অনাস্থা ভোটের আগে জাতির উদ্দেশে গতকাল বৃহস্পতিবার ভাষণ দিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। ভাষণে তিনি তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বিদেশিদের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলেন। তিনি দাবি করেন, বিদেশিরা তাঁকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করতে চায়। এদের সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর যোগাযোগ রয়েছে। অনাস্থা ভোটে তিনি জয়ী হয়ে গেলে পাকিস্তানকে কঠিন সময়ের মুখে পড়তে হবে।
এর আগে তিনি নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য ও সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ জাতীয় পরিষদে ইমরান খানের বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাবের ওপর বৃহস্পতিবারও আলোচনা শুরু করা যায়নি। গত সোমবারের পর বৃহস্পতিবার বিকেল চারটায় জাতীয় পরিষদে অধিবেশন শুরু হয়। কিন্তু শুরুর কয়েক মিনিটের মাথায় আগামী রোববার পর্যন্ত অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন ডেপুটি স্পিকার কাসিম সুরি। ওই দিনই অনাস্থা প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটি হতে পারে।

অধিবেশনের শুরুতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বাবর আওয়ান অধিবেশন মুলতবির আবেদন জানানোর পর তা কার্যকর করা হয়। তবে বিরোধীরা গতকালই ভোটাভুটির আবেদন জানান।

জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ইমরান খান বলেন, ‘আমি সরাসরি ভাষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কারণ পাকিস্তান একটি চূড়ান্ত ক্ষণের মুখোমুখি হয়েছে এবং আমাদের সামনে দুটি পথ রয়েছে।’ এ সময় তাঁকে উৎখাতে বিদেশি ষড়যন্ত্রের প্রমাণ হিসেবে একটি হুমকির চিঠির কথা ভাষণে তুলে ধরেন ইমরান খান। তিনি বলেন, ‘আমি আজ এখানে। কারণ ৭ বা ৮ মার্চ আমি একটি চিঠি পেয়েছি, আমাদের মতো একটি স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এমন বার্তা আমাদের দেশের বিরুদ্ধেও।’ এ সময় ইমরান খান মুখ ফসকে যুক্তরাষ্ট্রের নাম বলেন ফেলেন। তিনি বলেন, ‘৮ মার্চ বা সম্ভবত তার আগে ৭ মার্চ। আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে একটি চিঠি পেয়েছি... না, যুক্তরাষ্ট্র নয়। আমি বলতে চাইছি, চিঠিটি অন্য কোনো দেশ থেকে এসেছে। চিঠিটি শুধু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে নয় পুরো জাতির বিরুদ্ধে।’

যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ইঙ্গিত করে ইমরান খান বলেন, তারা আগেই জানত অনাস্থা ভোট হবে। অথচ তখনো অনাস্থা প্রস্তাব দেওয়া হয়নি। এর অর্থ হলো বিরোধীরা বিদেশের এসব মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তাঁরা বলছেন, তাঁরা পাকিস্তানের ওপর ক্ষুব্ধ। তাঁরা অজুহাত তৈরি করছে। তাঁরা বলছে, তাঁরা পাকিস্তানকে ক্ষমা করে দেবে যদি অনাস্থা ভোটে ইমরান খান হেরে যান। কিন্তু যদি এই পদক্ষেপ ব্যর্থ হয় তাহলে পাকিস্তানকে কঠিন সময় পার করতে হবে।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে হামলা শুরু করে রাশিয়া। ওই সময় মস্কোতে অবস্থান করছিলেন ইমরান খান। ভাষণে ইমরান খান দাবি করেন, তিনি একা ওই সফরের সিদ্ধান্ত নেননি।

ইমরান খান বলেন, ‘আমি আজ জাতিকে বলতে চাই, এটা আমাদের দেশ। আমরা ২২ কোটি মানুষের দেশ এবং অন্য দেশ.... এবং তারা কেন হুমকি দিচ্ছে, কোনো কারণ দেখাচ্ছে না। তারা শুধু বলছে, ইমরান খান রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। তারা এই একটা বিষয়কে ইস্যু করে হুমকি দিচ্ছে। অথচ এই সিদ্ধান্ত আমি একা নিইনি। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়েছিল তখন।’

ইমরান খান বলেন, ‘আমাদের রাষ্ট্রদূত তাদের বলেছিলেন, পরামর্শক্রমেই ইমরানের রাশিয়া ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা সেটা অস্বীকার করেছে। তারা বলছে, ইমরান খান নিজে ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং ইমরান ক্ষমতায় থাকলে আমাদের সুসম্পর্ক থাকবে না।’

ইমরান মনে করেন তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানোই বিদেশি চক্রান্তের মূল উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, ‘তারা আসলে যা বলছে সেটা হলো, কে ইমরানের জায়গায় আসছেন সেটা নিয়ে ‍তাদের কোনো মাথা ব্যথা নেই।’

প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের তেহরিক-ই-ইনসাফ পার্টি থেকে এ মাসে ২০ জন এমপি বেরিয়ে যাওয়ায় তিনি সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছেন দাবি করে বিরোধী দলগুলো তাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনে।

তারকা ক্রিকেটার ইমরান ২০১৮ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তবে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা সামলাতে হিমশিম খেতে হয়েছে তাঁকে। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও দিন দিন বাড়তে থাকা ঘাটতির জেরে ইমরানের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা সমালোচনার মুখে পড়েছে। এ ছাড়া সামরিক বাহিনীর সঙ্গে টানাপোড়েনের কথাও শোনা যাচ্ছে।

এসব পরিস্থিতির মধ্যে গত ২৮ মার্চ জাতীয় পরিষদে তাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করেন বিরোধী দলের নেতারা। মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট-পাকিস্তানসহ (এমকিউএম-পি) কয়েকটি দল ইমরান সরকারের জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় বিরোধীরা এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে দাবি করা হচ্ছে।

পাকিস্তান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন