এমকিউএম-পির প্রধান নাসরিন জলিল সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন জোট ত্যাগের খবর নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ইমরানকে অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা থেকে সরাতে বিরোধী জোটে যোগ দিয়েছেন তাঁরা। বিরোধী জোটের নেতৃত্বে রয়েছে পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) ও পাকিস্তান মুসলিম লিগ (পিএমএল–এন)।

অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা ও ভুল পররাষ্ট্রনীতির অভিযোগ তুলে গত সোমবার পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ জাতীয় পরিষদে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করেন বিরোধী নেতারা। এরপর আগামীকাল বৃহস্পতিবার বিকেল চারটা পর্যন্ত পরিষদের অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন স্পিকার আসাদ কায়সার। আগামীকালের অধিবেশনে ওই প্রস্তাবের ওপর বিতর্ক শুরুর কথা রয়েছে।

পাকিস্তান সংবিধান অনুযায়ী, জাতীয় পরিষদে অনাস্থা প্রস্তাব পেশ করা হলে এর অন্তত তিন দিন পর এবং সাত দিনের মধ্যে ভোটাভুটির আয়োজন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। একাধিক সূত্র বলছে, আগামী সোমবার অনাস্থা ভোটের সম্ভাবনা রয়েছে।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশটিতে চারটি সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে। এরপর থেকে তিন দশকের বেশি সময় সামরিক শাসনের অধীনে ছিল পাকিস্তান। পাকিস্তানের ইতিহাসে কোনো প্রধানমন্ত্রীই তাঁর ক্ষমতার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি।

খাতা–কলমের হিসাবে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে মোট আসন ৩৪২টি। ইমরানকে ক্ষমতাচ্যুত করতে অনাস্থা প্রস্তাবের পক্ষে ১৭২টি ভোটের প্রয়োজন হবে। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বিরোধী জোটে রয়েছেন ১৭৬ জন আইনপ্রণেতা। এর মধ্যে পিএমএল–এনের ৮৪ জন, পিপিপির ৫৬ জন, মুত্তাহিদা মজলিশ–ই–আমলের ১৫ জন, বেলুচিস্তান ন্যাশনাল পার্টির চারজন, আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টির একজন, বেলুচিস্তান আওয়ামী পার্টির চারজন, পাকিস্তান মুসলিম লিগ–কিউয়ের একজন, জামহুরি ওয়াতান পার্টির একজন, এমকিউএম–পির সাতজন ও স্বতন্ত্র তিনজন রয়েছেন। অপরদিকে ইমরান সরকারের পক্ষে রয়েছেন ১৬৬ জন আইনপ্রণেতা।

এর বাইরে জাতীয় পরিষদে ইমরানের দলের বেশ কয়েকজন আইনপ্রণেতাও অনাস্থা প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিতে পারেন বলে ইঙ্গিত এসেছে। তাঁদের এমন পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত রাখতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন দলটির নেতারা। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ভোটের দিন দলীয় আইনপ্রণেতাদের জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে বারণ করেছেন ইমরান।

২০১৮ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান ইমরান খান। ২০২৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত তাঁর সরকারের মেয়াদ রয়েছে। এ অনাস্থা ভোট ইমরানের বিপক্ষে গেলেও পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী, পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া হবে না। আগামী আগস্ট পর্যন্ত সরকার চালিয়ে নিতে জাতীয় পরিষদের আইনপ্রণেতাদের ভোটে নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের জন্য পরিষদের সব দলই প্রার্থী দিতে পারবে। নতুন প্রধানমন্ত্রী তাঁর ক্ষমতাবলে যেকোনো সময়ে সাধারণ নির্বাচনের ডাক দিতে পারবেন। অপরদিকে ভোটে যদি কোনো প্রার্থী সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পান, সে ক্ষেত্রেও পরিষদ ভেঙে দিয়ে সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করা হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনাস্থা ভোটে ইমরান হারলে নতুন সরকারের প্রধান হতে পারেন পিএমএল–এনের প্রধান শাহবাজ শরিফ। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ভাই। সাজা মাথায় নিয়ে নওয়াজ লন্ডন রয়েছেন। এমকিউএম-পির ঘোষণার পর শাহবাজ বলেছেন, পাকিস্তানের ইতিহাসে আজ একটি ঐতিহাসিক দিন। কারণ, বিরোধীদের ঐক্য জাতীয় ঐক্যে পরিণত হয়েছে।

সরকারে বড় পদ পেতে পারেন পিপিপির নেতা বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি। তিনি দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো ও সাবেক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির ছেলে। তাৎক্ষণিক মন্তব্যে বিলাওয়াল ভুট্টো বলেছেন, ইমরান খান সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছেন। তিনি আর প্রধানমন্ত্রী নন। আগামীকালই তিনি ভোট আয়োজনের দাবি করেন।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিশ্লেষক জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) তালাত মাসুদের ভাষ্য, ‘এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ভালো সমাধান হলো নতুন একটি নির্বাচনের আয়োজন করা। এর ফলে নতুন একটি সরকার পাকিস্তানের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও বাহ্যিক সমস্যা সামাল দেওয়ার সুযোগ পাবে। দেশ অনিশ্চিত কিছুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে অনেক বিশৃঙ্খলা ও সমস্যা রয়েছে।’

পাকিস্তান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন