default-image

খেলার মাঠে কথাটা বেশি প্রচলিত। ‘জয়ের সমান হার’। সাধারণত দুর্বল কোনো দল যখন শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে দারুণ খেলেও হেরে যায়, তখন তাদের সেই হারটাকে এই শব্দগুচ্ছ দিয়ে মহিমান্বিত করা হয়। এমন হারে শক্তিমত্তার বিচারে নানা দিক বিশ্লেষণ করলে অর্জনের খাতায় অনেক কিছুই যুক্ত হয় দুর্বল দলটির।


ভারতে পশ্চিমবঙ্গের সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে আলোচিত সংলাপ ছিল ‘খেলা হবে’। নির্বাচনী প্রচারের সময় পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দল বিজেপির নেতারা বারবার পরস্পরকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন ‘খেলা হবে’ সংলাপ দিয়ে।


রোববার সেই ‘খেলা’ শেষ হয়েছে। নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ চুকে গেছে। সবাই জেনে গেছে, বিশাল জয় নিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসছে মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেস। আর প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসছে বিজেপি। অন্যদিকে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেছে কংগ্রেস ও বাম। এর মধ্যে বামেরা ২০১১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার আগে টানা তিন দশকের বেশি সময় পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় ছিল।

বিজ্ঞাপন


সাদা চোখে দেখলে পশ্চিমবঙ্গে মমতার তৃণমূলের কাছে হেরেছে বিজেপি। কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করলে কী দাঁড়ায়? বিজেপির অর্জন কি কম এই নির্বাচনে? মোটেও না।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে ভোট হওয়া ২৯২ আসনের মধ্যে মমতার দল পেয়েছে ২১৩টি, বিজেপি পেয়েছে ৭৭টি আসন। এ ছাড়া বাম জোট একটি ও অন্যান্য দল একটি আসন পেয়েছে। শতাংশের হিসাবটা দেখিয়েছে এনডিটিভি। তাদের খবরে বলা হয়, নির্বাচনে সাড়ে ৪৮ শতাংশ ভোট পেয়েছে মমতার তৃণমূল। আর বিজেপির ঘরে গেছে ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট। বাম জোট পেয়েছে ১০ দশমিক ১ শতাংশ, অন্য দলগুলোর ঝুলিতে গেছে ২ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট।

গত লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ৪২ আসনের মধ্যে সবাইকে চমকে দিয়ে ১৮টি দখল করে বিজেপি। ভোট পায় ৪০ দশমিক ৩ শতাংশ। এই ভোটই বিজেপি নেতৃত্বের বাংলা দখলের প্রত্যাশার বেলুন ফুলিয়ে দেয়।

এবার পেছনে তাকানো যাক। এর আগের বিধানসভা নির্বাচনে কার কতটি আসন ছিল? আনন্দবাজার পত্রিকার তথ্য বলছে, ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে তৃণমূল জোট পেয়েছিল ২১১ আসন। তাদের ভোট ছিল ৪৪ দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যদিকে বিজেপি জোটের আসন ছিল মাত্র তিনটি। আর ভোট ছিল মাত্র ১০ দশমিক ২ শতাংশ। মাঝখানে পাঁচ বছরের ব্যবধানে সেই বিজেপিই পশ্চিমবঙ্গে ৭৪ আসন আর প্রায় ২৮ শতাংশ ভোট বাড়িয়ে বসছে বিধানসভার বিরোধী দলের আসনে! ভাবুন, এটা বিজেপির কত বড় অর্জন!

এখন তাকানো যাক ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ফলের দিকে। এই নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে ৪২ আসনের মধ্যে সবাইকে চমকে দিয়ে ১৮টি দখল করে বিজেপি। মমতার তৃণমূল পায় ২২ আসন। নির্বাচনে বিজেপি ভোট পায় ৪০ দশমিক ৩ শতাংশ আর তৃণমূল পায় ৪৩ দশমিক ৩ শতাংশ। এই নির্বাচনই মূলত বিজেপি নেতৃত্বের বাংলা দখলের প্রত্যাশার বেলুন ফুলিয়ে দেয়।

default-image


এরপর বাংলার বিধানসভা দখলে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেয় বিজেপি। তৃণমূলের বড় নেতাদের দলে টেনে ও জনপ্রিয় তারকাদের মনোনয়ন দিয়ে তৃণমূলকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয় দলটি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নির্বাচনী প্রচারে ১৮ বার পশ্চিমবঙ্গে সফরে গিয়ে ২২টি জনসভায় বক্তৃতা করেন। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা জেপি নাড্ডা, অমিত শাহসহ কেন্দ্রীয় নেতারা চষে বেড়িয়েছেন নির্বাচনের মাঠ। তার ফল বিজেপি পেয়েছে। দলটি যেকোনো সময়ের চেয়ে পশ্চিমবঙ্গে শক্তিশালী অবস্থান পেয়ে গেছে। যদিও ভোটের শতাংশের হিসাব বলছে, লোকসভার চেয়ে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ভোট কমেছে ২ শতাংশের মতো।

বিজ্ঞাপন


তবু বিজেপির এখন ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর পালা। ভারতের আগামী লোকসভা নির্বাচন ২০২৪ সালে। আর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন হবে ২০২৬ সালে। এখন বিধানসভার প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সামনের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরির সুযোগ পাবে। তারা সেই সুযোগ নেবেও।

এবার বিধানসভায় মমতার দল পেয়েছে ২১৩ আসন, বিজেপি পেয়েছে ৭৭টি। এ ছাড়া বাম জোট একটি ও অন্যান্য দল একটি আসন পেয়েছে। শতাংশের হিসাবে সাড়ে ৪৮ শতাংশ ভোট পেয়েছে মমতার তৃণমূল। আর বিজেপির ঘরে গেছে ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট।

আর প্রধান বিরোধী দল হিসেবে ২০২৬ সালে তারা পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় যেতে মরিয়া প্রচেষ্টা চালাবে, সেটাই স্বাভাবিক। সেই প্রচেষ্টার সঙ্গে বিজেপির পক্ষে ইতিবাচক অনুঘটক হিসেবে যুক্ত হবে টানা তিন মেয়াদে ১৫ বছর রাজ্যের ক্ষমতায় থাকা তৃণমূলের প্রতি বিমুখ ভোটাররা। আরও যুক্ত হবে ভোটের রাজনীতিতে হেরে যাওয়া বাম ও কংগ্রেস তথা তৃতীয় কোনো শক্তিশালী দল ‘মুক্ত’ রাজনৈতিক মাঠ।
বিজেপি নেতৃত্ব হয়তো ভবিষ্যতের স্বপ্ন আঁকা শুরু করে দিয়েছে! যদিও রাজনীতিতে এত হিসাব-নিকাশ মেনে সবকিছু ঘটে না। আর ‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছু নেই’।

ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন