default-image

প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নির্দেশে মার্কিন অনগ্রসর মানুষের জন্য সরকারি খাদ্য সহযোগিতা বাড়ানো হচ্ছে। করোনা মহামারির কারণে আমেরিকার জনগণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক নিরাপত্তার এ খাতে ( যা ফুড স্ট্যাম্প নামে পরিচিত) বরাদ্দ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

করোনা মহামারির প্রকোপ থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও কয়েক কোটি মানুষের পর্যাপ্ত খাদ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত নয় এখনো। কৃষ্ণাঙ্গ, হিস্পানিক ও অভিবাসী গ্রুপগুলোর মধ্যে এ ধরনের নিম্ন ও মধ্য আয়ের পরিবার বেশি। সাম্প্রতিক নাগরিক আন্দোলনের জের ও মহামারির বাস্তবতায়  জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।  

মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউজম্যাক্স তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, কেন্দ্রীয় কৃষি বিভাগ এ নিয়ে কাজ শুরু করেছে। মহামারির জন্য প্রেসিডেন্ট বাইডেনের নাগরিক প্রণোদনা তহবিল থেকে ফুড স্ট্যাম্পের পরিমাণ ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছিল। ক্ষমতা গ্রহণের দুই দিনের মাথায় প্রেসিডেন্ট বাইডেন এ–সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করেছিলেন। বর্ধিত ফুড স্ট্যাম্প দেওয়ার মেয়াদ ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

ফেডারেল সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এখন ফুড স্ট্যাম্প দেওয়ার জন্য মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করছে। ১ অক্টোবর থেকে ফুড স্ট্যাম্প গ্রহীতা ২০ শতাংশ বর্ধিত সাহায্য পেতে পারেন এবং ফুড স্ট্যাম্পের এ বৃদ্ধি স্থায়ী করা হচ্ছে।

মহামারির আগে যুক্তরাষ্ট্রের চারজনের একটি নিম্ন বা মধ্য আয়ের পরিবারের জন্য ফুড স্ট্যাম্পের পরিমাণ ছিল মাসে ৬৮০ ডলার। কোন এলাকায় বসবাস, সদস্যদের বয়স, পরিবারের আয় কত, পরিবারে শিশু বা গর্ভবতী কেউ আছে কি না—এসব মূল্যায়ন করে ফুড স্ট্যাম্প দেওয়া হয়। ফুড স্ট্যাম্পের অনুদান থেকে পরিবারগুলো কোনো বিলাসদ্রব্য নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী কিনতে পারে। লাখ লাখ মার্কিন পরিবার ফুড স্ট্যাম্পের ওপর নির্ভরশীল।

ইউনিভার্সিটি অব কেন্টাকির সেন্টার ফর পভার্টি রিসার্চের পরিচালক জেমস জাইলাইয়াক বলেছেন, নতুন মূল্যায়নের পর চারজনের ফুড স্ট্যাম্প গ্রহীতা মাসে ১৩৬ ডলারের বর্ধিত অনুদান পেতে পারে। কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ফুড স্ট্যাম্প বৃদ্ধির এ পদক্ষেপ নিয়েছেন।

জনগণকে খাদ্য সহযোগিতার অর্থ বরাদ্দ নিয়ে কংগ্রেসে বিরোধ হবে। ফুড স্ট্যাম্প গ্রহীতা লোকজন কর্মবিমুখ হয়ে পড়ে এবং এ কর্মসূচির ওপর লোকজনের নির্ভরশীলতা বেড়ে যায় বলে রক্ষণশীলরা সমালোচনা করে আসছেন আগে থেকেই। ডেমোক্র্যাট দলের অনেক আইন প্রণেতাদের মধ্যেও ফুড স্ট্যাম্প নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেই।

সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময় এ কর্মসূচিটির ব্যাপক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হয়েছিল।

হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের অধ্যাপক জেসন ফারম্যান ওবামা প্রশাসনের সময় উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। উদারনৈতিক অর্থনীতিবিদ জেসন ফারমান বলেছেন, সরকার কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে দরিদ্র জনগণের জন্য এ অর্থপূর্ণ কাজ সত্যিকার অর্থেই প্রশংসিত হতে পারে।

প্রেসিডেন্ট বাইডেন ক্ষমতা গ্রহণের পর ফুড স্ট্যাম্প বৃদ্ধি ছাড়া খাদ্য নিরাপত্তার অন্য একটি ক্ষেত্রেও বিরাট উদ্যোগ নিয়েছেন। গ্রীষ্মের দীর্ঘ অবকাশে স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা যাতে বিনা মূল্যে খাবার গ্রহণ করতে পারে, তার জন্য ব্যয় বাড়ানো হয়েছে এবং কর্মসূচিটি এ গ্রীষ্মকালেই চালু হচ্ছে। আসছে শিক্ষাবর্ষে স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা বিনা মূল্যে খাবার পাবে।

সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শিক্ষার্থীদের জন্য এ খাদ্য সহযোগিতাসহ ফুড স্ট্যাম্পকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলেন নানা শর্ত আরোপ করে। প্রেসিডেন্ট বাইডেন ক্ষমতা গ্রহণের পর ট্রাম্পের অন্যান্য বৈরী নীতির সঙ্গে এটিও পাল্টেছে।

বিজ্ঞাপন

প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তাঁর একাধিক বক্তৃতায় বলেছেন, খাদ্য সহযোগিতার জন্য আমেরিকার বিভিন্ন নগর ও জনপদে মানুষের দীর্ঘ লাইন দেখে তাঁর হৃদয় ভেঙে যায়। আমেরিকার মানুষ খাবার সংগ্রহের জন্য মাইলের পর মাইল দাঁড়াবে—এমন দৃশ্য নিজের চোখে দেখতে হবে, এমন কল্পনাও তিনি কোনো দিন করেননি বলে প্রেসিডেন্ট বাইডেন তাঁর একাধিক বক্তৃতায় বলেছেন।

গত ডিসেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সাতটি পরিবারের মধ্যে একটি জানিয়েছে, তাদের ঘরে পরের সপ্তাহের জন্য পর্যাপ্ত খাবার নেই। জানুয়ারি মাসের তথ্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের ৪ কোটি ১৮ লাখের বেশি লোকজন ফুড স্ট্যাম্প গ্রহণ করছে। আগের বছরের তুলনায় যা ১২ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি।

আমেরিকার সমাজের বৈষম্যের সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তার এ খাতটি আলোচিত হয়ে থাকে। গত বছর কৃষ্ণাঙ্গ যুবক জর্জ ফ্লয়েড পুলিশের হাতে নিহত হলে নাগরিক আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক বৈষম্য, বিদ্বেষ ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তার কথাটি উচ্চারিত হয় নাগরিক আন্দোলনের নেতাদের মুখে মুখে।

কৃষ্ণাঙ্গ, হিস্পানিকসহ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অভিবাসী গ্রুপগুলো সামাজিক ও কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের ফলে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়ছে বলে তাঁরা অভিযোগ করে আসছেন। এ খাতে সরকারের বর্ধিত বরাদ্দের জন্য উদারনৈতিকদের পক্ষ থেকে জোর দাবি জানানো হচ্ছিল।

বর্তমানে চারজনের পরিবারের প্রতিদিনের খাদ্যের জন্য ২২ ডলার করে দেওয়া হয়। এ পরিমাণ অর্থ বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একটি পরিবার ২২ ডলার দিয়ে পর্যাপ্ত খাদ্য ও পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে না। ফলে স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়, কর্মহীনতা বৃদ্ধি পায়। সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য ফুড স্ট্যাম্পের বরাদ্দ বাড়িয়ে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানোর জন্য উদারনৈতিকদের দাবির প্রতি বাইডেন প্রশাসনের পদক্ষেপ এখন অনেকটাই অনুকূলে।

ফেডারেল সরকারের ‘মার্কেট বাস্কেট’ নামের এক কর্মসূচির জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের গড় পরিবার দিনের মাত্র আধা ঘণ্টা সময় ব্যয় করছে তাদের খাদ্য প্রস্তুত করার জন্য। যেখানে মানসম্মত খাদ্য প্রস্তুতের জন্য দিনের দুই ঘণ্টা সময়ের প্রয়োজন। নতুন কর্মসূচিতেও পরিবারের বয়স অনুযায়ী সদস্যসংখ্যার ভিত্তিতে ফুড স্ট্যাম্প দেওয়া হবে। নিম্ন ও মধ্য আয়ের পরিবারের আয়ের ৩০ শতাংশ খাদ্যের পেছনে ব্যয় হবে, এমন ধরে নিয়ে ফুড স্ট্যাম্পের হিসাব করা হবে।

ইউনাইটেড স্টেটস ডিপার্টমেন্ট অব অ্যাগ্রিকালচারের (ইউএসডিএ) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা স্টেসি ডিন বলেছেন, ‘আমরা শুধু খাদ্য সহযোগিতাই দিতে চাই না। জনগণ যাতে খাদ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুষ্টিও পায়, এর নিশ্চয়তা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।’

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন