বিরোধীরা এককাট্টা, শরিকেরা বিরূপ, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘও অখুশি। তবু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জমি বিল নিয়ে এক চুল সরতে রাজি নন। তাঁর যুক্তি, বর্তমান বিলে এক ছটাক জমিও পাওয়া যাবে না। অথচ দেশের শিল্পবিকাশের জন্য জমি একান্তই প্রয়োজন। কাজেই এই বিল দেশের ভালোর জন্য জরুরি।

মোদি-সরকার জমি বিল নিয়ে যেমন পিছু হটতে রাজি নয়, তেমনই এই বিলকে আঁকড়ে ধরেই কংগ্রেস ও অন্যান্য বিরোধী দল তাদের হারানো শক্তি ফিরে পেতে মরিয়া। দিল্লির যন্তর মন্তরে প্রবীণ গান্ধীবাদী আন্না হাজারের দু দিনের ধরণা শেষ হওয়ার পরের দিনেই কংগ্রেস তাদের শক্তি দেখাল। কয়েক হাজার কৃষিজীবীর সমাবেশ ঘটিয়ে কংগ্রেসের প্রথম সারির নেতারা এই বিল প্রত্যাহারের অঙ্গীকার করলেন। দিগ্বীজয় সিং, কমলনাথ, আহমেদ প্যাটেল, রাজ বব্বর প্রমুখ নেতারা এই সমাবেশে বললেন, জমি বিলের বিরোধিতায় এই আন্দোলনকে কংগ্রেস গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে দেবে। দিগ্বীজয় সিং বলেন, মোদি সরকার দেশবাসীর কাছে দুটি পছন্দ রেখেছে। একদিকে কৃষি, অন্যদিকে শিল্প। যেকোনো একটিকে যেন বেছে নিতে হবে। কংগ্রেস চায় শিল্প ও কৃষির সমন্বয়। সেই জন্যই কংগ্রেস সবার সঙ্গে কথা বলে জমি আইন পাস করেছিল। বিজেপি তখন সেই সিদ্ধান্তের শরিক হলেও এখন বিরোধিতা করছে।
কংগ্রেস যে কথা বলছে, সেই একই মনোভাব বিজেপি ছাড়া প্রায় সব রাজনৈতিক দলেরই। একমাত্র তামিলনাড়ুর শাসক দল এআইএডিএমকে এখনো এই বিল নিয়ে কোনো মত দেয়নি। কিন্তু বাকি সব দল এই বিলের বিরোধিতা করছে। এমনকি বিজেপির শরিক শিব সেনা ও অকালি দলও এই বিলের বিরোধী।
শিব সেনা প্রধান উদ্ধব ঠাকরে বলেছেন, বিলকে সমর্থন জানানোর কোনো প্রশ্নই নেই। অকালি দলও কৃষক বিদ্রোহের আশঙ্কায় প্রকাশ্যে বিরোধিতার রাস্তায়। বিজেপি ও কেন্দ্রের সরকারের প্রতি সহানুভূতিশীল বিজু জনতা দলও কংগ্রেসের পাশে দাঁড়িয়ে এই বিলের বিরোধিতা করছে। ইদানীং মোদির কাছাকাছি আসার চেষ্টা করছে যে দল, সেই এনসিপিও এই বিলকে সমর্থন দিচ্ছে না। দলের সাংসদ তারিক আনোয়ার জানান, ইউপিএ আমলে যে জমি অধিগ্রহণ বিল পাস হয়েছিল তার শরিক তাঁরাও ছিলেন। সেই বিলের বদলে এই বিল আনাকে তাঁরা সমর্থন করেন না।
এই অবস্থায় বিজেপির অভ্যন্তরেও বিল নিয়ে নানা প্রশ্ন জাগছে। আরএসএস প্রভাবিত স্বদেশি জাগরণ মঞ্চ প্রকাশ্যে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। সংঘ থেকেও বলা হয়েছে এই বিল হিতে বিপরীত ডেকে আনতে পারে। বিজেপি সভাপতি সেই কারণেই আট সদস্যের এক কমিটি গঠন করেছেন। সেই কমিটি কৃষক সংগঠনগুলির সঙ্গে কথা বলে তাদের সুপারিশ জানাবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও মোদি এই বিল থেকে এক চুল নড়তে নারাজ। তাঁর যুক্তি, কংগ্রেস আমলের বিল কার্যকর করা কঠিন। কারণ, সরকারি প্রকল্পে ৭০ শতাংশ ও সরকারি-বেসরকারি যৌথ প্রকল্পে (পিপিপি) ৮০ শতাংশ জমি মালিকের সম্মতি নিয়ে কোনো শিল্প বা অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব নয়। নতুন বিলে তাই তিনি আগের আইনের ওই ‘কনসেন্ট ক্লজ’ তুলে দিয়েছেন। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো সামাজিক প্রভাব খতিয়ে দেখা। কৃষি জমি নিয়ে নিলে কৃষক পরিবারে আর্থিক ও সামাজিক যে প্রভাব পড়ে, কংগ্রেসের বিলে তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার একটা উপায় ছিল। নতুন বিলে তা নেই। এর ফলে আশঙ্কা এটাই, যেকোনো অজুহাতে কৃষি জমি নেওয়া যাবে। তাতে শিল্প বা অবকাঠামো হয়তো হবে কিন্তু সামাজিক অসন্তোষ দেখা দেবে।
গত কয়েক বছরে ভারতে জমি নিয়ে বিস্তর কাণ্ডকারখানা ঘটে গেছে। ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসানও ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গে। দল ও সরকার রাখতে গেলে জমি বিলে বদল ঘটানো প্রয়োজন, বিজেপির একটা বড় অংশ তা বুঝছে। কিন্তু মোদি এখনো শিল্পের বিকাশ ঘটিয়ে দেশের উন্নয়নের গ্রাফ উত্তরমুখী করতে মরিয়া। অথচ সাত মাস পরে বিহারের ভোট। বিজেপির একটা বড় অংশ প্রমাদ গুনছে।

বিজ্ঞাপন
ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন