বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কাহিনিটি এমন—মহাসড়ক দিয়ে মোটরসাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিল এক মদ্যপ ব্যক্তি। ট্রাকের ধাক্কায় তার মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে থানা-পুলিশের হেফাজত থেকে তার মোটরসাইকেলটি গায়েব হয়ে যায়। যেখানে ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছিল, ঠিক সেখানেই রহস্যজনকভাবে মোটরসাইকেলটি পাওয়া যায়। মোটরসাইকেলটি আবার থানায় আনা হয়। কিন্তু সেটি বারবার দুর্ঘটনাস্থলে ফিরে যায়। এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া মোটরসাইকেলচালককে একজন সাধু ব্যক্তি মনে করে কৌতূহলী ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন একদল গ্রামবাসী। রাজস্থানের ওই দুর্ঘটনাস্থলে একটি মন্দির গড়ে ওঠে, যার ‘দেবতা’ হয় মোটরসাইকেলটি।

বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে বলা হয়, উদ্ভূত আচার-অনুষ্ঠান ও ধর্মের বাণিজ্যিকীকরণের বিষয়টি হিন্দি ভাষার এ চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে। কোনো সন্দেহ ছাড়াই একদল মানুষ কীভাবে তাদের উদ্ভূত বিশ্বাসকে আঁকড়ে থাকতে চায়, তা এ চলচ্চিত্রে অন্বেষণ করেছেন নির্মাতা।

চলচ্চিত্রটির নির্মাতা ঋত্বিক পারেক। তাঁর জন্ম রাজস্থানের রাজধানী জয়পুরে। তিনি বলেন, ‘আপনি যদি কোনো কিছু মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, তাহলে সেটা আপনার ক্ষেত্রে কাজ দিতে থাকে।’

default-image

ফিচার ফিল্মটির দৈর্ঘ্য ১০৭ মিনিট। গত মাসে ৪৬তম টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সিনেমাটির প্রিমিয়ার হয়।

চলচ্চিত্রটি তৈরি হয়েছে রাজস্থানের পালির একটি মন্দিরকে নিয়ে। যোধপুর থেকে পালির দূরত্ব প্রায় ৭৫ কিলোমিটার। রাজস্থানে যেসব বিদেশি পর্যটক যান, তাঁদের অন্যতম পছন্দের স্থান যোধপুর।

মহাসড়কের ধারের ওই মন্দিরের ‘দেবতা’ একটি পুরোনো রয়্যাল এনফিল্ড বুলেট মোটরসাইকেল। মন্দিরের বেদির ওপর কাচের বাক্সের মধ্যে মোটরসাইকেলটি রাখা। মোটরসাইকেলে রয়েছে ফুলের মালা।

মোটরসাইকেলটির মালিক স্থানীয় বাসিন্দা ওম সিং রাঠোর। তিন দশকের বেশি সময় আগে যোধপুর-জয়পুর মহাসড়কে এক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন তিনি।

মন্দিরটি ‘বুলেট বাবার মন্দির’ নামেই বেশি পরিচিত। মহাসড়ক দিয়ে যেসব ট্রাকচালক যান, তাঁদের পছন্দের স্থানে পরিণত হয়েছে এই মন্দির। দীর্ঘ যাত্রাপথে তাঁরা এই মন্দিরে এসে বিরতি নেন। ঝুঁকিপূর্ণ মহাসড়কে বিপদ–আপদ থেকে রক্ষা পেতে তাঁরা এই মন্দিরে প্রার্থনা করেন।

বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানিতে ভারত শীর্ষস্থানীয় দেশ। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর বিশ্বে যত মানুষ প্রাণ হারায়, তার ১১ শতাংশ ভারতের। দেশটির সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ভারতে সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লাখ ৫১ হাজার ১১৩ জন নিহত হয়।

ঋত্বিক একসময় মুম্বাইয়ে বিজ্ঞাপনী সংস্থায় শিল্পনির্দেশক হিসেবে কাজ করতেন। পুরোদস্তুর চলচ্চিত্র নির্মাতা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ছয় বছর আগে এই চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। মুম্বাই থেকে জন্মস্থান জয়পুরে ফিরে যান তিনি। ঋত্বিক বলেন, ‘ভারতে অনেক মন্দির আছে, যার একটা আরেকটার চেয়ে বেশ অদ্ভুত।’

একপর্যায়ে ঋত্বিক মোটরসাইকেল দেবতার মন্দিরের কাহিনি নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। এ জন্য তিনি মন্দিরটি পরিদর্শন করেন। পাশাপাশি রাজস্থানের অনেক মন্দির পরিদর্শন করেন তিনি। এ নিয়ে মাস পাঁচেক গবেষণা করেন ঋত্বিক।

ঋত্বিক জানান, শৈশবে তিনি পালির মন্দিরে গিয়েছিলেন। তাঁর পরিবার খুবই ধর্মপ্রাণ। তাঁর ঠাকুমা যখনই কোনো মন্দিরে যেতেন, তাঁকেও সঙ্গে নিতেন। ঋত্বিক তাঁর বাবাকে যোধপুরে পাঠিয়েছিলেন রাঠোরের পরিবারের সঙ্গে সিনেমা বানানোর ব্যাপারটি নিয়ে কথা বলতে। তাঁর পরিবার দুটি শর্ত দেয়। সিনেমায় রাঠোরের প্রকৃত নাম ব্যবহার করা যাবে না। আর তিনি কোন গোত্রের, তার উল্লেখ থাকবে না।

default-image

পরে ঋত্বিক তাঁর সিনেমার স্ক্রিপ্ট লেখা শেষ করেন। সিনেমায় অভিনয়ের জন্য শতাধিক মানুষের অডিশন নেন। তাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন অপেশাদার। তাঁরা ছিলেন রামগড় নামের এক গ্রামের বাসিন্দা। গ্রামটির অবস্থান জয়পুর থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে। এ গ্রামেই সিনেমাটির শুটিং হয়।

সিনেমায় রাঠোরের চরিত্রটির নাম ঠাকুর লাল। এই চরিত্রে অভিনয়ের জন্য নির্বাচিত হন স্থানীয় এক বাসিন্দা। রাঠোরকে অনেক শ্রদ্ধা করেন জানিয়ে চরিত্রটি করবেন না বলে তিনি শুটিংয়ের সেট পর্যন্ত ছাড়েন। সিনেমায় রাঠোরের বুলেট মোটরসাইকেল হিসেবে ইতালীয় একটি কোম্পানির বাইকের ভারতীয় মডেল ব্যবহার করা হয়।

সিনেমাটির প্রযোজক ঋত্বিকের বোন প্রেরণা। তিনি বলেন, ‘যোধপুর মন্দির নিয়ে গল্পের আমাদের সংস্করণ এই সিনেমা।’

সিনেমাটির সংগীতায়োজন করেছেন রোহান রাজাধ্যক্ষ। ভারতীয় সংগীতগোষ্ঠী স্যালভেজ অডিও কালেকটিভের এই সদস্য সিনেমাটি সম্পর্কে বলেন, ‘কাউকে বিদ্রূপ করে মজা নেওয়ার জন্য এটি তৈরি করা হয়নি; বরং এই সিনেমায় মানুষের বিশ্বাসের শক্তিকে দেখানো হয়েছে।’

নির্মাতারা এখন আরেকটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁদের সিনেমাটি প্রদর্শনের অপেক্ষায় আছেন।

টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের প্রোগ্রামার পিটার কুপলোউস্কি আয়োজনের ‘ডিসকভারি’ ক্যাটাগরির জন্য এই সিনেমা নির্বাচিত করেন। এই ক্যাটাগরিতে প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের ভিন্নধর্মী গল্প নিয়ে নির্মিত সিনেমা রাখা হয়।

পিটার বলেন, ‘প্রতিটি সংস্কৃতির এমন দিক রয়েছে, যা অন্যের কাছে অদ্ভুত বলে মনে হতে পারে।’

ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন