আলাদা জীবন পেল সাফা-মারওয়া

বিজ্ঞাপন
default-image

সাফা-মারওয়া এ দুনিয়ায় স্বাভাবিকভাবে আসেনি। তাদের মাথা ছিল জোড়া লাগানো। মা-বাবা দিশেহারা—এই যমজ নিয়ে কী করবেন তাঁরা! শেষে ৫০ ঘণ্টার সফল অস্ত্রোপচারের পর আলাদা করা হয়েছে সাফা-মারওয়াকে। গতকাল সোমবার চিকিৎসকেরা এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানিয়েছেন।

বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে জানানো হয়, তিনটি বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের পর দুই বছর বয়সী যমজ শিশু সাফা উল্লাহ ও মারওয়া উল্লাহকে আলাদা করা হয়েছে। লন্ডনের গ্রেট অরমন্ড স্ট্রিট হাসপাতালে এই জটিল অস্ত্রোপচার সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন হয়।

সাত সন্তানের মা পাকিস্তানের চারসদ্দা এলাকার জয়নাব বিবি প্রতিটি শিশুর জন্ম দিয়েছেন ঘরেই। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় যমজ সন্তানের কথা জেনেও তাঁর পরিকল্পনা ছিল একই কাজ করার। তবে শারীরিক জটিলতার কারণে হাসপাতালে গিয়ে আলট্রাসাউন্ড স্ক্যান করিয়ে চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। পুরো পরিবারকে কঠিন অবস্থার মুখে ফেলে শিশুদের জন্মের ঠিক দুই মাস আগে হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান জয়নাবের স্বামী।

প্রসূতি বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জয়নাবের শিশুদের শরীরের কোনো অংশ জোড়া লাগানো থাকতে পারে। তবে ঠিক কোন অংশে জোড়া থাকবে, এ ব্যাপারে কিছু জানাতে পারেননি তাঁরা। এ কথা শুনেও কোন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন, তা আগে থেকে আঁচ করতে পারেননি জয়নাবের পরিবারের কেউ।

২০১৭ সালের ৭ জানুয়ারি পেশোয়ারের হায়াতাবাদ হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আলোর মুখ দেখে যমজ শিশু দুটি। জয়নাবকে বলা হয়, বাচ্চারা সুস্থ আছে। কিন্তু অপারেশনের ধাক্কা কাটাতে সময় লাগবে বলে তৎক্ষণাৎ তাদের মায়ের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। যমজদের দাদা মোহাম্মদ সাদাত হুসেইন প্রথম জানতে পারেন, তাঁর দুই নাতনি ক্রনিপ্যাগাস টুইন। অর্থাৎ, তাদের মাথা ও রক্তনালি জোড়া লাগানো। মিষ্টি হাতে নাতনিদের মুখ দেখতে গিয়ে চমকে ওঠেন তিনি। সদ্য ছেলে হারানোর শোক কাটানো সাদাত হুসেইন বুঝতে পারছিলেন না, তাঁর খুশি হওয়া উচিত, না এই শিশুদের নিয়ে মন খারাপ করা উচিত?

default-image

পাঁচ দিন পর জয়নাবকে প্রথমে বাচ্চা দুটির ছবি দেখানো হয়। মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে সন্তানদের সামনে হাজির করা হয় তাঁকে। কিন্তু সন্তানদের দেখেই খুশিতে মন ভরে ওঠে মায়ের। শিশু দুটির মুখ, চোখ, চুল দেখে জোড়া মাথার সমস্যাও মাথায় আসেনি তাঁর। সৌদি আরবের মক্কার দুটি পর্বত সাফা-মারওয়ার নামানুসারে তাদের নাম রাখা হয়।

এক মাস পর হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয় বাচ্চা দুটিকে। পরিবারের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সম্ভব হলে তাদের আলাদা করা হবে। এক সামরিক হাসপাতাল থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়, তারা এ অস্ত্রোপচার করতে পারে। তবে এতে একটি সন্তানের মারা যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান জানায়, এ ঝুঁকি নিতে রাজি হননি বাচ্চাদের মা।

সাফা-মারওয়ার বয়স তখন তিন মাস। এ সময় বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শিশু হাসপাতাল লন্ডনের গ্রেট অরমন্ড স্ট্রিটের শিশুবিষয়ক নিউরোসার্জন ওসায়ে জিলানির সঙ্গে কথা হয় জয়নাবদের। জিলানির জন্ম কাশ্মীর এলাকায়, জোড়া মাথার বাচ্চাদের কথা জানতে পেরেই সাফা-মারওয়ার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। মেয়ে দুটির মাথার স্ক্যান করে তিনি বুঝতে পারেন, সুস্থভাবেই তাদের আলাদা করা সম্ভব। তবে বয়স ১২ মাস হওয়ার আগেই অপারেশন করতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয় বলে জানান জিলানি।

২০১৮ সালের আগস্ট মাসে যুক্তরাজ্যের ভিসা হাতে পান জয়নাবরা। তবে অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান তখনো হয়নি। হাসপাতালের খরচ বাবদ সামান্য কিছু অর্থ জড়ো করতে পেরেছিলেন জিলানি, কিন্তু এতে অস্ত্রোপচার সম্ভব না। তত দিনে বাচ্চাদের বয়স দাঁড়িয়েছে ১৯ মাস। আর দেরি করলে শল্য চিকিৎসার ঝুঁকি বেড়ে যাবে। তাদের বেঁচে থাকার সুযোগ কমে যাবে। তাৎক্ষণিকভাবে বাচ্চাদের নিয়ে ইংল্যান্ডে আসার তাগিদ দেন জিলানি।

জিলানির বরাতে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ জানায়, ‘বাচ্চা দুটোকে সুস্থভাবে আলাদা করা আমার ব্যক্তিগত দায়িত্ব বলে মনে করছিলাম। টাকা কোথায় পাব ভেবে খুব অস্থির লাগছিল।’

সাফা-মারওয়ার চাচা মুহাম্মদ ইদ্রিস এবং দাদা সাদাত হুসেইন হাসপাতালের কাছেই একটি ফ্ল্যাটে ওঠেন। কিন্তু বাচ্চাদের কাছ থেকে জয়নাবকে এক মুহূর্তের জন্যও দূরে সরানো যায়নি। জোড়া লাগানো যমজ হওয়া সত্ত্বেও বিবিসি অনলাইনকে তাদের ভিন্ন ব্যক্তিত্বের গল্প শোনান মা। বুদ্ধিমান সাফা হাসিখুশি, প্রাণবন্ত একটি বাচ্চা। কথা বলতে ভালোবাসে সে। অন্যদিকে, মারওয়া বেশ লাজুক। পরিবারের লোকজন কথা বলতে চাইলেও তার পক্ষ থেকে সহসা উত্তর মেলে না।

default-image

জয়নাবরা লন্ডন পৌঁছানোর কিছুদিনের মধ্যেই এক আইনজীবী বন্ধুর সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ করছিলেন জিলানি। কথায় কথায় বন্ধুকে বাচ্চা দুটির গল্প শোনান তিনি। আর এতে জাদুর মতো কাজ হয়। সেই মুহূর্তেই কাকে যেন ফোন করে মেয়ে দুটির কথা জানান আইনজীবী। যার সঙ্গে কথা বলছিলেন, তিনি পাকিস্তানের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মুর্তজা লাখানি। কয়েক মিনিটের মধ্যে টাকার ব্যবস্থা হয়ে যায়।

২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে প্রথম অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। সর্বশেষ অস্ত্রোপচারটি হয় চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি। অস্ত্রোপচার যাতে সফল হয়, সে লক্ষ্যে ভার্চ্যুয়াল রিয়্যালিটি ব্যবহার করে বাচ্চা দুটির দেহতন্ত্রের হুবহু রেপ্লিকা তৈরি করেন বিশেষজ্ঞরা। অনুশীলনের জন্য থ্রিডি প্রিন্টিং ব্যবহার করে বাচ্চা দুটির প্লাস্টিক মডেল তৈরি একটি বিশেষজ্ঞ দল।

সার্জারির শুরুতে বাচ্চা দুটির রক্তনালি আলাদা করে নেন চিকিৎসকেরা। মাথার ভেতর এক টুকরো প্লাস্টিক ঢুকিয়ে মস্তিষ্ক এবং রক্তনালি আলাদা করে ফেলা হয়। স্ক্যান করে দেখা যায়, বাচ্চা দুটির মস্তিষ্ক স্বতন্ত্র হলেও আকৃতি ঠিক নেই। প্লাস্টিক আর কপিকল পদ্ধতি ব্যবহার করে মস্তিষ্ক দুটো সঠিক আকৃতিতে আনা হয়। পরবর্তী অস্ত্রোপচারে সাফার গলার শিরায় রক্ত জমাট বেঁধে যায়। সেই রক্ত তার যমজ বোনের শরীরে প্রবাহিত হতে থাকলে দুজনেরই রক্তক্ষরণ শুরু হয়। কিছুক্ষণ পর মারওয়ার হৃৎস্পন্দন কমে যেতে থাকে। তার বাঁচার আশা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়। তাকে সুস্থ করতে যমজদের সংযুক্ত একটি শিরা কেটে মারওয়াকে দেওয়া হয়। কিন্তু এর ফলে ভুগতে হয় সাফাকে। শিরা হারানোর ১২ ঘণ্টার ভেতরে স্ট্রোক করে সাফার।

সর্বশেষ অস্ত্রোপচারে মেয়ে দুটোর হাড় ব্যবহার করে নতুন মাথার খুলি তৈরি করা হয়। খুলির ওপরে যেন নতুন চামড়া তৈরি হয়, তা নিশ্চিত করতে তাদের টিস্যুও ব্যবহার করা হয়। সাফা-মারওয়া যেন আলাদা দুটো মানুষ হিসেবে জীবন যাপন করতে পারে, এ জন্য ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিনিয়োগ করা অর্থে খুঁটিনাটি সব শারীরিক সমস্যার সমাধান করা হচ্ছে। প্রায় ১০০ সদস্যের সহযোগিতায় ৫০ ঘণ্টার অস্ত্রোপচার গতকাল সফলভাবে শেষ হয়। তারা এখন আর সাফা-মারওয়া নয়, তারা এখন সাফা ও মারওয়া।

৩৪ বছর বয়সী জয়নাব বিবি বলেন, ‘হাসপাতালের প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছে আমরা ঋণী। তাঁদের আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাতে চাই। ভবিষ্যতে কী ঘটে, তা দেখার জন্য মুখিয়ে আছি আমরা।’

শিশু দুটিকে ১ জুলাই হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। মা আর দাদার সঙ্গে লন্ডনেই থাকছে সাফা-মারওয়া। প্রতিদিনই তাদের দেখাশোনা করছেন চিকিৎসকেরা। গতকাল নিউরোসার্জন জিলানি এবং ক্র্যানিফেসিয়াল সার্জন অধ্যাপক ডেভিড ডুনাওয়ে এক বিবৃতে বলেন, ‘সাফা-মারওয়া ও তাদের পরিবারের জন্য এটি একটি দীর্ঘ ও জটিল যাত্রা ছিল। তাদের বিশ্বাস এবং আস্থার কারণেই এমন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়ার সাহস পেয়েছি। আমরা তাদের নিয়ে গর্বিত।’

সংযুক্ত যমজ জন্ম নেওয়ার ঘটনা সারা পৃথিবীতে খুবই বিরল। আড়াই মিলিয়ন শিশুর মধ্যে এক জোড়া এমন দুর্লভ শিশু জন্মে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন