default-image

প্রায় ১৪ বছর ক্ষমতায় থাকা ইভো মোরালেস লাতিন আমেরিকার কোনো দেশে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় প্রেসিডেন্টের পদে থাকা নেতা। বলিভিয়ার সাবেক এই প্রেসিডেন্ট তাঁর দেশের প্রথম আদিবাসী নেতা। সম্প্রতি বিক্ষোভের মুখে ৬০ বছর বয়সী এই নেতা পদত্যাগে বাধ্য হন। রাজনৈতিক আশ্রয়ে তাঁকে ঠাঁই নিতে হয়েছে মেক্সিকোয়। এর মধ্য দিয়ে শূন্য থেকে শিখরে ওঠা এক নেতার আবার শূন্যে মিইয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সাংবিধানিক আদালতে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ সীমা বাতিল করার বিতর্কিত সিদ্ধান্তের পর মোরালেস চলতি বছরের অক্টোবরে টানা চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, ২০ অক্টোবরের নির্বাচনে ‘সুস্পষ্ট কারচুপির’ প্রমাণ পাওয়ায় আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করার আহ্বান জানান। নির্বাচনে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট কার্লোস মেসা এই বিতর্কিত নির্বাচনের তীব্র প্রতিবাদ জানান। এর জেরে বলিভিয়ায় কয়েক সপ্তাহ ধরে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। গত রোববার শাসক দলের জোট থেকে অন্য দলগুলো সরে যাওয়ার পর মোরালেসের সরকার ভেঙে পড়ে। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে মোরালেসকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়। অবশেষে ১০ নভেম্বর টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে মোরালেস পদত্যাগের ঘোষণা দেন।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইভো মোরালেস অনেক বেশি কাজ করতেন—এমনটাই জানত সবাই। রাজনৈতিক জীবনে উত্থান-পতন দেখেছেন অসংখ্যবার। তাঁর শেষটা যেমন তিক্ত হতে যাচ্ছে, শুরুটা কিন্তু ছিল তার চেয়েও কঠিন।

বলিভিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের ওরুরোতে এক দরিদ্র পরিবারে ইভো মোরালেসের জন্ম। তাঁর ছয় ভাইবোনের মধ্যে চারজনই দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগে অপুষ্টিজনিত রোগে ভুগে মারা গেছে। ছোটবেলায় তিনি লামার (দক্ষিণ আমেরিকার তৃণভোজী প্রাণী) রাখাল ছিলেন, মা–বাবাকে কৃষিকাজে সহযোগিতা করতেন। গান গাইতেন, ফুটবল খেলতেন। ছিলেন কোকোচাষি।

default-image

আয়মারা ভাষাভাষী গোষ্ঠীর মধ্যে তিনি বেড়ে উঠেছেন। বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষা অর্জনের জন্য তরুণ বয়সে বেশ কষ্ট করেই স্প্যানিশ শিখতে হয়েছিল তাঁকে। খরার কারণে অনেকটা বাধ্য হয়ে তিনি আশির দশকের শুরুর দিকে কোকো উৎপাদনকারী এলাকায় চলে যান। সেখানে গানের দল গড়ে তোলেন, ফুটবল খেলায় জড়িয়ে পড়েন। গান আর ফুটবলের কারণে তিনি দেশের বাইরে ভ্রমণের সুযোগ পান।

মাদকের দোহাই দিয়ে কোকো চাষের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন প্রচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠ ছিল মোরালেসের। এ সময় ইউনিয়ন নেতা হিসেবে তাঁর উত্থান। তাঁর নেতৃত্বে কোকোচাষিরা আন্দোলন গড়ে তোলেন। বলিভিয়ার অনেকে কোকো পাতা পানের মতো চিবিয়ে খান, আবার অনেকে এটি চা-পাতার মতো ব্যবহার করে পান করেন। মোরালেসের যুক্তি, কোকো দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। কোকোর হাত ধরেই রাজনীতিতে পা রাখেন মোরালেস।

২০০২ সালে ইভো মোরালেস প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেন। ব্রিটিশ দৈনিক ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বলিভিয়ার আদিবাসীদের পক্ষে শাসন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রান্তিক পর্যায়ে থাকা আদিবাসীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। সেবার হেরে গেলেও ২০০৫ সালের নির্বাচনে তিনি ৫৪ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তিনি এই বিজয় বিশ্বের সব ‘সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও পুঁজিবাদবিরোধী’ নেতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন।

ক্ষমতায় এসে মোরালেস হাত দিলেন সংবিধানে। দেশের নাম পাল্টে রাখলেন ‘প্লুরিন্যাশনাল স্টেট অব বলিভিয়া’। দেশটির ডজনখানেক আদিবাসী গোষ্ঠী এবং তাদের ধর্মের কথা মাথায় রেখে সংবিধানে যোগ করেন ধর্মনিরপেক্ষতা।

বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে জানানো হয়, ৬৫ শতাংশ আদিবাসীর দেশ বলিভিয়ায় বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু কেবল কার চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে ইভো মোরালেসের শাসনামলে। দেশের প্রথম স্যাটেলাইটও উৎক্ষেপণ হয়েছে তাঁর আমলেই। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূরীকরণে অগ্রগতিও হয়েছে অনেকটা।

একই সঙ্গে তিনি লড়তে থাকেন কোকোচাষিদের অধিকার নিয়ে। কোকো চাষ পুরোপুরি নির্মূল করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপ থাকা সত্ত্বেও কোকো চাষকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন তিনি। ফলাফল, যুক্তরাষ্ট্র তাঁর ঘাড়ে কোকেন উৎপাদনের অপবাদ চাপিয়ে দেয়। মাদক পাচার ও দুর্নীতি রোধে ব্যর্থতার তকমা গায়ে লাগিয়েই চলতে থাকে মোরালেসের শাসন। ১৩ বছর ৯ মাসের শাসনামলেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর তেতো সম্পর্ক ছিল। তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ২০০৮ সালে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ফিলিপ গোল্ডবার্গকে বলিভিয়া থেকে তাড়িয়ে দেন। ২০১৩ সালে বিরোধী দলকে সহায়তা করার দায়ে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাকেও (ইউএস এইড) বিতাড়িত করেন।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলা, ইকুয়েডর, ব্রাজিলসহ লাতিন আমেরিকাজুড়ে বাম ঘরানার সরকার প্রতিষ্ঠার জোয়ার ‘পিংক টাইডে’ যোগ দেন মোরালেস। স্বীকৃত সমাজতান্ত্রিক নেতা মোরালেস ক্ষমতায় এসে নিজের বেতনসহ মন্ত্রিসভার অন্যদের বেতনও কমিয়ে দেন। এরপর তিনি তেল ও গ্যাস শিল্পকে নতুন করে গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন। করের মাধ্যমে বাড়তে থাকা আয়ের কারণে বলিভিয়ার জনসাধারণ ব্যাপক পরিমাণে বিনিয়োগের সুযোগ পায়। একই সঙ্গে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুতও বাড়তে থাকে।

দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়তে গণপূর্ত প্রকল্প এবং সামাজিক কর্মসূচিতে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে মোরালেস প্রশাসন। তাঁর এ ধরনের উদ্যোগ আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়। ২০০৬ সালে বলিভিয়ার ৩৮ শতাংশ জনগণ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করত। তাঁর অধীনে ২০১৮ সালে সে হার ১৭ শতাংশে নেমে আসে। অবশ্য মোরালেসের সমালোচকদের দাবি, গত দুই বছরে চরম দারিদ্র্য আবারও ফিরে এসেছে।

প্রেসিডেন্ট মোরালেসের বামপন্থী নীতি বলিভিয়ার মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। নীতিগত দিক থেকে মোরালেসকে অনেকেই উগ্রবাদী মনে করতেন।

default-image

সমালোচকদের অভিযোগ, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অপরাধ, মাদক পাচার ও দুর্নীতি রোধে ব্যর্থ হয়েছেন। এ কারণেই অক্টোবরের নির্বাচনে তাঁর জয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তাঁর পরাজয়ের অন্যতম একটি কারণ প্রতিবেশী চিলির সঙ্গে বিরোধের জেরে বলিভিয়ার সমুদ্রের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা। বলিভিয়ার নাগরিকদের কাছে সমুদ্র জাতীয় গর্বের বিষয়। চিলির সঙ্গে যুদ্ধের পর ১৮৮৪ সালে প্রশান্ত মহাসাগরে প্রবেশাধিকার হারিয়ে ফেলে দেশটি। তখন থেকেই এই অধিকার আবারও ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।

গত বছর অক্টোবরে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত সমুদ্র নিয়ে চিলির পক্ষে রায় দিয়েছে। মোরালেসের জন্য এটি একটি বড় ধাক্কা ছিল। এর আগে তিনি বলিভিয়ার নাগরিকদের আশ্বাস দিয়েছিলেন, তাঁরা চিলির বিরুদ্ধে জয়ের ‘খুব কাছাকাছি’ চলে এসেছেন।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাময়িকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এর প্রতিবেদনে জানা গেছে, ইভো মোরালেস আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনে নিয়মিত বক্তব্য দিয়েছেন। সেখানে তিনি ধরণীর প্রতি শ্রদ্ধা বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশ রক্ষায় ভারসাম্য বজায় রাখতে তিনি সব সময় সফল হননি। মোরালেসের সময়ে সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর মধ্যে একটি ছিল আমাজনের মধ্য দিয়ে রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা। আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর যুক্তি, এর ফলে অবৈধভাবে তাদের জমি দখলের সুযোগ বেড়ে যাবে। এর জেরে বড় আকারের সহিংস বিক্ষোভ ২০১১ সালে সরকারকে পিছিয়ে যেতে বাধ্য করে। পরবর্তী সময়ে ২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ প্রত্যাখ্যান করে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মোরালেস।

এ বছর আমাজন বনাঞ্চলে দাবানলের ঘটনায় মোরালেস তোপের মুখে পড়েন। দেশের পূর্বাঞ্চলীয় সুরক্ষিত অঞ্চলগুলোতে বিক্ষোভ শুরু হয়। কৃষিক্ষেত্র বাড়াতে স্থানীয় কৃষকদের আমাজনে আগুন দিতে উৎসাহ দেওয়া ফরমান বাতিল করার আহ্বান জানান বিক্ষোভকারীরা।

এই অগ্নিকাণ্ডে মোরালেসের প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে যাঁরা প্রতিবাদ করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই ২০১৬ সালের গণভোটের ফলাফলকে উপেক্ষা করার অভিযোগ জানান। গণভোটে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিল, বলিভিয়ার প্রেসিডেন্টরা কত বছর ক্ষমতায় থাকতে পারবেন, দেশটির নাগরিকেরা আদৌ সে সময়সীমা পরিবর্তন করতে চায় কি না। সংখ্যাগরিষ্ঠরা সেবার ‘না’ ভোট দিয়েছিলেন। তবে প্রেসিডেন্ট মোরালেসের দল বিষয়টি সাংবিধানিক আদালতে নিয়ে যায়। যার ফলে শাসনামলের সীমাবদ্ধ মেয়াদের রীতি পুরোপুরি বাতিল হয়ে যায়।

মোরালেসের সমালোচকেরা বলছেন, তাঁর সরকার জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে চতুর্থ দফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এ ব্যাপারে মোরালেসের যুক্তি, তিনি যেসব সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছেন, তা শেষ করতে তাঁর আরও সময় প্রয়োজন।

নির্বাচনে তাঁর আপাত বিজয় কয়েক সপ্তাহের প্রতিবাদের সূত্রপাত ঘটায়। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা জানিয়েছেন, নির্বাচনে ‘সুস্পষ্ট কারচুপির’ প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর ফলে এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়। টেলিভিশন প্রচারিত এক ভাষণে তিনি বলতে বাধ্য হন, ‘আমি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করছি।’

মোরালেসের দাবি, তিনি ‘অভ্যুত্থানের’ শিকার এবং তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। মেক্সিকোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্সেলো এবরার্ড বলেছেন, মোরালেসের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ছিল। তাই মেক্সিকো তাঁকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছে। একসময় জনগণের আস্থার প্রতীকে পরিণত হওয়া মোরালেস এখন দেশছাড়া। প্রায় ১৪ বছর পর ক্ষমতাচ্যুত মোরালেস এবং মোরালেসহীন বলিভিয়ার ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছেন বিশ্লেষকেরা।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0