মার্কিন কমিশনের বিবৃতিতে বিপাকে বিজেপি সরকার

বিজ্ঞাপন
default-image

দেশের যে অঞ্চলকে আশ্বস্ত করতে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এত চেষ্টা করলেন, সেই উত্তর–পূর্বাঞ্চলের একাধিক রাজ্য কাল মঙ্গলবার সকাল থেকেই উত্তপ্ত হয়ে উঠল নাগরিকত্ব বিলকে কেন্দ্র করে। বিশেষ করে উত্তাল আসামের বিভিন্ন এলাকা। কোথাও কোথাও নিরাপত্তারক্ষী বাহিনীর সঙ্গে লড়াইও চলে আন্দোলনকারীদের।

অভ্যন্তরীণ এই প্রতিরোধ ও প্রতিবাদের পাশাপাশি ভারতের দক্ষিণপন্থী বিজেপি সরকারকে বিড়ম্বনার মধ্যে ফেলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা-সম্পর্কিত কমিশন (ইউএসসিআইআরএফ)। তারা জানিয়েছে, নাগরিকত্ব দিতে ওই বিলে যে মানদণ্ড বেঁধে দেওয়া হয়েছে, তা খুবই বিপজ্জনক। সোমবার এক বিবৃতিতে তারা জানায়, ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যে বিল সংসদে পেশ করেছেন, তাতে ধর্মীয় মানদণ্ড বেঁধে দেওয়ায় ইউএসসিআইআরএফ উদ্বিগ্ন। বিলটি আইনে পরিণত হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সে দেশের শীর্ষ নেতাদের ওপর মার্কিন সরকারের নিষেধাজ্ঞা জারি করা উচিত।

এই আক্রমণ আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের বিড়ম্বনা বাড়িয়েছে। ভারতের বিশেষ চিন্তা মুসলিম দেশগুলোকে নিয়ে। ইউএসসিআইআরএফের বিবৃতি এবং দাবির খবর জানামাত্রই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সক্রিয় হয়ে ওঠে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতি দিয়ে জানায়, মার্কিন সংগঠনের ওই অভিযোগ উদ্বেগজনক ও দুঃখজনক। বলা হয়, ওই সংগঠনের অতীত এমনই। তাই ভারত খুব একটা আশ্চর্যান্বিত নয়। ওরা সংস্কার ও পক্ষপাতকে গুরুত্ব দিয়ে সেই বিষয়ের ওপর নিজেদের রায় জানাচ্ছে, যে সম্পর্কে তাদের খুব ভালো একটা ধারণাই নেই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ওই বিবৃতি অবাঞ্ছিত ও অসত্য। ধর্মের ভিত্তিতে কারও নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার কথা নাগরিকত্ব বিল অথবা জাতীয় নাগরিক পঞ্জিতে বলা হয়নি।

আসামে নাগরিক পঞ্জি তৈরি নিয়েও সমালোচনা করেছিল ইউএসসিআইআরএফ। এবার নাগরিকত্ব বিল নিয়েও তারা সরব। এ দেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা রয়েছে কি না, দেখতে এ সংগঠনের কর্তারা আসতে চাইলে এর আগে ভারত তাঁদের ভিসা দেয়নি। অন্য দেশের মতো ভারতও এ সংগঠনের সুপারিশ মানতে বাধ্য নয়। তবে এবার তাদের কিছুটা গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ, মার্কিন সরকার তাদের প্রতিবেদনকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়। ধর্মীয় স্বাধীনতা হরণ বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নিষধাজ্ঞা জারির আগে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের মতামতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়।

নাগরিকত্ব বিলের সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা আসছিল দেশের উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো থেকে। সেই বাধা দূর করতে ওই বিলে ‘ইনার লাইন পারমিট’ থাকা রাজ্যগুলোকে পৃথক করা হয়। সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় থাকা বিভিন্ন এলাকাও ওই বিলের আওতায় আসবে না বলা হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও মঙ্গলবার থেকেই আসামসহ উত্তর–পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রাজ্য বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে। আসামের মালিগাঁওয়ে সরকারি বাসে ভাঙচুর করা হয়। গুয়াহাটিতে বিধানসভা ভবন ও সচিবালয়ের সামনে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের খণ্ডযুদ্ধ বাধে। সাবধানতামূলক ব্যবস্থা নিতে গুয়াহাটিতে সরকারি অফিস বন্ধ রাখা হয়েছে। বন্ধ স্কুল–কলেজ, রেল চলাচলও। আন্দোলনকারীদের দাবি, এভাবে নাগরিকত্ব দিলে তাঁদের জাতিসত্তা বিপন্ন হয়ে যাবে। প্রতিবাদে আসাম, অরুণাচল প্রদেশ, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরামে মঙ্গলবার ভোর ৫টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ১১ ঘণ্টার বন্‌ধ্‌ পালিত হয়। একজোট হয়ে বন্‌ধের ডাক দিয়েছে নর্থ ইস্ট স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন। যদিও মণিপুর ও নাগাল্যান্ডকে এই বন্‌ধের আওতার বাইরে রাখা হয়।

আজ বুধবার নাগরিকত্ব বিল পেশ করা হবে রাজ্যসভায়। ভারতীয় সংসদের উচ্চকক্ষে সরকারপক্ষের গরিষ্ঠতা না থাকলেও বিভিন্ন বিতর্কিত বিলের সমর্থনে সরকার সেখানে গরিষ্ঠতা আদায় করে নিয়েছে। কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, বামপন্থীরা অবশ্য জনমত সংগ্রহে সচেষ্ট। কংগ্রেস নেতা রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী সুর চড়িয়েছেন। সোমবার সংসদে হাজির না থাকলেও রাহুল টুইট করে মঙ্গলবার বলেছেন, এটি গণতন্ত্রের ওপর হামলা। যাঁরা এই বিলকে সমর্থন করছেন, তাঁরা দেশের ভিত দুর্বল করছেন। প্রিয়াঙ্কার টুইট, ‘এটি পরিকল্পিতভাবে গণতন্ত্র ধ্বংসের চক্রান্ত। আমরা লড়াই চালাব।’

মঙ্গলবার সংসদ ভবনে ঢোকার সময় বিজেপিকে কটাক্ষ করে কংগ্রেস নেতা সাবেক অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরম বলেন, বিজেপির মতো একটা দলকে এমন অবিবেচকের মতো ভোট দিলে এমনটাই হওয়ার কথা। মানুষকে এর খেসারত দিতে হচ্ছে।

কংগ্রেস ও এনসিপি মহারাষ্ট্রে শিবসেনার সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকার গড়লেও সোমবার রাতে শিবসেনা ওই বিলের পক্ষে ভোট দেয়। এটা কিছুটা বিস্ময়ের। কারণ, সোমবারই দলের মুখপত্র ‘সামনায়’ ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রবল সমালোচনা করা হয়। মঙ্গলবার শিবসেনা প্রধান উদ্ধব ঠাকরে বলেন, ‘বিলে অনেক ধোঁয়াশা রয়েছে। সেসব স্পষ্ট না হলে আমরা রাজ্যসভায় সমর্থন না–ও জানাতে পারি।’

শিবসেনার মতোই অসন্তোষ জমা হয়েছে বিহারে বিজেপির শরিক সংযুক্ত জনতা দলে। দলীয় বৈঠকে এই বিলের সমালোচনা করলেও নিতীশ কুমারের দল কেন লোকসভায় বিলের পক্ষে ভোট দিল, সেই প্রশ্ন সরাসরি তুলেছেন দলের দুই নেতা পবন ভার্মা ও প্রশান্ত কিশোর। দুজনেই টুইট করে বলেছেন, ‘আমরা বিস্মিত, কেন ও কোন যুক্তিতে এই অসাংবিধানিক এবং বৈষম্যে ভরা বিলটি সমর্থন করা হলো।’ মুখ্যমন্ত্রী নিতীশ কুমারের কাছে তাঁদের আরজি, রাজ্যসভায় যেন বিলটি সমর্থন করা না হয়।

বিজেপির দাবি, বিলটি অসাংবিধানিক ও বৈষম্য সৃষ্টিকারী নয়। কেন নয়, তার ব্যাখ্যা দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেন, যে তিন রাষ্ট্রকে এই বিলের আওতায় আনা হয়েছে, প্রতিটিরই রাষ্ট্রীয় ধর্ম ইসলাম। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠরা আক্রান্ত নন। আক্রান্ত ও নির্যাতিত সংখ্যালঘুরা। তিনি বলেন, ‘রিজনেবল ক্লাসিফিকেশন’ বা যুক্তিসংগত শ্রেণিবিভাজনের ভিত্তিতে আইন প্রণয়নে সংবিধানে বাধা নেই। উগান্ডা থেকে শরণার্থীরা আসার সময় অথবা একাত্তরে বাংলাদেশ থেকে আসা শরণার্থীদের এভাবেই ভারতের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছিল। তখন কিন্তু সংবিধান লঙ্ঘনের কথা ওঠেনি।

কিন্তু তা সত্ত্বেও এই বিল আইনে পরিণত হলে বিরোধীরা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতে পারেন। তবে তা কতটা ফলপ্রসূ হবে, সে বিষয়ে অনেকেই সংশয়ী ও সন্দিহান। জম্মু–কাশ্মীরের বিশেষ ক্ষমতা (৩৭০ অনুচ্ছেদ) প্রত্যাহৃত হওয়ার পর এত দিন কেটে গেলেও সুপ্রিম কোর্ট চূড়ান্ত রায় দেননি। সেভাবে শুনানিও শুরু হয়নি। সরকারি সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন তাতে কিন্তু থমকে নেই। রাফাল বিতর্কও সুপ্রিম কোর্ট মিটিয়েছেন মুখবন্ধ খামে পাঠানো (যা প্রকাশ করা হয়নি) সরকারের আরজি অনুযায়ী। কাজেই বিচার বিভাগ শেষ পর্যন্ত এই গুরুত্বপূর্ণ মামলার নিষ্পত্তি কত দ্রুত করবে ও কীভাবে, তা অনুমানসাপেক্ষ। যদিও দেশের রাজনীতি এই বিলকে কেন্দ্র করে ফের চনমনে হয়ে উঠেছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন