default-image

ষড়যন্ত্রের দুই হোতা ট্রাম্প ও জুলিয়ানি

ট্রাম্প ও তাঁর আইনজীবী জুলিয়ানির লক্ষ্য ছিল, ভোট গণনায় কারচুপি ও অসংগতির অভিযোগ এনে দু-একটি রাজ্যের ‘নির্বাচকমণ্ডলী’র হিসাব প্রত্যাখ্যান ও বিকল্প ‘নির্বাচকমণ্ডলী’ উপস্থিত করা।

ট্রাম্প প্রথমে ৬ জানুয়ারির অধিবেশনে এই ‘সাহসী’ কাজটুকু করার জন্য মাইক পেন্সের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। একই সঙ্গে তিনি রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত আইন পরিষদের একাধিক জনপ্রতিনিধির ওপর মিথ্যা বিকল্প নির্বাচকমণ্ডলীর তালিকা অনুমোদনের জন্য চাপ দেন। ট্রাম্প ও তাঁর আইনজীবীর ভাবনা ছিল, ভোট অসংগতির যুক্তিতে পেন্স যদি একটি বা দুটি অঙ্গরাজ্যের নির্বাচক তালিকা প্রত্যাখ্যান করেন, তাহলে ৬ জানুয়ারির নির্ধারিত নির্বাচন প্রত্যায়ন বিলম্বিত হবে।

এর ফলে ট্রাম্প নির্ধারিত সময়সীমা পার হলেও ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবেন। এমনকি রাজনৈতিক গোলযোগের অজুহাতে তথাকথিত ‘গণবিদ্রোহ আইন’ ঘোষণারও সুযোগ পাবেন তিনি। ১৮০৭ সালে কংগ্রেসের গৃহীত এ আইন অনুসারে অভ্যন্তরীণ গোলযোগ বা বিদ্রোহ দমনের লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট সামরিক বাহিনী মোতায়েন করার অধিকার রাখেন। অনেকে এ আইনকে সামরিক আইন ঘোষণার সঙ্গে তুলনা করে থাকেন।

মঙ্গলবারের শুনানিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যভাষ্য দেন অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকান স্পিকার রাসেল রাস্টি বাওয়ারস। ট্রাম্প নিজে ফোন করে তাঁকে অনুমোদিত নির্বাচক তালিকার বদলে একটি বিকল্প তালিকা অনুমোদনের জন্য চাপ দেন।

কিন্তু বাওয়ারস ভোটে কারচুপি হয়েছে, সে দাবির পক্ষে প্রমাণ দেখাতে বললে ট্রাম্প বা জুলিয়ানি কেউই কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি। শুনানিতে শাসনতন্ত্রের প্রতি আনুগত্যের কথা উল্লেখ করে বাওয়ারস বলেন, অবৈধ উপায়ে মিথ্যা জয়ের চক্রান্তে তিনি অংশগ্রহণ করতে পারেন না। ‘আপনারা আমাকে এমন কিছু করতে বলছেন, যা শাসনতন্ত্রের নামে আমার গৃহীত শপথের পরিপন্থী। আমি এই কাজ করতে পারি না’—বলেন তিনি।

ট্রাম্প জর্জিয়ার প্রধান নির্বাচনী কর্মকর্তা সেক্রেটারি অব স্টেট ব্র্যাড র‍্যাফেন্সবার্গারকেও টেলিফোন করে তাঁর পক্ষে সরাসরি অতিরিক্ত ১১ হাজার ৭৮০ ভোট ‘খুঁজে আনার’ অনুরোধ জানান। ‘খুঁজে আনা’ মানে মিথ্যা ভোটের ব্যবস্থা করা। বাইডেন যে সংখ্যক ভোট পান, এ সংখ্যা তার চেয়ে একটি বেশি। কোনো কারচুপি হয়নি—এই যুক্তিতে র‍্যাফেন্সবার্গার সে অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। জর্জিয়ায় ভোটে কারচুপি হয়েছে, এমন অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ হিসেবে ট্রাম্প একজন অধস্তন নারী ভোটকর্মী ও তাঁর মায়ের বিরুদ্ধেও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন অভিযোগ আনেন।

তাঁর উসকানিতে বিপুলসংখ্যক ট্রাম্প সমর্থক এ দুই নারীর বাড়িতে হামলা চালান। শুনানিতে নারী কর্মী নিজের অভিজ্ঞতার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে বলেন, নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেশের প্রেসিডেন্ট ও তাঁর সমর্থকদের হামলার শিকার হতে হবে—এ ছিল তাঁর দুঃস্বপ্নেরও বাইরে। তিনি বলেন, ‘এই ঘটনায় আমাদের জীবন পুরোপুরি ওলটপালট হয়ে গেছে।’

ইতিপূর্বে অনুষ্ঠিত আরেকটি উন্মুক্ত শুনানিতে তদন্ত কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ট্রাম্প নির্বাচনে পরাস্ত হয়েছেন—এ কথা তাঁর অধিকাংশ আইনি পরামর্শদাতা ও নিকটাত্মীয় তাঁকে বুঝিয়ে বলা সত্ত্বেও তিনি ভোটে কারচুপির অভিযোগ তুলে নিজ সমর্থকদের কাছ থেকে প্রায় আড়াই শ মিলিয়ন (২৫ কোটি) ডলার চাঁদা সংগ্রহ করেন।

কারচুপির বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে এই অর্থ ব্যয় করা হবে বলা হলেও আদৌ কোনো আইনি তহবিল গঠিত হয়নি বা আইনি লড়াইয়ের কাজে এ অর্থ ব্যয় হয়নি। কমিটির একজন সদস্যের কথায়, ‘পুরো ব্যাপারটাই ছিল মিথ্যা কথা বলে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের সঙ্গে পরিকল্পিত প্রতারণা।’

ট্রাম্পের বিচার

৬ জানুয়ারির ঘটনার কেন্দ্রে ট্রাম্প—এ কথা বিপুল তথ্যপ্রমাণসহ প্রমাণিত হলেও তিনি সত্যি সত্যি আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত হবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পর্যন্ত উপস্থিত প্রমাণের ভিত্তিতে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সরকারি কার্যক্রমে বাধাদান ও যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতারিত করার অভিযোগ অবশ্যই উত্থাপন করা যায়। কিন্তু তা করা হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া শুরুর কোনো অধিকার এই কমিটির নেই।

তবে কমিটি আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে তাদের অনুমোদনের বিষয়টি পাঠাতে পারে। এই অনুমোদন ছাড়াও চলতি শুনানির ভিত্তিতে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করার এখতিয়ার আছে একমাত্র মার্কিন বিচার বিভাগের। অ্যাটর্নি জেনারেল মেরিক গারল্যান্ড সেই এখতিয়ারের প্রয়োগ করবেন, নাকি করবেন না—তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তিনি শুধু বলেছেন, শুনানিটি তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা আগ্রহের সঙ্গে অনুসরণ করছেন। অবশ্য তিনি এ কথাও বলেছেন, অপরাধ হয়ে থাকলে বিচারকার্য পরিচালনায় তাঁর দপ্তর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

সত্যি সত্যি ট্রাম্প দোষী কি না, তা প্রমাণের জন্য বিচার বিভাগকে এ কথা নিঃসংশয়ে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি জেনেশুনে অর্থাৎ সজ্ঞানে এ ষড়যন্ত্রে অংশ নিয়েছেন। অন্য কথায়, ভোট চুরির মিথ্যা কথনের পেছনে তাঁর ইন্টেন্ট বা অভিপ্রায় প্রমাণ করতে হবে। সেই কথা মাথায় রেখেই এই কমিটি ৬ জানুয়ারির দাঙ্গা ও বিদ্রোহে ট্রাম্পের কেন্দ্রীয় ভূমিকা প্রমাণে ব্যস্ত রয়েছে।

কিন্তু এ পর্যন্ত এমন কোনো ‘রুপালি টোটা’ (অকাট্য প্রমাণ) মেলেনি, যা থেকে বলা যায় ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে ক্যাপিটল ভবন আক্রমণে নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ অবস্থায় তিনি ৬ জানুয়ারির ভাষণে উপস্থিত সমর্থকদের ‘শান্তিপূর্ণভাবে’ ক্যাপিটল হিলে বিক্ষোভের আহ্বান জানিয়েছিলেন, এ কথা দাবি করতেই পারেন। একইভাবে, মিথ্যা নির্বাচক সংগ্রহে অঙ্গরাজ্যের কর্মকর্তাদের চাপ দিয়েছেন সে কথা প্রমাণিত হলেও ট্রাম্প পাল্টা দাবি করতে পারেন, তিনি প্রকৃতই বিশ্বাস করেন যে নির্বাচনে তিনি জয়ী হয়েছেন। চাপ নয়, শুধু সেই কথাটাই তিনি সেসব কর্মকর্তাকে বলেছেন।

হুমকির মুখে গণতন্ত্র

আপাতত আইনি লড়াইয়ের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে গণতন্ত্রের প্রতি মার্কিন জনগণের আস্থা উদ্ধার করা। ৬ জানুয়ারির ঘটনা ছিল গণতন্ত্রের ওপর সরাসরি হামলা। সেই হুমকি এখনো উবে যায়নি, মার্কিন গণতন্ত্রের জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো এক অব্যাহত হুমকি। তিনি এখন পর্যন্ত নিজের হার স্বীকার করেননি অথবা বাইডেনকে বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেনে নেননি। তাঁর এক বিপুলসংখ্যক সমর্থক সেই কথায় বিশ্বাস করেন এবং তাঁরা ট্রাম্পের নির্দেশে সহিংস হামলায় জড়িয়ে পড়তে প্রস্তুতও। আইনভঙ্গের জন্য যতই অভিযুক্ত করা হোক, ট্রাম্প–সমর্থকদের অধিকাংশ এখনো তাঁর প্রতি অনুগত।

সমর্থকদের মতোই রিপাবলিকান দলের ওপরও ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ প্রায় নিরঙ্কুশ। এ বছর নভেম্বরে যে মধ্যবর্তী নির্বাচন হবে, তার অধিকাংশ রিপাবলিকান প্রার্থী ট্রাম্পের অনুমোদন নিয়েই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামছেন। তাঁর প্রচার করা মিথ্যা অভিযোগের প্রতি সমর্থন জানালেই ট্রাম্প রিপাবলিকান প্রার্থীদের প্রতি নিজের অনুমোদন দিচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই নির্বাচনী পরিচালক হিসেবে সেক্রেটারি অব স্টেট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অন্য কথায়, তাঁরাই ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবেন।

অধিকাংশ পর্যবেক্ষকের ধারণা, ট্রাম্প আগামী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। ওই নির্বাচনের ফলাফলও মনঃপূত না হলে এসব নির্বাচনী কর্মকর্তা তা (ফলাফল) প্রত্যায়নে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন অথবা সব নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ট্রাম্পকেই বিজয়ী ঘোষণা করতে পারেন। এমন ঘটনা ঘটলে মার্কিন গণতন্ত্র এক অভাবিত সংকটে নিক্ষিপ্ত হবে।

শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিচারের সম্মুখীন হবেন না। রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ও সম্ভাব্য সহিংসতা এড়াতে বিচার বিভাগ হয়তো সেই সিদ্ধান্তই নেবে। মার্কিন গণতন্ত্রের জন্য সেটা হবে গভীর দুঃখের ঘটনা। তবে ৬ জানুয়ারির ঘটনায় শুনানির ফলে রিপাবলিকান সমর্থকদের একাংশের মধ্যেও যদি ট্রাম্পের মিথ্যাচারের প্রতি অনাস্থা সৃষ্টি হয়, তাহলে এ কমিটি তার দায়িত্ব পালন করেছে—এ কথা বলা হয়তো অত্যুক্তি হবে না।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন