ভারতে লকডাউন ঘোষণা করা হয় ২০২০ সালের ২৪ মার্চ। তবে এর প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় তার আগে থেকেই। জনসমাগম কমাতে বিভিন্ন সড়কে প্রতিবন্ধক তৈরি করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ২০২০ সালের ২৩ মার্চ রাজধানী নয়াদিল্লির সীমান্তবর্তী একটি সড়কে।
ভারতে লকডাউন ঘোষণা করা হয় ২০২০ সালের ২৪ মার্চ। তবে এর প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় তার আগে থেকেই। জনসমাগম কমাতে বিভিন্ন সড়কে প্রতিবন্ধক তৈরি করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ২০২০ সালের ২৩ মার্চ রাজধানী নয়াদিল্লির সীমান্তবর্তী একটি সড়কে।ছবি: রয়টার্স

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২০ সালের মার্চ মাসে করোনাভাইরাসের সংক্রমণকে বৈশ্বিক মহামারি আখ্যা দেওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ইংরেজি শব্দ ‘লকডাউন’ পরিচিত হয়ে ওঠে। সেই সময় ভারতকে নিয়ে এক আশঙ্কা জেগেছিল। ১৩০ কোটির বেশি মানুষের দেশটিতে দারিদ্র্যের কশাঘাতের পাশাপাশি রয়েছে যক্ষ্মার প্রকোপ। ডায়াবেটিসও যেন ঘরে ঘরে হানা দিয়েছে। স্বাস্থ্য পরিষেবার সাতকাহন তো বলার মতো আহামরি কিছু নয়ই। পশ্চিমা দেশগুলোর নেতাদের মনে প্রশ্ন জেগেছিল, ভারত করোনা মহামারি মোকাবিলা কী করে করবে?

ভারতের সেই সময়কার ছবি ছিল বহুমাত্রিক। প্রথম দিকে অগ্রাহ্য ও অনাগ্রহ। পরের ধাপে ঔদাসীন্য ও বিহ্বলতা। একের পর এক ঘটনা, দ্বিধা–দোলাচল আর কিংকর্তব্যবিমূঢ়তার পর একটা সময় রাজনীতিকে এক ঝটকায় পেছনে ফেলে দেখা গেল, সরকারের তেড়ে ধরার তাগিদ। সেই থেকে আজকের ভারতের কোভিড পরিস্থিতির যাত্রাপথের প্রতিটি মোড়ে চোখকান খোলা রেখে হাজির থাকা সাংবাদিক অবন্তিকা ঘোষ বিলিয়নস আন্ডার লকডাউন–এর দুই মলাটের মধ্যে তুলে ধরেছেন ভারতের কোভিড উপাখ্যান। বইটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে বৃহস্পতিবার।

বিজ্ঞাপন

সাংবাদিক অবন্তিকার দৃষ্টি স্বচ্ছ। না হলে কি ধরা পড়ত, পূর্ব লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় চীনা সেনাদের অবলীলায় ‘ফিঙ্গার’ জয়ের নেপথ্য কারণ? অবন্তিকা লিখেছেন, ১৮ মার্চ লাদাখ স্কাউটের এক জওয়ানের সংক্রমণ ধরা পড়ে। এর পরপরই কোপ পড়ে সব ধরনের সফরের ওপর।

default-image

১৯ মার্চ জারি হয় সরকারি নির্দেশিকা। সেনাবাহিনীও তার আওতা থেকে বাদ গেল না। স্থগিত হয়ে গেল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স, ব্রাজিল, জাপান, ইসরায়েল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেপালের সঙ্গে সামরিক মহড়া। ২০২০ সালে ওই রকম মহড়া হওয়ার কথা ছিল অন্তত ৫০টি।

মজার কথা, মহড়া বাতিলের এ সিদ্ধান্ত ছিল পুরোপুরি একতরফা। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় (এলএসি) ইন্দো–তিব্বত সীমান্তে পুলিশের জওয়ানরা যখন গরহাজির, চীনা উপস্থিতি তখন পূর্ণমাত্রায়। পাঠানকোট থেকে সেনারা যখন টহলদারির জন্য গালওয়ানে পৌঁছায়, লাল ফৌজ তত দিনে ‘ফিঙ্গার’ চার থেকে আট পর্যন্ত ঘাঁটি বিস্তার করে ফেলেছে। সেই সময়, লকডাউন শুরু হয়নি বলেই মাস্ক পরায়ও বাধ্যবাধকতা ছিল না। সরকারি পরামর্শ ছিল, মাস্ক তারাই পরবে, যাদের একটু কাশি হচ্ছে বা জ্বরজ্বর ভাব রয়েছে। উদ্দেশ্য, যাদের একান্ত প্রয়োজন, তাদের জন্য মাস্ক ধরে রাখা। কারণ, উৎপাদনে প্রাচুর্য ছিল না।

এ সময় রাজ্যসভার চেয়ারম্যান ভেঙ্কাইয়া নাইডু একদিন মেজাজ হারালেন। তৃণমূল কংগ্রেসের ডেরেক ও’ ব্রায়ান ও সুখেন্দু শেখর রায়কে তিনি বলেন, ‘সভায় মাস্ক পরা যাবে না। নিয়ম নেই।’

default-image

অধিবেশন বন্ধ রাখার দাবি নিয়ে সেই সময় সরকার ও বিরোধীদের টানাপোড়েন তীব্র। কংগ্রেসের রাজীব গৌড়ের জবাব, ‘আমরা সবাইকে দূরত্ব বজায় রাখতে বলছি, অথচ সভা চলছে। অধিবেশন বন্ধ রাখা হোক স্যার। ভাইরাস জানে না আমরা সাংসদ।’

বিজ্ঞাপন

সাংবাদিক অবন্তিকা অধিবেশন চালু রাখার রাজনৈতিক কারণটি ধরতে ভুল করেননি। কংগ্রেস ছেড়ে ২২ জন বিধায়ক নিয়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া। মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী কমলনাথকে সংখ্যালঘু প্রমাণ করতে বিধানসভার অধিবেশন জরুরি। চলছে সেই তোড়জোড়। কোভিডের কারণে সংসদ বন্ধ হয়ে গেলে বিধানসভা খুলে রাখা কঠিন। কাজেই মহামারির চেয়ে প্রাধান্য পেল রাজনীতি!

default-image

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২১ দিনে করোনাযুদ্ধে জয়ী হওয়ার অভয়বাণী শুনিয়েছিলেন। সেই তিনিই করোনাকে ‘বৈশ্বিক মহামারি’ আখ্যা দিয়ে মানুষের মনে ভয় ঢুকিয়ে মহামারি মোকাবিলা সহজতর করতে চাইলেন। অবন্তিকা অনায়াসে ‘শোলে’ সিনেমার ‘সো যা, নহি তো গব্বর সিং আ যায়েগা’ ডায়ালগ তুলে বুঝিয়েছেন, ওই সময় প্রধানমন্ত্রীর হাতিয়ার ছিল ভয়। ভয় দেখিয়ে মানুষকে ঘরবন্দী রাখতে চেয়েছিলেন তিনি।

লকডাউন, মাস্ক পরা বা সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছিল পুলিশকে। ভাবখানা এমন যেন মানুষ ঘরে থাকলে করোনা বাইরে অপেক্ষায় থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে ফিরে যাবে! কিন্তু ভয় পারেনি পরিযায়ী শ্রমিকদের গৃহবন্দী রাখতে। ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত, প্রাণভয়ে ভীত ও বিচলিত ঘরমুখী মানুষের মিছিলে সরকার খেই হারিয়ে ফেলে। সরকারের ব্যর্থতা ও অসহায়ত্বের ছবি এঁকে অবন্তিকা খবরের কাগজের শিরোনাম উল্লেখ করে বলেছেন, ‘হোয়াট উই কান্ট লকডাউন: হাঙ্গার’।

কোভিড পর্বের শুরু ও শেষের দুই আন্দোলন অবধারিতভাবে উঠে এসেছে অবন্তিকার লেখায়। শাহিনবাগ আন্দোলন থেকে পরিত্রাণের উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল লকডাউনের ঘোষণা। কিন্তু যখন মনে হচ্ছে সংকট বেশির ভাগই কেটে গেছে, ঠিক তখনই কৃষক আন্দোলনের সূত্রপাত। কোভিডের মতো এ দুই আন্দোলনও যে সরকারের বলিরেখা গাঢ় করেছে, অবন্তিকার দৃষ্টিতে তা ধরা পড়েছে।

default-image

সব মিলিয়ে বিলিয়নস আন্ডার লকডাউন হয়ে রইল ভারতের কোভিড–১৯–এর গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

তবে মেঘ এখনো কাটেনি। আনুষ্ঠানিকভাবে বইটি প্রকাশের সময় করোনার নতুন ছোবল শুরু হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীদের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীকে নতুন করে শোনাতে হয়েছে সতর্কবার্তা। কিন্তু তা সত্ত্বেও অবন্তিকা ঘোষ বলেছেন, করোনা মোকাবিলায় ভারতের সাফল্য আশাতীত। মৃত্যুহার অন্য দেশের তুলনায় একেবারে নিচের দিকে। সংক্রমণের হারও তুলনামূলক।

ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন