default-image

সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে জাতিসংঘে তারা তালিকাভুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করেছে, ওই সংগঠনের প্রধান হাফিজ সাঈদকে ধরিয়ে দিতে পারলে এক কোটি ডলার দেওয়া হবে। কিন্তু এতে কুছ পরোয়া নেহি ওই নিষিদ্ধ সংগঠন জামায়াত-উদ-দাওয়ার। জনসেবার কর্মকাণ্ড নিয়ে এই সংগঠনের জঙ্গিরা অবাধে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সারা পাকিস্তানে। এই সেবার গুণে পাকিস্তানে বেশ জনপ্রিয় তারা। তাদের খুঁটি এত শক্ত, জঙ্গি সমস্যা মোকাবিলায় ইসলামাবাদের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে তারা। গত মঙ্গলবার এএফপির এক প্রতিবেদনে এমনটাই আভাস দেওয়া হয়।
জঙ্গিদের কাতারে থাকলেও জামায়াত-উদ-দাওয়ার ভাবটা এমন যে তারা কারও জন্য ক্ষতিকর নয়, বরং ভালোমানুষি একটা অবস্থান নেওয়ার তালে রয়েছে। কিন্তু গত ডিসেম্বরে পেশোয়ারে সেনাবাহিনী পরিচালিত একটি স্কুলে তালেবানের নির্বিচার হামলায় শিশুশিক্ষার্থীসহ ১৫৩ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় পাকিস্তান সরকার এখন কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বলা হচ্ছে, পাকিস্তানের ইতিহাসে এটা সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা। সরকার এখন বলছে, তথাকথিত ‘ভালো’ জঙ্গিদেরও আর ছাড় দেওয়া হবে না।
যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতসহ প্রভাবশালী দেশগুলো মনে করে, জামায়াত-উদ-দাওয়া পাকিস্তানের অন্যতম সংন্ত্রাসী সংগঠন লস্কর-ই-তাইয়েবার (এলইটি) মতোই আরেকটি বিষফোড়া। ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলার জন্য এলইটিকে দায়ী করা হচ্ছে।

জামায়াত-উদ-দাওয়া দাবি করে, কোনো ধরনের সহিংসতার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা নেই। পাকিস্তানে এই সংগঠন তাদের দাতব্য কর্মসূচির জন্য ব্যাপক জনপ্রিয়। বি‌শেষ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে কর্মকাণ্ডের জন্য।

দেশটির সরকার কাগজে-কলমে ৬০টি বা এরও বেশি সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে পাকিস্তানি তালেবান ও বেলুচিস্তান প্রদেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহীরাও রয়েছে। কিন্তু কার্যত সরকারকে তাদের ‌বিরুদ্ধে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না, বরং ভারত বা আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে তাদের ‘সুযোগ্য হাতিয়ার’ মনে করা হয়। যদিও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মুম্বাই হামলার পর পাকিস্তান সরকার জিহাদি এই সংগঠনের সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে।
লাহোরের উত্তরে মুরিদকে শহরে জামায়াত-উদ-দাওয়ার সদর দপ্তরটি কড়া নিরাপত্তায় ঘেরা। চারদিকে রয়েছে ধানখেত। ফিলিস্তিনের হামাস ও লেবাননে হিজবুল্লাহ যে ভূমিকায় রয়েছে, জামায়াত-উদ-দাওয়া তেমনি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে পাকিস্তানজুড়ে তাদের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। এর মধ্যে রয়েছে পাঁচটি হাসপাতাল, ২০০টি ওষুধের দোকান, অ্যাম্বুলেন্স সেবা ও ২০৫টি স্কুল।

সদর দপ্তরে স্থাপিত আল-আজিজ হাসপাতালের ভেতরেই রয়েছে একটি স্কুল। সেখানে ছেলেমেয়েদের জামায়াত-উদ-দাওয়ার পক্ষ থেকে প্রকাশিত বই ও সরকারের নির্ধারিত বই পড়তে হয়।

হাসপাতালে চিকিৎসা খরচও বাইরের তুলনায় অনেকটাই কম। হাসপাতালের প্রধান আখতার হোসাইনের দেওয়া তথ্যমতে, এখানে বিনা খরচে চোখের লেজার সার্জারি করা হয়। দুজন দন্ত চিকিৎসক প্রতিদিন ৪০ জন করে রোগী দেখেন।

হাসপাতালে আসা রানা খালিক-উর রহমান নামের এক রোগী জানান, দাঁতের রুট ক্যানেল করতে এখানে খরচ হয় মাত্র ৫০ রুপি। আর বাইরে বেসরকারিভাবে করাতে গেলে লাগে অন্তত এক হাজার রুপি।

default-image


ভূমিকম্প বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর দুর্গত মানুষের সেবায় যারা প্রথম ঝাঁপিয়ে পড়ে, এর মধ্যে জেএইডির ত্রাণ শাখা ফালাহ-ই-ইনসানিয়াত ফাউন্ডেশন একটি। আর যাঁর মাথার দাম এক কোটি মার্কিন ডলার, সেই হাফিজকে দেখা যায় সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে খাবার বিতরণ করতে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পুরস্কার ঘোষণাকে থোড়াই কেয়ার করে জনসমক্ষে ব্যাপকভাবে থাকছেন তিনি। গত বৃহস্পতিবার কাশ্মীর দিবস পালন উপলক্ষে লাহোরের হাইকোর্ট এলাকায় পুলিশের সামনে হাজারো সমর্থকের মিছিলে নেতৃত্ব দেন তিনি।

দলের সমর্থক ২৫ বছর বয়সী সাদ্দাম সোহাইল বলেন, ‘রাজনীতিবিদেরা আমাদের সমস্যা বোঝেন না। কিন্তু জামাত বোঝে ও সাহায্য করে।’

৫৫ বছর বয়সী এক কৃষক বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যখন বলে জেইউডে একটি সন্ত্রাসী দল, তখন আমার রক্ত ফুটতে থাকে।’
জামাত-উদ-দাওয়া নিয়ে গবেষণা করেন এমন একজন আরিফ জামাল বলেন, কাশ্মীরে নিজেদের শক্ত অবস্থানের কারণে সেখানে দলটির জনপ্রিয়তা ব্যাপক। এই জনপ্রিয়তা আর তাদের দাতব্য কর্মকাণ্ড দলটিকে অন্য জিহাদি গোষ্ঠী ও সংগঠন থেকে আলাদা করে তুলেছে। এই গোষ্ঠীর দাতব্য কর্মকাণ্ড ‘রক্ষাকবচ’ হিসেবে কাজ করে।
জামাল বলেন, অনেক পাকিস্তানির কাছে কাশ্মীর যুদ্ধে এই গোষ্ঠীটির অবস্থান শুধু ভারত সেনাবাহিনীর শোষণের বিরুদ্ধে। তারা মোটেই এই সংগঠনকে সন্ত্রাসী দল বলে মনে করে না।
এমনকি রাজনীতিবিদেরা ব্যক্তিগতভাবে এই গোষ্ঠীর বিরোধিতা করলেও প্রকাশ্যে কখনো তাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলেন না।

বিজ্ঞাপন
পাকিস্তান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন