default-image

করোনা মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিসহ দেশটির বিভিন্ন শহরের অধিকাংশ হাসপাতালে এখন আর শয্যা ফাঁকা নেই। এ কারণে ঘরে বসেই চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন রোগীরা। কিন্তু ঘরে বসেও চিকিৎসা পেতে তাঁদের দারুণ বেগ পেতে হচ্ছে। অনেকটা মরিয়া হয়ে লড়াই করতে হচ্ছে। কারণ, অক্সিজেন সিলিন্ডার, জরুরি ওষুধসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী দোকানে পাওয়া যাচ্ছে না। এগুলো কালোবাজার থেকে চড়া দামে কিনতে হচ্ছে ভুক্তভোগীদের। আজ সোমবার বিবিসি অনলাইনের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

এই যেমন আনশু প্রিয়ার কথাই ধরা যাক। তাঁর শ্বশুরের শারীরিক অবস্থা অবনতিশীল। দিল্লি ও তার উপশহর নয়ডার কোনো হাসপাতালে শয্যা খুঁজে পাননি প্রিয়া। তাঁর শ্বশুরের অক্সিজেন দরকার। একটি অক্সিজেন সিলিন্ডারের জন্য তিনি গতকাল রোববার সারাটা দিন বিভিন্ন দোকানে খোঁজাখুঁজি করেছেন। কিন্তু তাঁর সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। শেষে অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনতে তিনি কালোবাজারে যেতে বাধ্য হন।

সাধারণ সময়ে ভারতে একটি অক্সিজেন সিলিন্ডারের দাম পড়ে ৬ হাজার রুপি। কিন্তু এখন এই প্রতিকূল সময়ে সেই সিলিন্ডার কিনতে প্রিয়াকে মোটা অঙ্কের অর্থ খরচ করতে হয়েছে। তিনি কালোবাজার থেকে একটি অক্সিজেন সিলিন্ডার ৫০ হাজার রুপি দিয়ে কিনেছেন।

প্রিয়ার শাশুড়িও শ্বাসকষ্টের সমস্যায় ভুগছেন। এখন তাঁকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন প্রিয়া। তিনি বলেন, কালোবাজার থেকে একই মূল্যে আরেকটি সিলিন্ডার কেনা তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে না।

পরিস্থিতি যাচাই করতে বিবিসির পক্ষ থেকে একাধিক অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। অধিকাংশ অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহকারী স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ১০ গুণ বেশি দাম চেয়েছেন।

প্রিয়ার যে লড়াইয়ের কথা বলা হলো, তা এখন ভারতে বিরল কোনো ঘটনা নয়। নয়াদিল্লি, নয়ডা, লক্ষ্ণৌ, এলাহাবাদ, ইন্দোরসহ দেশটির বিভিন্ন শহরের হাসপাতালে এখন উপচে পড়া রোগী। হাসপাতালে কোনো শয্যা আর ফাঁকা নেই। এ কারণে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো তাদের অসুস্থ রোগীকে বাড়িতে রাখতে বাধ্য হচ্ছে। বাড়িতেই চিকিৎসার যথাসম্ভব আয়োজন করছে।

এখন বিশেষ করে দিল্লির পরিস্থিতি ভয়াবহ। সেখানকার কোনো হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা ফাঁকা নেই। যেসব পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য আছে, তারা তাদের প্রিয় মানুষটিকে বাঁচিয়ে রাখতে বাড়িতেই নার্স নিয়োগ দিচ্ছে। চিকিৎসকের সঙ্গে ভার্চ্যুয়ালি পরামর্শ করছে।

ভারতে কয়েক দিন ধরে প্রতিদিন তিন লাখের বেশি করোনা রোগী শনাক্ত হচ্ছে। প্রতিদিনই সংক্রমণ শনাক্ত ও মৃত্যুতে রেকর্ড হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে দেশি রেকর্ড তো বটেই, বিশ্বরেকর্ডও হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন
default-image

আজ সোমবারের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে গত ২৪ ঘণ্টায় সাড়ে ৩ লাখের বেশি করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। একই সময় দেশটিতে করোনায় ২ হাজার ৮০০ জনের বেশি মানুষ মারা গেছেন।

করোনার সংক্রমণের ভয়াবহ ঊর্ধ্বগতির মুখে ভারতের অনেক শহরের স্বাস্থ্যসেবা–ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় সাধ্য অনুযায়ী ঘরে প্রিয় মানুষটির চিকিৎসার ব্যবস্থা করা ছাড়া ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু ঘরে বসে তো আর সব চিকিৎসাসেবা পাওয়া সম্ভব নয়। যেমন: রক্ত পরীক্ষা, সিটি স্ক্যান, এক্স-রের মতো সেবা পেতে ল্যাবে যেতে হয়।

কিন্তু ল্যাবগুলোও এখন আর পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না। তারা পরীক্ষার জন্য রোগীকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিতে সময় নিচ্ছে। আবার পরীক্ষার পর প্রতিবেদন দিতেও তারা তিন দিন পর্যন্ত সময় নিচ্ছে। তিন দিন পর পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পেয়ে তার ভিত্তিতে রোগীর চিকিৎসা করা চিকিৎসকদের জন্য কঠিন। কারণ, করোনা রোগীর অবস্থা দ্রুত পরিবর্তন হয়। চলে যায় অনেকটা সময়।

চিকিৎসকেরা বলছেন, পরীক্ষা করাতে বিলম্ব বা পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে আসতে যে দেরি হচ্ছে, তা অনেক রোগীর জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে।

ভারতে এমন ঘটনাও ঘটেছে, অনেক রোগী হাসপাতালে হয়তো শয্যা খুঁজে পেয়েছেন। কিন্তু ভর্তি হতে পারেননি। কারণ, তাঁর কাছে করোনা পরীক্ষার প্রতিবেদন নেই। ফলে রোগী বাধ্য হয়ে বাড়িতে ফিরে গেছেন।

অনুজ তিওয়ারি তাঁর ভাইকে একাধিক হাসপাতালে ভর্তির চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কোনো হাসপাতালই তাঁকে ভর্তি নেয়নি। পরে তিনি তাঁর ভাইকে বাসায় রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। ভাইয়ের চিকিৎসাসেবার জন্য বাসায় একজন নার্স নিয়োগ দেন।

কিছু ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, হাসপাতালে গিয়ে তাঁরা শয্যা পাননি। আবার কেউ কেউ জানিয়েছেন, অক্সিজেনের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার থাকায় নতুন রোগী ভর্তি করছে না হাসপাতালগুলো।

রাজধানী নয়াদিল্লিতে বেশ কিছু রোগী অক্সিজেনের অভাবে মারা গেছেন। নয়াদিল্লির হাসপাতালগুলো অক্সিজেন পেতে মরিয়া। কোনো কোনো হাসপাতাল প্রতিদিন সতর্কতা জারি করছে। তারা বলছে, তাদের হাতে মাত্র কয়েক ঘণ্টার অক্সিজেন আছে।

হাসপাতালের এমন পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে অনুজ তিওয়ারি বলেন, তাঁর ভাইকে বাঁচিয়ে রাখতে তাঁরা ঘরেই চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু তাঁর ভাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রী দোকানে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই তিনি কালোবাজারে যেতে বাধ্য হন।

অনুজ তিওয়ারি বলেন, ‘আমি ইতিমধ্যে অনেক অর্থ খরচ করে ফেলেছি। হাতে আর বেশি অর্থ নেই।’

অনুজ তিওয়ারি জানান, ভারতে করোনা রোগীকে বাঁচানোর যে মরিয়া লড়াই, তা এখন হাসপাতাল থেকে বাসায় স্থানান্তরিত হয়েছে। কিন্তু বাসার লড়াইটাও কঠিন হয়ে উঠেছে। কারণ, সহজে অক্সিজেনসহ অন্যান্য জিনিস পাওয়া যাচ্ছে না।

ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন