্রদায়ের বড় অংশ ভোট দেবে। তারা কিছুটা হলেও নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। নদীয়া ও উত্তর ২৪ পরগনা জেলার ২৬টি আসনে এই সম্প্রদায়ের অনেক ভোট রয়েছে। জেলা দুটির তিনটি লোকসভা আসনের মধ্যে দুটিতে ২০১৯ সালে জিতেছিল বিজেপি, একটিতে তৃণমূল কংগ্রেস। এই অঞ্চল বিজেপির দখলে রাখতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত মাসে বাংলাদেশের গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দিতে মতুয়া সম্প্রদায়ের মন্দিরে গিয়ে পূজা দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ মতুয়াদের পশ্চিমবঙ্গের সদর দপ্তর উত্তর ২৪ পরগনার ঠাকুরনগরে এসে বলে গেছেন, নির্বাচনে জিতলেই বিজেপি নমশূদ্রদের নাগরিকত্ব দেবে।

‘কেন নাগরিক নই, ৪০ বছরেও বুঝে উঠতে পারলাম না। এটা বিজেপির নতুন খেলা কি না ঠাকুরই বলতে পারবেন।’
প্রহ্লাদ দাস, কীর্তন গায়ক,করিমনগর, নদীয়া।

নাগরিকত্বের বিষয়টি এই অঞ্চলের মূল নির্বাচনী ইস্যু—বলছিলেন সুজন ব্যাপারী। তিনি ঠাকুরনগরের গাইঘাটা আসনে বিজেপির নির্বাচনী বুথ সভাপতি। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের আশা রাখতে হবে, বিজেপি জিতলে নাগরিকত্ব পাব। এই ছাড়া গরিব মতুয়াদের বেঁচে থাকার আর কোনো অবলম্বন নেই।’

বিজ্ঞাপন

মতুয়াদের পাড়াকেন্দ্রিক ছোট ছোট একাধিক গোষ্ঠী রয়েছে। একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত সুজন ব্যাপারী অতীতে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে ছিলেন। এখন তিনি মনে করেন, নাগরিকত্ব দেওয়ার ব্যাপারে আগের মতো সক্রিয় নন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

নাগরিকত্বের ব্যাপারে অবশ্য মতুয়াদের মধ্যে বরাবরই বিভ্রান্তি আছে। তাঁরা নাগরিক নাকি নাগরিক নন— বিষয়টি নিয়ে প্রহ্লাদ দাস নামের নদীয়ার করিমনগরের এক কীর্তন গায়ক বললেন, ‘আমাদের ভোটার কার্ড, পাসপোর্ট ও নাগরিকত্বের পরিচয়বাহী আধার কার্ড ইত্যাদি সবই রয়েছে। তবে কেন নাগরিক নই, ৪০ বছরেও বুঝে উঠতে পারলাম না। এটা বিজেপির নতুন খেলা কি না ঠাকুরই বলতে পারবেন।’ ঠাকুরনগরে মতুয়াদের মন্দির চত্বরে বসে কথা হচ্ছিল বছর পঞ্চাশের এই কীর্তন গায়কের সঙ্গে।

কেন নমশূদ্রদের নাগরিকত্ব প্রয়োজন, এটা প্রতিবারের মতো এবারেও এই অঞ্চলের বড় ইস্যু। বর্তমানে বিজেপি প্রভাবিত মতুয়া সম্প্রদায়ের একটি সংগঠন রাষ্ট্রীয় মতুয়া সমন্বয় পরিষদের সভাপতি সুকেশ চৌধুরী প্রথম আলোকে কিছুদিন আগে বলেছেন, ‘নমশূদ্রদের অনেকেই যেটা করেননি সেটা হলো, একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়ে কাগজপত্র সঠিক জায়গায় জমা দিয়ে নিজেদের নাগরিক হিসেবে নথিভুক্ত করার কাজটি। নাগরিকত্ব পাওয়ার পদ্ধতি তাঁরা অনেকেই সম্পূর্ণ করেননি, ফলে অনেকে আইনসভায় গেলেও এই সমাজের বড় অংশের পাসপোর্ট পেতে বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পেতে অসুবিধা হচ্ছে। সেটা দূর করতে নতুন আইনটি জরুরি ছিল।’

২০১৯–এর ডিসেম্বরে নতুন আইন করলেও বিজেপি এখনো সেটি বাস্তবায়ন করেনি। অমিত শাহ ভোটের প্রচারে এসে বলেছেন, করোনার কারণে এই প্রক্রিয়া পিছিয়ে গেছে। টিকা এলে নাগরিকত্ব দেওয়ার কাজ শুরু হবে। তিনি এর বিপরীত বক্তব্যও দিয়েছেন অন্য এক সভায়। অমিত শাহের পরস্পরবিরোধী মন্তব্যের কারণে অনেকে মনে করছেন, এইবারের নির্বাচনে নমশূদ্র সম্প্রদায়ের বড় অংশ আর বিজেপিকে ভোট দেবেন না।

তবে সুকেশ চৌধুরী দাবি করেন, নির্বাচনের সময় বলে এই আইন বাস্তবায়ন করা যায়নি। কারণ, বিজেপিবিরোধী দলগুলো এটিকে ইস্যু করে সামনে এনে সমাজের বিশেষ একটি সম্প্রদায়ের মানুষকে খেপিয়ে তুলেছিল। তবে মানুষ আশাবাদী যে বিজেপি এটিকে বাস্তবায়ন করবে।

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইশতেহারে নাগরিকত্ব আইন বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও আসামের ইশতেহারে কিন্তু তা বলেনি বিজেপি। নমশূদ্রদের প্রশ্ন, তবে কি নাগরিকত্ব আইন এক জায়গায় বাস্তবায়িত হবে এবং অন্যত্র নয়? এই দোলাচলের মধ্যেই আজ ভোট দিতে যাবেন নমশূদ্র সম্প্রদায়ের মানুষ, যাঁদের সংখ্যা কম করে হলেও ৫০ লাখের বেশি।

বিজ্ঞাপন
ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন