বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ভারতে করোনা রোগী প্রথম শনাক্ত হয় ২০২০ সালের জানুয়ারিতে। বিধিনিষেধের কড়াকড়িসহ নানান সতর্কতামূলক পদক্ষেপের কারণে প্রথম দফার ঢেউয়ে জনবহুল ভারতে করোনার সংক্রমণ আশঙ্কা অনুযায়ী ‘মারাত্মক’ আকার ধারণ করতে পারেনি।

গত বছরের ১৮ জুন দেশটিতে দৈনিক করোনা রোগী শনাক্ত হয় ১১ হাজার। এর দুই মাসের মাথায় দেশটিতে প্রতিদিন গড়ে ৩৫ হাজার রোগী শনাক্ত হচ্ছিল।

ভারতে সংক্রমণের প্রথম ঢেউয়ের পিক বা চূড়া আসে গত বছরের সেপ্টেম্বরে। তখন দেশটিতে দিনে ৯০ হাজারের বেশি করোনা রোগী শনাক্ত হচ্ছিল। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সংক্রমণ কমে দৈনিক শনাক্ত ২০ হাজারের নিচে নামে।

সংক্রমণের নিম্নমুখী প্রবণতার পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের শুরুর দিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাঁর সরকারের বিজয় দাবি করেন।

মোদি সরকার গঠিত করোনাসংক্রান্ত টাস্কফোর্স মাসের পর মাস বৈঠক করা থেকে বিরত থাকে। মার্চ মাসে দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী জনগণকে এই বলে আশ্বস্ত করেন যে ভারত মহামারির শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।

বিশেষজ্ঞদের বারবার সতর্কতা সত্ত্বেও মোদি সরকারের আত্মতুষ্টি এমন পর্যায়ে চলে যায় যে দেশটিতে বড় ধরনের ধর্মীয় উৎসবের অনুমোদন দেওয়া হয়। স্বাস্থ্যবিধি না মেনে এই উৎসবে লাখো মানুষ অংশ নেয়।

রাজ্যে রাজ্যে নির্বাচনী প্রচার জমিয়ে তোলেন মোদি ও তাঁর দল বিজেপির নেতা-কর্মীরা। এই রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে স্বাস্থ্যবিধির বালাই ছিল না। এ সময় চলে আইপিএলও।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা সত্যি হতে বেশি সময় লাগে না। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে ভারতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়ে যায়। দ্বিতীয় ঢেউয়ে সংক্রমণ খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। হু হু করে বাড়তে থাকে শনাক্ত রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা।

দ্বিতীয় ঢেউয়ে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা এক লাখ, দুই লাখ, তিন লাখ, এমনকি চার লাখ পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায়। দেশটিতে গত ৩০ এপ্রিল প্রথম এক দিনে চার লাখের বেশি করোনা রোগী শনাক্ত হয়। তারপর অনেক দিন চার লাখের বেশি রোগী শনাক্ত হয়।

ওয়ার্ল্ডোমিটারস বিশ্বের বিভিন্ন দেশের করোনাবিষয়ক হালনাগাদ তথ্য দিয়ে আসছে। ওয়ার্ল্ডোমিটারসের তথ্য অনুযায়ী, করোনা মহামারি শুরুর পর এখন পর্যন্ত ভারতে এক দিনে সর্বোচ্চ রোগী শনাক্ত হয় গত ৬ মে। এদিন দেশটিতে ৪ লাখ ১৪ হাজার ৪৩৩ জন রোগী শনাক্ত হয়। ভারত ছাড়া বিশ্বের আর কোনো দেশে এক দিনে এত রোগী শনাক্ত হয়নি।

default-image

ওয়ার্ল্ডোমিটারসের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে এক দিনে সর্বোচ্চ রোগীর মৃত্যু হয় গত ২৩ মে। এদিন দেশটিতে ৫ হাজার ৪১ জন রোগীর মৃত্যু হয়।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মারাত্মক আকার ধারণ করায় ভারত তার সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। অক্সিজেন, ওষুধ, হাসপাতালে শয্যার সংকটসহ নানা সমস্যায় দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়।

অনেকে করোনা পরীক্ষার সুযোগ পর্যন্ত পাচ্ছিলেন না। অন্যদিকে, রোগীর সংখ্যা এতটাই বাড়ছিল যে চাপ সামাল দিতে হাসপাতালগুলো হিমশিম খাচ্ছিল। এ কারণে অনেকের অবস্থা গুরুতর হলেও তাঁদের ঘরে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। অক্সিজেনের অভাবে বিভিন্ন রাজ্য থেকে রোগীদের মৃত্যুর খবর আসছিল। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের পাশে দাঁড়ায় বিশ্ব।

ভারতে সংক্রমণ ‘বিস্ফোরণের’ জন্য করোনার ডেলটা ধরনকে দায়ী করা হয়। ধরনটি প্রথম শনাক্ত হয় ভারতেই। গত বছরের অক্টোবরে এ ধরন শনাক্ত হয়।

অতি সংক্রামক এ ধরনকে শুরুতে করোনার ‘ভারতীয় ধরন’ বলা হচ্ছিল। পরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ধরনটির নতুন নাম দেয় ‘ডেলটা’। ধরনটির বৈজ্ঞানিক নাম (বি.১.৬১৭)। গত মে মাসে করোনার ডেলটা ধরনকে ‘উদ্বেগজনক’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে ডব্লিউএইচও।

বিশেষজ্ঞদের বরাতে বিবিসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়, ভারতে করোনা সংক্রমণের এই বিস্ফোরণ মোটেই অপ্রত্যাশিত ছিল না। কারণ, সংক্রমণ যখন কমছিল, তখন বিধিনিষেধের ক্ষেত্রে অনেক ছাড় দেওয়া হয়েছিল।

ভারতের ভয়াবহ করোনা সংকটের জন্য বড় ধরনের ধর্মীয় জমায়েত, নির্বাচনী সভা-সমাবেশ, খেলাধুলার আয়োজনসহ অধিকাংশ জনসমাগম স্থান চালু করে দেওয়ার মতো বিষয়কে দায়ী করেন বিশেষজ্ঞরা।

default-image

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক হওয়ার জন্য গত ফেব্রুয়ারি মাসেই সংকেত দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সতর্কসংকেতকে আমলে নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এই অবহেলার জন্য দেশটির প্রধানমন্ত্রী মোদিকে কাঠগড়ায় তোলে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য সাময়িকী দ্য ল্যানসেট।

গত ৮ মে এই সাময়িকীর সম্পাদকীয় প্রতিবেদনে বলা হয়, মোদির সরকারই ভারতে করোনা বিপর্যয়ের জন্য দায়ী। বহুবার সতর্ক করা সত্ত্বেও সরকার ধর্মীয় উৎসব (কুম্ভ মেলা) পালন ও রাজনৈতিক সভার (পাঁচ রাজ্যের ভোটে প্রচার) মতো অনুষ্ঠান হতে দিয়েছে, যা ‘সুপার স্প্রেডারের’ কাজ করেছে। মোদি সমালোচকদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা করেছেন। খোলামনে আলোচনা করতে চাননি। কারও পরামর্শ নেননি। এ অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য।

দেশ-বিদেশে প্রবল সমালোচনার মুখে করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে আবার কঠোর বিধিনিষেধের পথে হাঁটে ভারত সরকার। পাশাপাশি ১ মে থেকে সব প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে টিকাদানের কর্মসূচি হাতে নেয় ভারত। নানা পদক্ষেপে ধীরে ধীরে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু তত দিনে করোনাকে অবহেলার জন্য ভারতকে বড় মাশুল দিতে হয়।

ওয়ার্ল্ডোমিটারসের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে করোনায় এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৩ কোটি মানুষ সংক্রমিত হয়েছেন। মারা গেছেন ৪ লাখ ৭৭ হাজারের বেশি মানুষ।

default-image

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি করোনা শনাক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। যুক্তরাষ্ট্রের পর ভারত। ভারতের পর ব্রাজিল। আর মৃত্যুর দিক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সবার ওপরে। ব্রাজিল দ্বিতীয়। ভারতের অবস্থান তৃতীয়।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে বিধ্বস্ত হওয়ার পর ভারত যখন ধকল কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার জোর চেষ্টা চালিয়ে আসছিল, ঠিক তখনই আবার অশনিসংকেত। দেশটিতে চলতি মাসের শুরুতে শনাক্ত হয়েছে ডেলটার চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচিত করোনার অমিক্রন ধরন।

তথ্যসূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, বিবিসি, রয়টার্স, এনডিটিভি, দ্য ল্যানসেট

ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন