বিজ্ঞাপন

২০০৮ সালে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু চুক্তির সময় বামেদের সমর্থন প্রত্যাহারের পর সংসদের হাল কী হয়েছিল সবার জানা। আস্থা ভোটে জিততে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে টাকা দিয়ে বিজেপি সদস্যদের ভোট কেনার অভিযোগে উত্তাল হয়ে উঠেছিল সংসদ। কয়লা, টু জি বা কমনওয়েলথ গেমস নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির এমন কোনো অভিযোগ ছিল না, যা কিনা সংসদের অধিবেশনের আগে ফাঁস হয়নি।অধিবেশনের সময় ওঠা অভিযোগ, তা নিয়ে বিরোধীদের তুলকালাম ঘটানো, দিনের পর দিন সভার কাজ পণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছিল ভারতীয় সংসদীয় গণতন্ত্রের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতায়ন সেই প্রবণতায় বেশ কিছুটা রাশ টেনেছিল। কিন্তু ঐতিহ্য বা ধারাবাহিকতার প্রত্যাবর্তন ঘটল ভারতীয় সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরুর ঠিক আগের দিন। গত রোববার রাতে। পক্ষিরাজ বা পেগাসাস সেজে।

গ্রিক পুরাণে বর্ণিত পেগাসাস হলো পক্ষিরাজ ঘোড়া। পার্সিয়াসের হাতে মেডুসার মাথা কাটা গেলে তার কণ্ঠনালির রক্ত থেকে জন্ম হয় পেগাসাসের। সেই ঘোড়ার রং ছিল সাদা। দুটি ডানা ছিল তার। উড়তে পারত। ডানা অর্থাৎ পঙ্খ বা পাখা থেকেই পরবর্তী সময়ে পঙ্খিরাজ হয়ে যায় পক্ষিরাজ।

ভারতীয় পুরাণেও পক্ষিরাজের উপস্থিতি উজ্জ্বল। সমুদ্র মন্থনের সময় ক্ষীরসাগর থেকে উঠে এসেছিল সাত মাথার শ্বেতশুভ্র এক ঘোড়া, যার নাম ছিল উচ্চৈঃশ্রবা। ইন্দ্র তা হাতছাড়া করতে চাননি। সেই থেকে উচ্চৈঃশ্রবা বা পক্ষিরাজ তাঁর বাহন। চোখ বুজে বলা যায়, এই পক্ষিরাজ বা পেগাসাসই হতে চলেছে এবারের সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের মূল আকর্ষণ।

মোদি সরকারে পেগাসাসের হানা অবশ্য নতুন নয়। ইসরায়েলি পেগাসাস স্পাইওয়্যারের মাধ্যমে ফোনে আড়ি পাতার অভিযোগ উঠেছিল দুই বছর আগেও। সেই বছর, ২০১৯ সালের নভেম্বরে, সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জি কিষেণ রেড্ডি বলেছিলেন, দেশের স্বার্থে ফোনে আড়ি পাতা হয়। সেই আইনি বৈধতা সরকারের রয়েছে। ২০০০ সালের তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৯ ধারায় সেই অধিকার কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারকে দেওয়া হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার স্বার্থে ফোনে আড়ি পাতা যাবে। ফোন মারফত যেকোনো তথ্য সংগ্রহ করা যাবে। সংসদে তিনি বলেছিলেন, মোট ১০টি কেন্দ্রীয় সংস্থাকে সেই অধিকার দেওয়া হয়েছে।

এগুলো হলো, সিবিআই, এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট, গোয়েন্দা ব্যুরো, মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যুরো, সেন্ট্রাল বোর্ড অব ডাইরেক্ট ট্যাক্সেস, ডিরেক্টরেট অব রেভিনিউ ইন্টেলিজেন্স, ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি, ‘র’, ডিরেক্টরেট অব সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স ও দিল্লি পুলিশ। মন্ত্রী এও বলেছিলেন, আইন মেনে, বিধি মেনেই আড়ি পাতা হয় এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব বা রাজ্যের স্বরাষ্ট্রসচিবের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক।

দুই বছর আগে যে মনোভাব সরকারের ছিল, সম্ভবত এবারেও তা থেকে বিচ্যুত হবে না। তখন বলা হয়েছিল, সরকারের লুকোনোর কিছু নেই। এবারেও সম্ভবত সেটাই হতে চলেছে সরকারের মনোভাব। যদিও বিরোধীরা চাইবে সরকারকে কোণঠাসা করতে।
বিরোধীদের হাতে বাড়তি অস্ত্র তুলে দিয়েছে ভারতসহ বিশ্বের ১৭টি সংবাদমাধ্যমের ওই যৌথ তদন্ত। ‘পেগাসাস প্রোজেক্ট’ নামে যে তদন্ত তারা চালিয়েছিল, ভারতের ক্ষেত্রে তার নির্যাস সরকারি মনোভাবকে সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখতে পারছে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন ‘ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস’ (আইসিআইজে) যেমন যৌথভাবে ‘পানামা পেপার্স’ প্রকাশ করেছিল, ঠিক তেমনই যৌথ উদ্যোগ ‘পেগাসাস প্রোজেক্ট’–এর। এদের অন্যতম ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যার পোর্টাল আপাতত যে তালিকা উদ্‌ঘাটন করেছে, তাতে দুই বছর আগে দেওয়া সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী দেশের ‘সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার’ শর্ত কতটা মানা হচ্ছে, সে বিষয়ে সন্দেহ জাগতেই পারে। কেননা, সেই তালিকায় রয়েছেন দ্য ওয়্যারের দুই সম্পাদক ও তিন সাংবাদিক, যাঁদের ফোনে আড়ি পাতার চেষ্টা হয়। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রোহিনী সিং, যিনি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর ছেলে জয় শাহর বিপুল সম্পত্তি বৃদ্ধি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন লিখেছিলেন। তাঁর অনুসন্ধানের মধ্যে ছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ব্যবসায়ী নিখিল মার্চেন্ট ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের ব্যবসায়িক লেনদেন। রাফায়েল যুদ্ধবিমান কেনাবেচা নিয়ে তদন্ত করেছিলেন সাংবাদিক সুশান্ত সিং। আড়ি পাতাসংক্রান্ত তালিকায় তাঁর নামও রয়েছে। আর রয়েছে নির্বাচন কমিশন, প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কাশ্মীর নিয়ে খবর করা সাংবাদিকদের কেউ কেউ যাঁরা প্রথম শ্রেণির দৈনিকের সঙ্গে যুক্ত।

কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমের দাবি, ২০১৮ সালে জুন থেকে ২০২০ সালের অক্টোবরের মধ্যে এলগার পরিষদ মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আটজন সমাজকর্মী, আইনজীবী ও শিক্ষাবিদের ফোন নম্বরও ওই তালিকায় রয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ভারনন গনসালভেস, আনন্দ তেলতুম্বডে, গৌতম নওলাখা, সোমা সেন, সুধা ভরদ্বাজ, অরুণ ফেরেরা।

দুই বছর আগে মোদি সরকার যতটা দৃঢ়তা দেখাতে পেরেছিল, দুই বছর পর তা কতটা পারবে, আপাতত সেটাই দ্রষ্টব্য। কোভিড ও দেশের অর্থনীতি নিয়ে জেরবার মোদি সরকারকে সংসদের ভেতর ও বাইরে বিরোধীরাও সম্মিলিতভাবে কতটা কোণঠাসা করতে পারবে, দেখার বিষয় তাও।

ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন