default-image

হাভানার প্লাজা ডে লা রেভুলুচির কাছে একটি মেডিকেল সেন্টারের সামনে সকাল সাতটা থেকে ভিড়। কেউ কেউ সেখানে কয়েক ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছেন। তাঁরা সবাই সবেরানা-২ নামের টিকাটি পেতে স্বেচ্ছাসেবক হওয়ার আশায় এসেছেন।

সবেরানা-২ কিউবার সবচেয়ে এগিয়ে থাকা করোনার টিকা। এটি বর্তমানে পরীক্ষার তৃতীয় ধাপে রয়েছে। সকাল আটটার দিকে অপেক্ষায় থাকা ৪০ জনকে দুটি বড় ঘরে নিয়ে পরীক্ষা–নিরীক্ষা শুরু করা হয়। এই টিকা পরীক্ষায় স্বেচ্ছাসেবক হতে গেলে কী করতে হবে, তা জানানো হয়। এর মধ্যে ইয়োসভানি রদ্রিগেজ (৩৭) নামের এক ব্যক্তি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নির্বাচিত হন। ওই ক্লিনিকের কর্মীরা তাঁর উচ্চতা, ওজন, রক্তচাপ পরীক্ষার পরের দিন তাঁকে টিকা নিতে আসতে বলেন। তাঁকে জানানো হয়, প্রথম ডোজ টিকা নেওয়ার ২৮ দিন পর তিনি পাবেন টিকার দ্বিতীয় ডোজ।

বিজ্ঞাপন

মাত্র ১ কোটি ১০ লাখ মানুষের দেশ কিউবা। সেখানে সাধারণ পণ্য হিসেবে চাল, প্যারাসিটামলের মতো অনেক কিছুর স্বল্পতা আছে। তবে চিকিৎসা গবেষণার ক্ষেত্রে দেশটির ইতিহাস দীর্ঘ। করোনা মহামারির সময়ও দেশটি গবেষণায় ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। ১৯৫৯ সালের কিউবা বিপ্লবের পর দেশটির অর্ধেক চিকিৎসক বিদেশে পাড়ি জমান। এরপর কিউবা বিপ্লবের নেতা ফিদেল কাস্ত্রো স্বাস্থ্য খাতে জোর দেন। তাঁর আশা ছিল, চিনির মতোই ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্য রপ্তানি করা যাবে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সময় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যেও স্বাস্থ্য খাতে দেশটি বরাদ্দ কমায়নি। ওই সময় হাভানায় চালু হয় সেন্টার অব মলিকুলার ইমিউনোলজি সেন্টার। কিউবার অর্থনীতিবিদ রিকার্ডো তোরেস বলেন, তখন খাবার কেনার জন্য কোনো অর্থ ছিল না। কিন্তু তখন নতুন ক্যানসার গবেষণা কেন্দ্র খোলার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর সুফল পেয়েছে দেশটি। প্রতিবছর কিউবা অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্য ৫০ লাখ ডোজ টিকা উৎপাদন করে থাকে।

কিউবার টিকাগুলো অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, সুসংবাদের গল্প। কিন্তু কাস্ত্রোহীন শাসনের অনিশ্চয়তায় থাকা সাধারণ কিউবাবাসীর কাছে শুধু এ সুসংবাদে জীবনযাপন করা সম্ভব নয়।
এমিলি মরিস , অর্থনীতিবিদ , ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন

কিউবা বর্তমানে কোভিড-১৯–এর জন্য সম্ভাব্য পাঁচটি টিকা তৈরিতে কাজ করছে। এর মধ্যে সবেরানা-২ টিকাটি তৈরি করছে বায়ো কিউবা ফার্মা। এটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জৈবপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। তৃতীয় ধাপের টিকা পরীক্ষায় ৪৪ হাজারের বেশি মানুষ টিকা নিয়েছেন। এ ছাড়া এক লাখের বেশি টিকা ইরানে পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছে দেশটি। কিউবা সরকার আশা করছে, তাদের পরীক্ষা সফল হলে, এ বছরের শেষ নাগাদ তারা ১০ কোটি ডোজ টিকা উৎপাদন করতে পারবে। যেসব টিকা উদ্বৃত্ত থাকবে তা মিত্রদেশ ভেনেজুয়েলার কাছে বিক্রি করবে। এ ছাড়া বিদেশি পর্যটকদের কাছে টিকা বিক্রির মাধ্যমে আয়ের চিন্তাও করছে দেশটি।

বিশ্বের বড় কয়েকটি টিকা প্রস্তুতকারক দেশ ইতিমধ্যে টিকা কূটনীতিতে যুক্ত হয়েছে। তবে কিউবা সে পথে হাঁটেনি। দেশটির স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোয় তাদের টিকার সফলতার কথা গুরুত্বসহকারে তুলে ধরা হচ্ছে। তবে টিকা নিয়ে বাগাড়ম্বর থাকলেও এর বিপরীত চিত্রও দেখা যায়।

default-image

বর্তমানে দেশটিতে করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার বাড়ছে। তবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় সেখানে সংক্রমণের হার কম। কিউবায় এখন দিনে এক হাজার মানুষের করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ছে, ২০২০ সালের শেষ দিকের তুলনায় যা ২০ গুণ বেশি। সংক্রমণের হার বাড়ার কারণ হচ্ছে বিমানবন্দরগুলো খুলে দেওয়ার পর বিদেশি পর্যটক বেড়ে যায়।

তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, কিউবার টিকা কার্যকর প্রমাণিত হলেও দেশটির সরকার এ থেকে খুব বেশি আয় করতে পারবে না। আধুনিক ওষুধ প্রস্তুত করার ঝুঁকি বেশি ও এতে অনেক মূলধন বিনিয়োগ করতে হয়। কিউবার সীমাবদ্ধ অর্থনীতি এ ক্ষেত্রে পেরে উঠবে না।

বিজ্ঞাপন

ইয়াম বায়োসায়েন্সের নামের একটি ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের প্রধান ডেভিড অ্যালান বলেন, এখন পর্যন্ত কিউবায় তৈরি কোনো ওষুধ অধিক নিয়ন্ত্রিত কোনো বাজারে অনুমোদন পায়নি। এ ছাড়া এখানে উৎপাদন খরচও বেশি। কারণ, কিউবা সব ধরনের যন্ত্রাংশ নিজেরা তৈরি করে না। এর পরিবর্তে তাদের দামি যন্ত্রাংশ আমদানি করতে হয়। এ ছাড়া সেখানে ভায়াল সংকট রয়েছে।

লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে প্রথম টিকা উৎাপদনকারী দেশ হিসেবে সম্ভাবনা থাকলেও কিউবা তার দেশের জনগণকে দেরিতে টিকা দিতে শুরু করেছে। ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা শেষ হতে আরও কয়েক মাস লাগবে। তবে আশার কথা, পরীক্ষার পুরো ফল আসার আগেই অনেক মানুষকে টিকাটি দিতে শুরু করবে দেশটি। তবে কিউবা তাদের টিকা উৎপাদন পুরোপুরি স্থানীয়ভাবে করবে নাকি ইরান, চীন ও থাইল্যান্ডে করবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অর্থনীতিবিদ এমিলি মরিস বলেন, কিউবার টিকাগুলো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সুসংবাদের গল্প। কিন্তু কাস্ত্রোহীন শাসনের অনিশ্চয়তায় থাকা সাধারণ কিউবাবাসীর কাছে শুধু এ সুসংবাদে জীবনযাপন করা সম্ভব নয়। কারণ, দেশটির অর্থনীতি ভঙ্গুর।

দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন