default-image

যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাসের প্রকোপ আবার ভয়াবহভাবে বাড়ছে। অথচ এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়েও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রশাসনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভবিষ্যৎ জো বাইডেন প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টাদের কাছে কোনো তথ্য সরবরাহের উদ্যোগ নিচ্ছেন না। তিনি নির্বাচনকে বিতর্কিত করতেই এখনো ব্যস্ত। অথচ এই সময়ে বিশেষত স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট তথ্য বিনিময় করে ভবিষ্যৎ প্রশাসনকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত করাটা ভীষণভাবে জরুরি। তা না হলে শুধু ব্যবস্থাপনা সংকটের কারণেই বড় মাশুল গুনতে হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রকে।

বিশ্বের যেকোনো সংস্থার হিসাবেই রোগী শনাক্ত ও মৃতের সংখ্যার দিক দিয়ে এই মুহূর্তে করোনায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ যুক্তরাষ্ট্র। এরই মধ্যে দেশটিতে করোনাভাইরাসে মৃত্যু আড়াই লাখ ছাড়িয়েছে। ১৮ নভেম্বর বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, করোনাভাইরাসে মৃত্যু আড়াই লাখ ছাড়ায়।

বিজ্ঞাপন

জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সবশেষ তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রে করোনায় মৃতের সংখ্যা ২ লাখ ৫০ হাজার ৪৮৫। আর করোনায় সংক্রমিত শনাক্ত মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ১৫ লাখ ২৫ হাজার ৫৪০। যুক্তরাষ্ট্রে করোনায় দৈনিক নতুন সংক্রমণের সংখ্যা আগেই লাখ ছাড়িয়েছিল। এখন দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা দেড় হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

এ পরিস্থিতিকে খুবই বিপজ্জনক বলে আখ্যা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ অ্যান্থনি ফাউসি। তাঁর মতে, এমন নাজুক পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রশাসন ভুল পথে চলছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, নতুন করে সংক্রমণ বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

কিন্তু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে সবার চাপের মুখেও এ নিয়ে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না ট্রাম্প প্রশাসন। উপরন্তু করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের ঘোষণা আসার পর ১৩ নভেম্বর সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেছেন, নিউইয়র্কে শুরুতেই ভ্যাকসিন পাঠাবেন না তিনি। এ ধরনের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি ভ্যাকসিন নিয়েও একটা বিভাজনের খেলা শুরু করেছেন। এ অবস্থায় স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে উদ্ভূত করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরবর্তী প্রশাসনকে প্রস্তুতে উদ্যোগ নিতে প্রেসিডেন্টের ওপর তাঁর প্রশাসনের ভেতর থেকেই চাপ বাড়ছে।

কিন্তু এসব চাপকে উপেক্ষা করে ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠরা ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতেই নিজেদের যাবতীয় শক্তি কাজে লাগাচ্ছে। শুধু তাই নয়, ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরুর পক্ষে যতজন কথা বলছেন, তাঁদের সবার সঙ্গেই প্রতিশোধপরায়ণ আচরণ করছেন তিনি। মতের অমিল হওয়ায় এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছেন তিনি। এমন বাস্তবতায় ক্ষমতা হস্তান্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা জেনারেল সার্ভিসেস অ্যাডমিনিস্ট্রেটর (জিএসএ) এমিলি মারফির ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প পরাজয় স্বীকার না করায় এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখোমুখি এখন তিনি। এক পক্ষ থেকে পরাজয় স্বীকার না করা এবং অন্যদিকে নির্বাচনের ফল অন্য সব পক্ষ মেনে নেওয়া ও নির্বাচনের ফল সরকারিভাবে প্রকাশের চাপ থাকায় এক ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকটের মুখে এখন এই কর্মকর্তা। তিনি যে পদক্ষেপই নিন না কেন, একটি পক্ষ তাঁর ওপর রুষ্ট হবেই।

নির্বাচনে জো বাইডেন জয়ী হয়েছেন নিশ্চিতভাবেই। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠরা এই ফল মেনে নেয়নি। এমনকি ভোট জালিয়াতির ভুয়া অভিযোগ তুলে একের পর এক মামলা করেছে তারা। বিশেষত ব্যাটলগ্রাউন্ড নামে পরিচিত সুইং স্টেটগুলোর প্রতিটিতেই তারা মামলা করেছে। এর কোনো মামলাই প্রমাণের অভাবে টেকেনি। কোনোটি আদালত গ্রহণই করেননি। কোনোটি আবার শুনানির পর খারিজ করে দিয়েছেন। একের পর এক মামলা খারিজ হলেও ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠরা নিবৃত্ত হননি। এমনকি ট্রাম্প সমর্থক হিসেবে পরিচিত সংবাদমাধ্যমগুলো বিভিন্ন টক-শো ও ভুয়া সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে ট্রাম্পের জয়ের আশা সমর্থকদের মধ্যে এখনো জিইয়ে রেখেছে।

নির্বাচনের পর দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের এই পরাজয় মানতে না চাওয়ার দায় ঘোচাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান করোনা ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে চুপ করে বসে থাকার কোনো জো নেই। অথচ ট্রাম্প প্রশাসন না নিজে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে, না ভবিষ্যৎ বাইডেন প্রশাসনকে এ বিষয়ে প্রস্তুত হওয়ার কোনো সুযোগ দিচ্ছে। এতে এক বড় শূন্যতার সৃষ্টি হচ্ছে। এই শূন্যতার দায় শোধ করতে গিয়ে ঠিক কত লোককে মরতে হবে, তা নিশ্চিত নয়। কিন্তু সংখ্যাটি কম হবে না বলেই মনে করেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

ভীষণ শঙ্কার এই সময়ে একমাত্র আশার আলো দেখাচ্ছে ভ্যাকসিন। আজ সোমবার মডার্নার তৈরি করোনা ভ্যাকসিনের উচ্চ কার্যকারিতা ঘোষণা এসেছে। এক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয় এই ভ্যাকসিনের ঘোষণা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। কিন্তু সব পর্যায়ে এই ভ্যাকসিন পৌঁছাতে সময় লাগবে। ড. অ্যান্থনি ফাউসি সম্প্রতি সিএনএনের ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ অনুষ্ঠানে বলেন, আগামী ২০ জানুয়ারি যারা ক্ষমতায় আসছে, সেই বাইডেন ও তাঁর দলের সঙ্গে এ নিয়ে কাজ শুরু করতে পারলে ভালো হতো। তিনি বলেন, ‘একটা দৌড়ে ব্যাটন হস্তান্তরের মতো একটি বিষয় এটি। আপনি না থেমেই পরেরজনের হাতে ব্যাটনটি দিয়ে যেতে হবে, যাতে সব চলমান থাকে। আপনাকে ছুটে চলতে হবে। আর এটাই হস্তান্তর।’

অথচ এই হস্তান্তরের কিছুই শুরু হয়নি। এ বিষয়ে ভবিষ্যৎ বাইডেন প্রশাসনের সম্ভাব্য হোয়াইট হাউস চিফ অব স্টাফ রন ক্লেইন রোববার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, মহামারি বিষয়ে ড. ফাউসির মতো বর্তমান শীর্ষ স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টের এ সম্পর্কিত দল কোনো যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেনি এখনো। ডোনাল্ড ট্রাম্প বাইডেনের জয় স্বীকার না করায় নতুন প্রশাসনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু না হওয়ায় এটা সম্ভব হয়নি। একটি চলমান সংকটের মধ্যেই জো বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। ফলে এটি নিরবচ্ছিন্ন হওয়া উচিত।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু জিএসএ এমিলি মারফি এখনো সরকারিভাবে ফল ঘোষণা না করায় ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু করতে পারছেন না। এর কারণ ট্রাম্প প্রশাসন। এ বিষয়ে মারফির সঙ্গে হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ রয়েছে কিনা, সে বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সূত্র সিএনএনকে বলেছে, ‘তিনি খুবই কঠিন পরিস্থিতিতে রয়েছেন। অনেকগুলো বিষয় নিয়ে তিনি ভীত। ভয়াবহ এক পরিস্থিতি এটা। তিনি নৈতিকভাবে খুবই শক্তিশালী এক ব্যক্তি। একই সঙ্গে তিনি ভীষণ সতর্ক। কারণ, তাঁকে এমন এক পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে, যেখানে কেউই তাঁর পক্ষে নেই। আর এ সম্পর্কিত আইনও বেশ অস্পষ্ট।’

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশাসনকে খুবই সতর্ক ও সক্রিয় হতে হতো। কিন্তু দুঃখের বিষয়, পুরো প্রশাসন এই কঠিন সময়ে এসেই সবচেয়ে বেশি থমকে আছে। এমনকি ভ্যাকসিন আবিষ্কারের যে সুসংবাদ দুটি এসেছে, তাকেও কাজে লাগানোর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। আর এই ভয়াবহ পরিস্থিতিটি তৈরি হয়েছে মাত্র একজন লোকের কারণে। তিনি নিজের পরাজয় কোনোভাবেই মানতে পারছেন না। এটুকুতে থামলে বিষয়টিকে নিরীহ গোঁ বলা যেতে পারত। কিন্তু বিষয়টি এখন এমন জায়গায় যাচ্ছে, তিনি সম্ভবত ভবিষ্যৎ বাইডেন-কমলা প্রশাসনকে বিপদে ফেলতে চাইছেন। ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে হঠাৎ করে সেনা প্রত্যাহারের আদেশ দেওয়া, সোমালিয়া থেকে সেনা প্রত্যাহার, ইরানে হামলা করা যায় কিনা, তার জন্য পরামর্শ করা এবং করোনা ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের মতো বিষয়ে একেবারে নিষ্ক্রিয় থাকা অন্তত তাই বলে। এসব পদক্ষেপ ও নিষ্ক্রিয়তার কারণে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হতে হবে মার্কিন জনগণকে। ট্রাম্প এগুলোর কিছু নিয়েই চিন্তিত নন। তিনি অজস্র মানুষকে ঝুঁকিতে ফেলে হলেও নিজের ব্যক্তিগত প্রতিশোধটি নিতে চান। কিন্তু এ প্রতিশোধ যতটা না বাইডেনের, তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি করছে জনগণের।

মন্তব্য পড়ুন 0