বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কোভিডের কারণে দুর্দশার ভার কাঁধে নিয়ে প্রথমবার ক্ষমা চেয়েছিলেন মোদি। গতকাল শুক্রবার সাতসকালে দ্বিতীয়বার। কিন্তু সেই ক্ষমাপ্রার্থনাও তাঁকে সমালোচনার হাত থেকে বাঁচাতে পারছে না। দিকে দিকে প্রশ্ন উঠেছে, বোধোদয় কেন এত দেরিতে? কেন সাড়ে ৭০০ কৃষকের বলিদানের জন্য অপেক্ষা করতে হলো?

উত্তরটা লুকিয়ে রয়েছে রাজনীতির আধারে, যার ওপর ঝুলে রয়েছে দুই বছর পর তৃতীয়বারের মতো তাঁর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা।

কৃষিক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্দেশ্যে গত বছর জুন মাসে কোভিড পরিস্থিতির মধ্যে তিনটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল মোদি সরকার। সেপ্টেম্বর মাসে সংসদের অধিবেশনে বিনা আলোচনায় তিনটি বিল আইনে রূপান্তরিত হয়। আরও আলোচনার দাবি মেনে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতেও বিলগুলো পাঠাতে অস্বীকার করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। উপেক্ষা করেছিলেন দেশজোড়া কৃষক আন্দোলনকেও। সংসদে সংখ্যাধিক্যের জোরে যা তিনি বলবৎ করতে চেয়েছিলেন, দেশের কৃষক মহল তার বিরুদ্ধে রুখেই শুধু দাঁড়াননি, অনির্দিষ্টকালের জন্য লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিয়ে শুরু করেন দিল্লি অবরোধ। তত দিনে ৪০টির বেশি সংগঠন এক ছাতার তলায় চলে এসেছে। গড়ে তুলেছে সংযুক্ত কিষান মোর্চা। কিন্তু মোদি ছিলেন অনড়, অটল। সিদ্ধান্ত থেকে একচুল না নড়ার সংকল্পে অটল।

default-image

শুধু তাই নয়, কৃষকদের মনোবল ও ঐক্য ভাঙতে চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখেনি শাসক বিজেপি। দিল্লির লাগোয়া বলে পাঞ্জাব-হরিয়ানার কৃষকেরা অবরোধে শামিল হওয়ায় তাঁদের ‘দেশদ্রোহী’ ও ‘খলিস্তানি’ বলতেও দ্বিধা করেনি শাসক দল। একদিকে প্রশাসনিক দমন–পীড়ন, অকথ্য পুলিশি অত্যাচার, অন্যদিকে বিভিন্ন ধারায় মামলা দায়ের করে কৃষক ঐক্যে ভাঙনের চেষ্টা চলেছে। দেড় বছর ধরে এটাই হয়ে দাঁড়িয়েছিল সরকারি নীতি। অন্যদিকে কৃষকেরাও ছিলেন অনড়। তিন আইন প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার থেকে তাঁরা পিছু হটতে রাজি হননি। অবশেষে দেড় বছর পর এটা তাঁদের মধুর জয়। যদিও সেই জয় সত্ত্বেও তাঁরা সন্দেহমুক্ত নন। প্রধানমন্ত্রীর নাটকীয় ঘোষণার পরই সংযুক্ত কিষান মোর্চা বিবৃতি দিয়ে জানায়, শুধু মুখের কথায় তাঁরা ভুলছেন না। সংসদে আইন রদ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা অবরোধ ও আন্দোলন তুলবেন না। এত দিন অপেক্ষায় থেকেছেন। আরও কিছুদিন অপেক্ষায় থাকবেন।

এ আস্থার ঘাটতি, ভারতীয় রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি এত তীব্র অবিশ্বাসের নমুনাও আগে দেখা যায়নি। সেই অর্থে এটাও অভূতপূর্ব। ক্ষমা প্রধানমন্ত্রী চেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু ভোটের রাজনীতিই যে তার কারণ, তা বুঝতে কারও বাকি নেই। বিভিন্ন দলের নেতারা সেই রাজনীতির দিকেই তাই কটাক্ষ করেছেন। আর কৃষকনেতারা বলেছেন, যাঁরা শহীদ হয়েছেন, যাঁদের বিরুদ্ধে গাদা গাদা মামলা রয়েছে, যাঁরা আটকে রয়েছেন জেলখানায়, তাঁদের প্রতি সরকারের মনোভাব কী, তা–ও তাঁরা দেখতে চান। লড়াই মোটেই শেষ হয়নি।

ক্ষমাপ্রার্থনা অথবা হৃদয় বদল ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠছে রাজনীতি, যার ওপর ঝুলে রয়েছে মোদি সরকারের ভবিষ্যৎ। রাজনীতির সেই অশনিসংকেত দিয়েছেন দলের নেতারাই। তাই কাকপক্ষীকে টের পেতে না দিয়ে চুপিসারে সিদ্ধান্ত নিলেন মোদি। গতকাল জাতির প্রতি ভাষণের সিদ্ধান্ত জানানো হলো সকাল পৌনে নয়টায়। ঠিক নয়টা পনেরো মিনিটের ভাষণে মোদি নিজেই নিজের মাথা নোয়ানোর বার্তাবাহক হলেন। তারপর গেলেন উত্তর প্রদেশ সফরে। দলের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ রিপোর্ট অবশ্যই মোদির এ সিদ্ধান্তের অনুঘটক।

সাম্প্রতিক উপনির্বাচনগুলোতে বিজেপির ফল হয়েছে হতাশাজনক। হিমাচল প্রদেশের চারটি আসনেই তারা পরাস্ত হয়েছে কংগ্রেসের কাছে। হরিয়ানায় উপনির্বাচনে হয়েছে তৃতীয়। রাজস্থানে দুটি আসন হারিয়েছে কংগ্রেসের কাছে। মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও কর্ণাটকে একটি করে কেন্দ্র কেড়ে নিয়েছে কংগ্রেস। দাদরা-নগর হাভেলিতে হেরেছে শিবসেনার কাছে। এর মধ্যেই দলীয় নেতারা তুলে ধরেছেন উত্তর প্রদেশের ছন্নছাড়া চিত্র। যে রাজ্য থেকে প্রধানমন্ত্রী জিতেছেন, যেখানকার ৪০৪টি বিধানসভার মধ্যে ৩১২টি বিজেপির দখলে, সেই রাজ্যে দুই–তৃতীয়াংশ আসন হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কার কথা শুনিয়েছেন দলীয় নেতারা। যে কারণে উত্তর প্রদেশে জনসভা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে বলতে হয়েছে, উত্তর প্রদেশ জিততে না পারলে ২০২৪ সালে মোদির প্রধানমন্ত্রী হওয়া কঠিন হয়ে যাবে। এ সম্ভাব্য বিপর্যয়ের প্রধান কারণ যে কৃষক আন্দোলন, দলীয় নেতারা সরাসরি তা জানাতেও দ্বিধা করেননি।

কৃষক আন্দোলনের ঢেউ সবচেয়ে বেশি উত্তর প্রদেশের পশ্চিমাঞ্চলে। এই তল্লাটে মোট ১০৪টি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে বিজেপির দখলে ৭৫টির মতো আসন। তা সম্ভব হয়েছিল জাট ও মুসলমান কৃষকদের জোটে ভাঙন ধরানোর কারণে। ২০১৩ সালের মুজফফরনগরের দাঙ্গার পর জাট ও মুসলমানের মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তার ফল পেয়েছিল বিজেপি। সেই ভাঙন জোড়া লাগিয়েছে কৃষক আন্দোলন। শুধু তাই নয়, মুসলমান ও জাটের যে ঐক্য ওই অঞ্চলে চরণ সিং-অজিত সিং-জয়ন্ত চৌধুরীর লোকদলকে অবধ্য করে রেখেছিল, সেই জোট আবার ফিরে এসেছে। অখিলেশ সিং যাদবের সমাজবাদী পার্টি ও জয়ন্ত চৌধুরীর লোকদল জোটবদ্ধ হয়েছে। ফলে প্রমাদ গুনেছে বিজেপি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আদিত্য নাথের প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণ ও দলিতদের ক্ষোভ। গত সাড়ে চার বছরে মুখ্যমন্ত্রী আদিত্য নাথ সামাজিক ক্ষেত্রে এমন কিছু করতে পারেননি, যা তাঁর ভোটের ঝুলি ভরানোর পক্ষে যথেষ্ট। বরং নিজের জাতের প্রতি (ক্ষত্রিয়) অপত্যস্নেহ অন্যদের মুখ ফেরাতে সাহায্য করেছে। এই পরিস্থিতিতে কৃষক ক্ষতে প্রলেপ লাগাতে এমন ডিগবাজি খাওয়া ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর উপায় ছিল না। দেশ হিসেবে ব্রিটেন, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র; ব্যক্তি হিসেবে গায়িকা রিয়ানা, পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের আইনজীবী বোনঝি মীনা হ্যারিস; মানবাধিকার রক্ষা সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, সবাই কৃষক আন্দোলন নিয়ে সরকারকে সতর্ক করলেও মোদি কানে তোলেননি। এবার বাধ্য হলেন ভোট বড় বালাই বলে।

এর ঢেউ কত দূর যাবে, সেই উত্তর ভবিষ্যতের গর্ভে। কৃষক নেতারা আপাতত জয় উপভোগ করছেন। দিল্লি সীমান্তে গতকাল উদ্‌যাপিত হয়েছে দ্বিতীয় দীপাবলি। সেই রোশনাইয়ে কৃষকনেতারা বলেছেন, আইন প্রত্যাহারই সব নয়, ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের আইনি স্বীকৃতি লাভ তাঁদের দ্বিতীয় লক্ষ্য। দেড় বছর ধরে প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে কৃষকদের আস্থা ও বিশ্বাসের ঘাটতি যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, এই সিদ্ধান্ত তা কমাতে পারবে কি? প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আচম্বিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পর এই রাজনৈতিক প্রশ্নটি বড় হয়ে উঠেছে।

ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন