বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

পেরুতে ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে ভয়ংকর সন্ত্রাস ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে গুজমান ও তাঁর সংগঠনের বিরুদ্ধে। শাইনিং পাথের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র তৎপরতায় পেরুতে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ নিহত বা বাস্তুচ্যুত হয়।

পেরুর আইন অনুসারে, কারাগারে কোনো বন্দী মারা গেলে তাঁর লাশ কোনো সরাসরি আত্মীয় বা স্বজন—এমন ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করতে হয়। কিন্তু গুজমানের স্ত্রী এলেনা ইপারগ্রুগেইর ছাড়া আর কেউ তাঁর সরাসরি আত্মীয় বা স্বজন নেই। এলেনা শাইনিং পাথের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’। তিনি সন্ত্রাসবাদের দায়ে বর্তমানে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন।

এলেনা তাঁর সাবেক সহকারাবন্দী আইরিস কুইনোনজকে গুজমানের লাশ গ্রহণ করে সৎকারের ক্ষমতা দিয়েছেন।

তবে দেশটির সরকারি কৌঁসুলির কার্যালয় থেকে গতকাল রোববার বিকেলে বলা হয়েছে, গুজমানের লাশ ছাড়ের আবেদনটি আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পর্যালোচনা করা হবে।

গুজমানের লাশ দাহ করে ভস্ম প্রশান্ত মহাসাগরে ফেলে দেওয়ার ব্যাপারে পেরুতে ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। কারণ, গুজমানকে পেরুতে সমাহিত করা হলে সমাধিস্থলটি তাঁর সমর্থকদের জন্য নতুন করে সংগঠিত হওয়ার উপলক্ষে পরিণত হতে পারে।

পেরুর রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফার্নান্দো রসপিগলিওসি বলেন, ‘এই গণহত্যাকারীর (গুজমান) দেহাবশেষ তাঁর আত্মীয়স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা উচিত হবে না। যেহেতু তাঁর স্ত্রী কারাবন্দী, তাই তিনি গুজমানের লাশ গ্রহণ করতে পারবেন না। তাই গুজমানের লাশ দাহ করে দেহভস্ম সমুদ্রে ফেলে দেওয়াটাই হবে যৌক্তিক ও যুক্তিসংগত পদক্ষেপ।’

ফার্নান্দো বলেন, তাঁর (গুজমান) অনুসারীদের জন্য কোনো উপাসনালয় তৈরি করা উচিত নয়।

পেরুর বিচারমন্ত্রী আনিবল টোরেসও গুজমানের লাশ দাহ করার পক্ষে। তিনি বলেন, গুজমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর কোনো পথ খোলা রাখা উচিত নয়।

পেরুর বিচারমন্ত্রী আরও বলেন, গুজমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো, তাঁকে স্মরণ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন সন্ত্রাসকে সমর্থনেরই নামান্তর। এটা আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

গুজমানের লাশের ময়নাতদন্ত হয়েছে। এতে বলা হয়, তিনি ‘ডাবল নিউমোনিয়ায়’ মারা গেছেন।

গুজমানের জন্ম ১৯৩৪ সালের ডিসেম্বরে, পেরুর দক্ষিণ অংশের উপকূলীয় এলাকায়। একটি বেসরকারি ক্যাথলিক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ছোটবেলায় পড়ালেখা করেন তিনি। উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন আরেকুইপা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। সেখানে তিনি জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের ওপর গবেষণা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় গুজমান মার্ক্সবাদে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ১৯৬২ সাল নাগাদ তিনি পেরুর আয়াকুসো শহরের হুয়ামাঙ্গা ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির দর্শনের অধ্যাপক হন।

১৯৬৫ সালে চীন সফর করেন গুজমান। এ সময় তিনি চীনের কমিউনিস্ট নেতা মাও সে তুং দ্বারা অনুপ্রাণিত হন। পেরুতে ফিরে গুজমান তাঁর সমমনা শিক্ষাবিদদের আয়াকুসোর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিতে উৎসাহিত করেন।

১৯৬৯ সালে গুজমান ও অন্য ১১ ব্যক্তি মিলে ‘শাইনিং পাথ’ প্রতিষ্ঠা করেন। মাওবাদে অনুপ্রাণিত হয়ে এই গেরিলা সংগঠন পেরুর ‘বুর্জোয়া গণতন্ত্র’ উৎখাত করে কমিউনিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য ‘গণযুদ্ধ’ পরিচালনার চেষ্টা করে। গোষ্ঠীটি শুরুতেই সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হয়নি। তবে একপর্যায়ে তারা ভয়ংকর রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র তৎপরতায় জড়িত হয়।

গুজমান ১৯৮০-এর দশকে শাইনিং পাথ যে সশস্ত্র গেরিলা তৎপরতা শুরু করে, তা সামাল দিতে পেরুর সরকার হিমশিম খেতে থাকে। এমনকি জরুরি অবস্থাও জারি করতে হয়। শাইনিং পাথের আনুমানিক সদস্যসংখ্যা ছিল ১০ হাজার। তাদের হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডে পেরুতে অনেক মানুষ প্রাণ হারায়।

১৯৯২ সালে রাজধানী লিমায় গ্রেপ্তার হন গুজমান। গোপন সামরিক আদালতে তাঁর বিচার হয়। বিচারে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন