শেষ বিদায়ের পথে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। কলকাতা, ১৫ নভেম্বর
শেষ বিদায়ের পথে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। কলকাতা, ১৫ নভেম্বর ছবি: ভাস্কর মুখার্জি

দীর্ঘ ৪১ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই শেষে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন পশ্চিমবঙ্গের প্রথিতযশা অভিনেতা, আবৃত্তিকার, নাট্যকার, লেখক, চিত্রকর, মঞ্চ ও যাত্রা অভিনেতা, পরিচালক এবং চলচ্চিত্র অঙ্গনের এক কিংবদন্তি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। আজ রোববার রাতেই সম্পন্ন হচ্ছে তাঁর শেষকৃত্য।


আজ দুপুর সোয়া ১২টায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুর সংবাদে চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। ভারতের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীসহ মুম্বাই ও কলকাতার ছবিপাড়ার শিল্পীরা সৌমিত্রের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

বিজ্ঞাপন

ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ তাঁর শোকবার্তায় বলেছেন, ‘ভারতীয় চলচ্চিত্র এক কিংবদন্তিকে হারাল। অপুর ছবিতে তাঁর অভিনয় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর মৃত্যুতে অপূরণীয় ক্ষতি হলো আমাদের সংস্কৃতি অঙ্গনের।’

default-image

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, ‘অভিনেতা সৌমিত্রের মৃত্যুতে বাংলার সংস্কৃতি অঙ্গনে অপূরণীয় ক্ষতি হলো। তাঁর পরিবার এবং অনুরাগীদের সমবেদনা জানাই।’


পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘আমরা একজন বরণীয় স্মরণীয় শিল্পীকে হারালাম। আজ বাংলার এক দুঃখের দিন। আমি প্রতিদিন খবর নিয়েছি এই প্রথিতযশা শিল্পীর। আমি চেষ্টা করেছি তাঁকে ধরে রাখতে। পারলাম না।’

তিনি আমার পিতাই ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন কমরেড, সহকর্মী, আমাদের নাট্য আন্দোলনের সৈনিক, আর আমার পথপ্রদর্শক।
পৌলমী বসু, সৌমিত্র কন্যা

পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড় তাঁর শোকবার্তায় বলেছেন, প্রবীণ অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে বাংলার সংস্কৃতি অঙ্গনে গভীর শূন্যতার সৃষ্টি হলো। ভারতীয় চলচ্চিত্র হারাল এক কিংবদন্তিকে।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাঁর শোকবার্তায় বলেছেন, ‘আমরা ভারতের সংস্কৃতি জগতের ও রুপালি পর্দার এক রত্নকে হারালাম।’


প্রখ্যাত পরিচালক সন্দীপ রায়: ‘উনি ছিলেন আমাদের পারিবারিক বন্ধু। আমার বাবা সত্যজিৎ রায় তাঁকে দারুণ পছন্দ করতেন। ভালোবাসতেন। ওনার বিদায় নেওয়াকে আমরা মেনে নিতে পারছি না।’

পরিচালক ও অভিনেত্রী অপর্ণা সেন: ‘আজ হারালাম আমাদের একজন অভিভাবককে। এ ক্ষতি পুষে নেওয়ার নয়।’
অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়: ‘আজই তিনি চলে যাবেন ভাবতে পারিনি। আমাদের চলচ্চিত্র অঙ্গনের বিরাট ক্ষতি হয়ে গেল।’


অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুর: ‘দুঃখের দিন। কাছের মানুষকে হারালাম। ভাবতেই পারছি না। একজন সত্যিকার মানুষকে হারালাম।’
অভিনেতা কৌশিক সেন: ‘তাঁর সঙ্গে আলাপ না হলে আমি একজন পেশাদার শিল্পী হতে পারতাম না। তিনিই ছিলেন আমার আদর্শ।’

বিজ্ঞাপন
default-image

অভিনেতা শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়: ‘ভেবেছিলাম এবারও লড়াইটায় জিতে যাবেন। পারলেন না। উনি বেঁচে থাকবেন আমাদের মাঝে।’
অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিক: ‘তাঁর মতো একজন বড় মাপের অভিনেতার সঙ্গে কাজ করতে পেরে আমি ধন্য। তিনি আজ নেই, ভাবতে পারছি না।’


অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত: ‘একেবারে আশাহত হয়ে গেলাম। তিনি নেই ভাবতেই কষ্ট লাগে। তিনি থাকবেন আমাদের মাঝে চিরদিন।’
অভিনেতা সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায়: ‘আমার অভিভাবকের মতো কাজ করেছেন। আমাকে উপদেশ দিয়েছেন। পরামর্শ দিয়েছেন।’


পরিচালক গৌতম হালদার: ‘আমরা ছিলাম ওনার সঙ্গে একই পরিবারের মতো। সুখে-দুঃখে একসঙ্গে।’
অভিনেতা দেব: ‘বিশাল মাপের শিল্পী ছিলেন তিনি। তাঁর পরিধি মাপা যায় না। তিনি আমাদের অভিভাবক ছিলেন।’


অভিনেতা শংকর চক্রবর্তী: ‘আমার বিশ্বাস ছিল এবারের যুদ্ধে উনি জিতে ফিরে আসবেন। কিন্তু এলেন না। এ দুঃখ ঢাকব কী করে?’

অভিনেতা শান্তি লাল মুখার্জি: ‘আমরা হারালাম আমাদের এক বিশাল মাপের মহিরুহকে। উনি অসীম প্রতিভার মালিক ছিলেন।’
সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়: ‘খুব ভালো আর এক প্রশংসনীয় আবৃত্তিকার ছিলেন তিনি। ভেবেছিলাম উনি লড়াইয়ে জিতে ফিরে আসবেন। কিন্তু হেরে গেলেন। তিনি ছিলেন এক ঝলমলে মানুষ। সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বের এক মানুষ।’


কবি জয় গোস্বামী: ‘তাঁর কবিসত্তা চিরকালই ছিল। এবার এই ২০২০ সালেও বের হয়েছে তাঁর কাব্যগ্রন্থ। তিনি যুক্ত ছিলেন আমাদের সাহিত্যের সঙ্গে। আমরা তাঁকে হারালাম।’

নাট্যব্যক্তিত্ব ব্রাত্য বসু: ‘এই প্রবীণ অভিনেতাকে নিয়ে বাংলায় সংস্কৃতি অঙ্গনে এক উন্মাদনা ছিল। আজ তাঁকে হারালাম। মানতে পারছি না।’
নাট্যব্যক্তিত্ব বিভাস চক্রবর্তী: ‘৪০ বছর একসঙ্গে নাটক করেছি। তাঁকে কী করে ভুলব? উনি ছিলেন আমাদের নাটকের প্রাণ।’

default-image

শ্মশানের পথে

সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটায় সৌমিত্রের মরদেহ নিয়ে শোকযাত্রা শুরু হয় রবীন্দ্র সদন থেকে। এরপর সেই শেষ যাত্রা শেষ হয় দক্ষিণ কলকাতার কেওড়াতলা মহাশ্মশানে। সেখানে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে গান স্যালুট শেষে তাঁর মরদেহ প্রবেশ করানো হবে কেওড়াতলার মহাশ্মশানের চুল্লিতে। ধারণা করা হচ্ছে, চুল্লিতে আনুমানিক ৪৫ মিনিট প্রজ্বলন শেষে সৌমিত্রের দেহ বিলীন হবে বাংলাদেশ সময় নয়টার মধ্যে।


এর আগে আজ দুপুরে সৌমিত্রের মৃতদেহ শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য হাসপাতাল থেকে প্রথমে নেওয়া হয় তাঁর গলফ গ্রিনের বাসভবনে। সেখানে তাঁর স্ত্রী, ছেলে-মেয়েসহ স্বজনেরা তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান। এরপর তাঁর মরদেহ নেওয়া হয় কলকাতার ছবিপাড়ার টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে।


বেলা সাড়ে তিনটায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মরদেহ সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য নেওয়া হয় রবীন্দ্র সদনে। এখানে দুই ঘণ্টা রাখা হয় তাঁর মরদেহ। এখানেই কলকাতার বিশিষ্টজন, শিল্পী-কলাকুশলীরা শ্রদ্ধা জানান তাঁকে।

মন্তব্য পড়ুন 0