default-image

আগ্রহের ফানুস চুপসে গিয়েছিল দিনকয়েক আগেই, যেদিন এক মাসের টালবাহানা দূর করে গান্ধী পরিবারের সঙ্গে শান্তি বৈঠকে যোগ দেন রাজস্থানের ‘বিদ্রোহী’ কংগ্রেস নেতা শচিন পাইলট। সেদিনই নির্ধারিত হয়ে যায় রাজস্থানের কংগ্রেস সরকারের ভাগ্য।

আজ শুক্রবার বিধানসভার অধিবেশনের চমক বলতে কিছুই প্রায় ছিল না বললেই হয়। প্রত্যাশিতভাবে আস্থা ভোটে জিতে পরবর্তী ছয় মাসের জন্য সরকার বহাল থাকার সাংবিধানিক ছাড়পত্র আদায় করে নিলেন মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলট। আস্থা প্রস্তাব পাস হলো ধ্বনি ভোটে।

জয়ের পরেই মুখ্যমন্ত্রী গেহলট বলেন, বিজেপি সরকার দখলে চক্রান্তের শেষ রাখেনি। দেশ যখন করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্যস্ত, বিজেপির তখন একমাত্র লক্ষ্য বিরোধীদের সরকার দখল করা। কিন্তু আমরা ঐক্যবদ্ধ থেকে তাদের বাড়া ভাতে ছাই ফেলেছি।

চমক না থাকলেও উত্তেজনা অবশ্য ছিল। বিধানসভা কক্ষে যুযুধান দুই শিবিরের স্লোগান, একে অন্যদের দিকে তেড়ে যাওয়া, নিরাপত্তারক্ষীদের তটস্থ ভাব এবং কেন্দ্রের শাসক দলের বিরুদ্ধে রাজ্যের শাসক দলীয় নেতাদের তীব্র কটাক্ষ, সব মিলিয়ে চমকপ্রদ উপাদানের অন্ত ছিল না। চমক ছিল ‘বিদ্রোহী’ নেতা শচিন পাইলটের ভাষণেও। এই সব কিছুর নিট ফল, রাজস্থান দখলে রাখতে কংগ্রেসের সাফল্য এবং গোয়া, মণিপুর, কর্ণাটক, মধ্য প্রদেশের মতো রাজস্থানও কংগ্রেসের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে বিজেপির ব্যর্থতা। এখন দেখার, গেহলট ও পাইলট শিবিরের দূরত্ব আগামী দিনে কতখানি ও কীভাবে মেটে। উপ মুখ্যমন্ত্রিত্ব ও প্রদেশ সভাপতির পদ হারানো পাইলট এবং তাঁর অনুগামীদের কীভাবে সন্তুষ্ট করা হয়।

বিজেপি ঠিক করেছিল অনাস্থা প্রস্তাব আনবে। মুখ্যমন্ত্রী গেহলট সে সুযোগ না দিয়ে নিজেই আস্থা ভোট গ্রহণের প্রস্তাব পেশ করেন। বিতর্ক শেষে বিকেলে ধ্বনি ভোটে প্রস্তাব পাশ হয়। বিএসপির ৬ সদস্যকে সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও তাঁরা সবাই ট্রেজারি বেঞ্চেই বসেছিলেন। যদিও বদল করা হয় পাইলটের আসন।

উপমুখ্যমন্ত্রী হিসেবে এত দিন পাইলটের আসন ছিল গেহলটের পাশেই। কিন্তু তাঁর আসন নির্দিষ্ট হয় দ্বিতীয় সারির ধারে যার পর থেকেই শুরু বিরোধীদের আসন। অবস্থান ও আসন বদলের এই বিষয় নিয়ে বিরোধীরা ব্যঙ্গ করলে পাইলট বলেন, ‘আমার আসন দেখছি বিরোধীকুলের পাশেই। এটাই স্বাভাবিক। কেননা, সেরা সেনাদেরই সব সময় সীমান্তে পাঠানো হয়।’ এক মাস দিল্লিতে কাটানো প্রসঙ্গের উত্থাপনও তিনি করেন মজার ঢংয়ে। রাহুল-প্রিয়াঙ্কার নাম না করে তাঁদের সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে বলেন, ‘দিল্লিতে ডাক্তার দেখিয়ে এসেছি। এখন আর কোনো সমস্যা নেই।’

এই দ্ব্যর্থক বৃহস্পতিবার ঘুরে ফিরে আসে বিভিন্ন সদস্যের ভাষণে। আস্থা ভোটের প্রস্তাব পেশ করে মন্ত্রী শান্তি ধারিওয়াল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর নাম না করে তাঁর উদ্দেশে বলেন, ‘কোনো শাহ কোনো শাহেনশা আমাদের দমাতে পারেনি। মহারানা প্রতাপ বহিরাগত হামলাকারীদের রুখে দিয়েছিলেন, মুখ্যমন্ত্রী গেহলটও বহিরাগতদের চক্রান্ত নস্যাৎ করে রাজস্থানকে রক্ষা করেছেন।’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নাম না করে তিনি বলেন, ‘মোডাস অপারানডাই’ শব্দবন্ধের নতুন নাম এখন ‘মোদিজ অপারানডাই।’

মধ্য প্রদেশের মডেল রাজস্থানেও প্রয়োগ করে সফল হতে চেয়েছিলেন অমিত শাহ। সে জন্য সিবিআই, এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট দিয়ে পুরোনো মামলা নতুনভাবে তুলে শাসক দলের মুখ্যমন্ত্রীর ভাইকে বিব্রতও করা হয়। কিন্তু, গেহলট আত্মসমর্পণ না করে লড়ে যান। ফলে পাইলটের অনুগামী ১৮ জন বিধায়ককে সঙ্গে নিয়েও বিজেপি গরিষ্ঠতার চেয়ে দূরে থাকে। অবস্থা একটা সময় এমন হয়ে দাঁড়ায় যে বিজেপি বিধায়কদের মধ্যেও গেহলট ভাঙন ধরানোর উপক্রম ঘটান। ঘর বাঁচাতে সন্দেহজনক ১৯জন বিজেপি বিধায়ককে গুজরাটে নিয়ে যাওয়া হয়।

রাজস্থান পর্ব কংগ্রেস রাজনীতিতে রাহুল-প্রিয়াঙ্কা জুটির অবস্থান আরও দৃঢ় করল। সরকারের পতন ঠেকাতে প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে শেষ মুহূর্তে রাহুলও যোগ দেন। পাইলটের সঙ্গে আলোচনার পথ প্রশস্ত হয়। রাজস্থানের জয় কংগ্রেসের মনোবল যতটা বাড়িয়ে তুলল, ততটাই প্রশ্নের মুখে টেনে আনল অমিত শাহর ‘অপ্রতিরোধ্য’ বিশেষণকে। কংগ্রেস বোঝাতে পারল, অমিত শাহর ইচ্ছাই সব সময় শেষ কথা নয়। তিনি অজেয় নন।

এখন দেখার, কোন শর্তে গেহলট-পাইলট সমঝোতা হলো। মুখ্যমন্ত্রিত্ব পেতে পাইলটের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাও কীভাবে মেটে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0