অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ, কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করার পাশাপাশি ইউসিসি ছিল বিজেপির অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। রামমন্দির হয়ে গেছে, কাশ্মীর উপত্যকারও স্বায়ত্তশাসনের অধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এখন স্পটলাইট পড়েছে ইউসিসির ওপর।

হিন্দু ডানপন্থীরা মূলত মুসলিমদের নিজম্ব আইনের বিরোধিতা করতেই এই অভিন্ন আইন করার তাগিদ দিচ্ছে। তাঁদের মতে, মুসলিমদের তিন তালাক ‘পশ্চাদ্‌গামী’ একটি বিধান। মুসলিমদের তাৎক্ষণিকভাবে বিবাহবিচ্ছেদের এই বিধিকে সরকার ২০১৯ সালে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে। বিজেপির ইশতেহারে বলা হয়েছে, ‘যতক্ষণ না ভারত একটি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি গ্রহণ করে, ততক্ষণ পর্যন্ত লিঙ্গসমতা আসবে না।’ তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অসীম আলী মনে করেন, ‘বাস্তবতা আরও জটিল।’

অন্যদিকে ইউসিসি দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য প্যান্ডোরার বক্স খুলে দেবে। অসীম আলী বলেন, ইউসিসি হিন্দুদের মতো মুসলিমদের সামাজিক জীবনও ব্যাহত করবে।

ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় ও বিশাল দেশে সবার জন্য একক আইন করা অত্যন্ত কঠিন। যদিও হিন্দুরা একক আইনের চাইলেও তারা বিভিন্ন রাজ্যের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের রীতিনীতি ও প্রথাকে স্বীকৃতি দেয়। মুসলিমদের মধ্যেও ভিন্নতা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা হয়, সুন্নি মুসলমানদের একটা অংশ (বোহরা) উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে হিন্দু আইনকে অনুসরণ করে।

default-image

এরপর সম্পত্তি ও উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রাজ্যের জন্য বিভিন্ন আইন রয়েছে। উত্তর–পূর্বাঞ্চলে খ্রিষ্টান–অধ্যুষিত রাজ্যগুলো, যেমন নাগাল্যান্ড ও মিজোরাম নিজেদের প্রথা মেনে নিজস্ব অভিন্ন আইন তৈরি করেছে। এটা করা হয়েছে তাদের রীতিনীতি অনুসরণ করে, ধর্মকে আশ্রয় করে নয়।

গোয়ায় সব সম্প্রদায়ের জন্য একটি সাধারণ নাগরিক আইন (১৮৬৭ সালের) রয়েছে। তবে ক্যাথলিক ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের জন্যও আলাদা নিয়ম রয়েছে। যেমন হিন্দুদের বহুবিবাহের বিধান রাখা হয়েছে।

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকার—উভয়ের কাছেই পারসোনাল ল একটি আগ্রহের বিষয়। তাই রাজ্যগুলো ১৯৭০–এর দশক থেকে তাদের নিজস্ব আইন তৈরি করেছে। ২০০৫ সালে ভারতে হিন্দু উত্তরাধিকার আইন সংশোধন করা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, বাবার মৃত্যুর পর ছেলেদের মতো মেয়েরাও পারিবারিক সম্পত্তির সমান অধিকার পাবে। এরপর এখন পর্যন্ত অন্তত পাঁচটি রাজ্য এই আইন বাস্তবায়ন করতে নিজেদের আইন পরিবর্তন করেছে।

এখন দেখা যাক বিভিন্ন বিষয়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নিজস্ব আইনগুলো কেমন?

যেমন, ধরা যাক কেউ দত্তক নিতে চান। হিন্দু ঐতিহ্য অনুযায়ী এই সম্প্রদায়ের মানুষ চাইলে কাউকে দত্তক নিতে পারেন। তবে ইসলামি আইনে দত্তক নেওয়াকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। তবে ভারতে এসবের বাইরে একটি ধর্মনিরপেক্ষ আইন রয়েছে, যা ধর্ম–বর্ণনির্বিশেষে সব নাগরকিকে দত্তক নেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়েছে।

বিজেপিশাসিত অনেক রাজ্য শুধু যে জনপ্রিয়তা বা ভোট বাড়ানোর জন্য ইউসিসি চাচ্ছে, তেমনটা নয়। এর চেয়ে বেশি কিছু আছে। তারা এটিকে রাজনৈতিক পুঁজি করে টিকে থাকতে চাইছে।
অসীম আলী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী

বিশেষজ্ঞরা ভাবছেন, যখন সবার জন্য একটি সাধারণ আইন করা হবে, তখন কোন নিরপেক্ষ নীতিগুলো গ্রহণ করা হবে? বেঙ্গালুরুভিত্তিক আইনি সংস্থা সেন্টার ফর লিগ্যাল পলিসির ফেলো অলোক প্রসন্ন কুমার বলেন, আপনি কোন নীতিগুলো প্রয়োগ করবেন—হিন্দু, মুসলিম বা খ্রিষ্টান? তিনি বলেন, ইউসিসিকে কিছু মৌলিক প্রশ্নের উত্তরও দিতে হবে। বিবাহ ও বিচ্ছেদের মাপকাঠি কী হবে? দত্তক নেওয়ার প্রক্রিয়া কেমন হবে? বিবাহবিচ্ছেদ ঘটলে ভরণপোষণ বা সম্পদের বিভাজনের অধিকার কী হবে? সবশেষে সম্পত্তির উত্তরাধিকারের নিয়ম কী হবে?

এখানে রাজনীতিও আছে, ফলে খুব সহজেই এর উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অসীম আলী বলেন, কীভাবে বিজেপি সরকার একটি অভিন্ন আইনের সমন্বয় করবে, যা ধর্মান্তরবিরোধী আইনের অধীনে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মধ্যে বিয়ের অনুমতি দেয়? বিজেপি দলটি যেখানে দুই ধর্মের ছেলেমেয়ের বিয়ের ঘোর বিরোধী, সেখানে তারা কি ছোট্ট রাজ্যগুলোতে ‘প্রচলিত রীতিনীতিতে তেমন হস্তক্ষেপ না করে’ আইনটি আনার পরিকল্পনা করছে?

এদিকে দেশটির সুপ্রিম কোর্টও ইউসিসি সম্পর্কে কিছুটা দ্বিধান্বিত। গত চার দশকে বিভিন্ন রায়ে ‘জাতির অখণ্ডতার’ স্বার্থে একটি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রণয়ন করতে সরকারকে চাপ দেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সালে আইনি সংস্কারের বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ প্রদানকারী সংস্থা আইন কমিশন এই বিধির ‘না প্রয়োজন আছে, না আকাঙ্ক্ষিত’, এমন পরামর্শ দেয়।

এটা স্পস্ট যে ইউসিসি কোনো ম্যাজিক বুলেট নয়। অলোক প্রসন্ন কুমার বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে এটি আইনে কোনো গুরুত্বও বাড়াবে না। একটি ভালো আইনকে হতে হবে ন্যায্য, স্পষ্ট ও সাংবিধানিক। বিষেশজ্ঞরা মনে করেন, বিভিন্ন সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর নিজস্ব আইনে লিঙ্গসমতা আনতে বিদ্যমান আইনের সংস্কারে তেমন কিছুই লাভ হয় না, বরং সবার জন্য প্রযোজ্য একটি আইনই হওয়া ভালো।

অসীম আলী মনে করেন, বিজেপিশাসিত অনেক রাজ্য শুধু যে জনপ্রিয়তা বা ভোট বাড়ানোর জন্য ইউসিসি চাচ্ছে, তেমনটা নয়। এর চেয়ে বেশি কিছু আছে। তারা এটিকে রাজনৈতিক পুঁজি করে টিকে থাকতে চাইছে।

অন্যরা আবার প্রশ্ন তুলেছে, এত দিন ধরে ক্ষমতায় থাকার পরও বিজেপি কেন এই বিধি করতে সক্ষম হয়নি? দেশটির সাধারণ নির্বাচনের এখনো দুই বছর বাকি। এখন কি তারা ইউসিসিকে সামনে নিয়ে আসার উপযুক্ত সময় ভাবছে? অলোক প্রসন্ন কুমার বলেন, ‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে এখন বেশ কথাবার্তা হচ্ছে। তবে বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক নয়।’

ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন