পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তারকার ঝলকানি
default-image

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ভোটের মাঠে চলচ্চিত্র-টিভি তারকাদের আনার ধারাটা বজায় রাখল রাজ্যে ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেস। এবারের বিধানসভা নির্বাচনেও এক ঝাঁক তারকাকে মনোনয়ন দিয়েছে দলটি। অন্য দলগুলোর এই অবস্থান পরিষ্কার না হলেও কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপিও তার একটি ইঙ্গিত দিচ্ছে। কারণ, এই নির্বাচনের দামামা বেজে ওঠার আগেই বেশ কিছু তারকাকে দলে ভিড়িয়েছে তারা।

বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্প্রতি প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেন তৃণমূল নেত্রী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, এবার যাঁদের প্রার্থী করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে তারকা প্রার্থী রয়েছেন চলচ্চিত্র পরিচালক রাজ চক্রবর্তী, অভিনেত্রী সায়নী ঘোষ, সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, কৌশানী মুখোপাধ্যায়, জুন মালিয়া, বীরবাহা হাঁসদা, অভিনেতা সোহম চক্রবর্তী, কীর্তন শিল্পী অদিতি মুন্সি, সাবেক ক্রিকেটার মনোজ তিওয়ারি।

বিজ্ঞাপন

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ২৯৪ আসনের মধ্যে ২৯১টিতেই প্রার্থী দিচ্ছে তৃণমূল। বাকি তিনটি আসন ছেড়ে দিচ্ছে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চাকে। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে বিজেপি প্রথম ধাপের জন্য প্রার্থী ঘোষণা করেছে। প্রার্থী তালিকায় এখনো তারকা না পাওয়া গেলেও বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন এক ঝাঁক তারকা। দ্য হিন্দুর খবর, যাঁদের মধ্যে রয়েছেন আলোচিত অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ, যশ দাশগুপ্ত, হিরণ চট্টোপাধ্যায়, অভিনেত্রী শ্রাবন্তী, পায়েল সরকার, রূপাঞ্জনা মিত্র। আর অনেক ঘটা করে বিজেপি দলে টেনেছে ‘এমএলও ফাটাকেস্ট’ খ্যাত অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তীকে। তাঁকে বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী প্রার্থী করছে—এমনটাই ভাবছেন অনেকে।

default-image

চলচ্চিত্র তারকাদের মধ্যে তৃণমূলের হয়ে যাঁরা নির্বাচন করছেন, তাঁদের মধ্যে যাঁর নামটি সম্প্রতি বেশি উচ্চারিত হয়েছে, তিনি সায়নী ঘোষ। করোনাভাইরাসের চলমান মহামারি যখন ভারতে জেঁকে বসেছিল, তখন মিরাক্কেলখ্যাত কমেডিয়ান ও চলচ্চিত্র পরিচালক সৌরভ পালোধির সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে এসে বিজেপিকে ‘ধুয়ে’ দিয়েছিলেন সায়নী। টিপ্পনী কেটেছিলেন তৃণমূলকে নিয়েও। নিজেকে একজন বামপন্থী হিসেবেই পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি।

কিন্তু সময় বদলে যায় অল্প দিনেই। ইন্ডিয়া টুডের খবরে বলা হয়েছে, হিন্দু ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে সায়নী ঘোষের বিরুদ্ধে গত জানুয়ারিতে এফআইআর দায়ের করেন বিজেপির প্রবীণ রাজনীতিক তথাগত রায়। মামলার প্রতিবাদে সভায় দেখা গিয়েছিল লোকসভার তৃণমূল সদস্য নুসরাত জাহানকেও। কিন্তু নুসরাতদের সঙ্গে সায়নীও যে তৃণমূলে ভিড়বেন তখন সেটা স্পষ্ট ছিল না। তৃণমূলের প্রার্থী ঘোষণার মধ্য দিয়ে তা স্পষ্ট হয়ে গেল। সেই সঙ্গে অবস্থানও বদলে গেল তাঁর। সায়নীর এখনকার বক্তব্য একটু ভিন্ন। তাঁর কথা, সবাই মিলে বিজেপিকে ঠেকাতে হবে।

চলচ্চিত্র পরিচালক রাজ চক্রবর্তী ইতিমধ্যে প্রচারে নেমেছেন। টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবর, ব্যারাকপুর থেকে নির্বাচন করছেন তিনি। প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার। চলচ্চিত্র পরিচালনায় ‘হিট’ তকমা রয়েছে তাঁর। তবে রাজনীতির মাঠে নবীন। তাই ভোট চাইছেন মুখ্যমন্ত্রীর নামেই।

default-image

এ সময়ের জনপ্রিয় দুই অভিনেত্রী কৌশানী মুখোপাধ্যায় ও সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল থেকে নির্বাচন করছেন। এই দুই অভিনেত্রী কাজ করেছেন পরিচালক রাজ চক্রবর্তীর সঙ্গে। ভোটের মাঠেও রয়েছেন একই দলে। কৌশানী মুখোপাধ্যায় প্রচার শুরু করেছেন। ‘দিদির’ (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) মান রাখতে ‘জান’ লাগিয়ে কাজ করার ঘোষণা ইতিমধ্যে দিয়েছেন কৌশানী। আর টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবর, নিজের তারকা তকমা ঝেড়ে ফেলে নেতা হওয়ার চেষ্টা সায়ন্তিকার। যেকোনো মূল্যে জয় চাই তাঁর। ঘোষণা দিয়েছেন, যদি প্রয়োজন হয় লোকসভায় তৃণমূলের তারকা সদস্যদের সাহায্য নেবেন তিনি।

কমেডি থেকে এবার সিরিয়াস কাঞ্চন মল্লিক। বিজেপির বিরুদ্ধে নির্বাচনী প্রচারে ‘সেই বহিরাগত’ ইস্যুকেই সামনে এনেছেন তিনি। নিয়মিত টেলিভিশনে আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন তৃণমূলের হয়ে। নির্বাচনের প্রচার মঞ্চে উঠে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে গলা মিলিয়ে তিনিও বলেছেন ‘খেলা হবে’। তবে তিনি এ–ও স্বীকার করেছেন, রাজনীতিবিদ তিনি নন।

বিজ্ঞাপন
default-image

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের আরেক প্রার্থী অভিনেত্রী জুন মালিয়া। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবরে বলা হয়, প্রচারের শুরুতেই পাকা রাজনীতিকের মতো কথা বলতে শুরু করেছেন তিনি। বলেছেন, ‘আপনাদের পাশে সব সময় থাকব। আমাকে নয় দিদিকে (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) জেতাতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘দল হিসেবেই আমরা নির্বাচনে জিতব।’
বিজেপিতে তারকাদের আনাগোনা থাকলেও প্রার্থী তালিকায় এখনো তা দেখা যাচ্ছে না। তবে অনেককে দলে ভিড়িয়ে চমকে দিয়েছে বিজেপি। এর মধ্যে অন্যতম চমক রুদ্রনীল ঘোষ। একসময় বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, এরপর রং বদলে হয়েছেন তৃণমূল। মমতা সরকারে রাজ্য কারিগরি শিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ পর্ষদের সভাপতি ছিলেন রুদ্রনীল। করোনাকালে ‘সাতে পাঁচে নেই’ পড়ে, লিখে আলোচিত হয়েছিলেন তিনি। মমতা গুণগান করেছেন বিভিন্ন সময়। কিন্তু তিনি মমতাকে ছেড়ে পড়ি জমালেন গেরুয়া শিবিরে। বদলে গেছে তাঁর কথাও। এখন মমতা সরকারের দুর্নীতি নিয়ে কথা বলছেন। যদিও শিবির বদলের ঠিকঠাক ব্যাখ্যা এখনো তুলে ধরতে পারেননি তিনি।

default-image

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষের হাত থেকে পদ্ম পতাকা গ্রহণ করেন শ্রাবন্তী। যদিও তৃণমূলের একাধিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে শ্রাবন্তীকে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন এই অভিনেত্রী। ধারণা করা হচ্ছিল, তিনি তৃণমূলেই যোগ দেবেন। সে ক্ষেত্রে কেন এই সিদ্ধান্ত? শ্রাবন্তীর উত্তর, ‘কোনো অভিমান থেকে নয়, শুধু রাজ্যে পরিবর্তন আনার স্বার্থেই বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বক্তব্য তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে।’

default-image

বিজেপিতে যোগ দেওয়া আরেক অভিনেত্রী পায়েল সরকার। কলকাতার ব্রিগেডে বিজেপির সভায় তাঁকেও দেখা গেছে। চলচ্চিত্র আর রাজনীতির ফারাক তুলে ধরে তিনি সম্প্রতি বলেছেন, ‘রাজনীতিতে কোনো রিটেক-এর জায়গা নেই। একবার ভুল করলে সেটা ভুলই থেকে যাবে। ভুল করলে দ্বিতীয়বার ঠিক করে নেওয়ার সুযোগ নেই।’

দল বদলের আপাতত ‘শেষ খেলটা’ মিঠুন চক্রবর্তীর। একসময় রাজ্যের বামদের সঙ্গে দেখা গেছে। মমতার ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এবার বিজেপিতে গেলেন তিনি। রোববার কলকাতার ব্রিগেডে বিজেপির সভায় তাঁকে দেখা গেল। বক্তব্যও দিলেন তিনি।

বিজেপির বিরুদ্ধে যে ‘বহিরাগত’ অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তার ‘কাউন্টারও দিলেন’। তিনি বলেন, ‘বাংলায় যাঁরা থাকেন, তাঁদের সবাইকে আমি বাঙালি বলে মনে করি।’ সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বামপন্থার প্রতি তাঁর ঝোঁকের কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। বলেছেন, তিনি বামপন্থী ছিলেন, এর জন্য তাঁর কোনো অনুশোচনা নেই।

বিজেপিতে যোগ দিয়ে আরেকটি জল্পনা জিইয়ে রাখছেন মিঠুন। সেটি হলো, বিজেপি রাজ্যে জিতলে মুখ্যমন্ত্রী হবেন কে—এক টিভি সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘পিকচার আভি বাকি।’

default-image

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে প্রথম দফায় ২৭ মার্চ ভোট গ্রহণ করা হবে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী এবার আট দফায় ভোট নেওয়া হবে। আর ফল ঘোষণা করা হবে ২ মে।

ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন