default-image

করোনাভাইরাস, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যায় পড়া যুক্তরাষ্ট্রবাসী এক নেতৃত্বহীন সময় অতিবাহিত করছেন। দেশটিতে করোনার সংক্রমণে প্রতিদিন গড়ে দেড় হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। সংক্রমণ শনাক্ত হচ্ছে দেড় লাখের বেশি মানুষের। হাসপাতালগুলো ভরে উঠছে। অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনে বেড়ে গেছে। মানুষের চোখেমুখে উৎকণ্ঠা।

১০ মাস ধরে আমেরিকার অর্থনীতি কার্যত অচল। কর্মহীন লোকজনের হাহাকার চলছে। জনগণের এ কঠিন সময়ে দেশের ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট গলফ খেলছেন। নির্বাচনে নিজের হেরে যাওয়ার ভুয়া দাবি ছাড়া প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দৃশ্যত কোনো কাজে নেই। হোয়াইট হাউসের ওয়েস্ট উইং কর্মহীন। নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ক্ষমতা গ্রহণের প্রস্তুতি গ্রহণ করলেও শপথ নেওয়ার আগে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব বাস্তবায়নের তাঁর তেমন কোনো সুযোগ নেই। নির্বাচনপরবর্তী বাস্তবতার হিসাবে মিলাতে ব্যস্ত বিভক্ত কংগ্রেসও। এতে জনগণের মধ্যে উৎকণ্ঠা বাড়ছে।

বিজ্ঞাপন

গত মার্চ মাস থেকে আমেরিকায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস শীত আগমনের সঙ্গে সঙ্গে নতুনরূপে আবির্ভাব হয়েছে। নগরকেন্দ্র থেকে এবারের সংক্রমণ প্রান্তিক জনপদে ছড়িয়ে পড়েছে। ১০ মাসের মাথায় আমেরিকার লোকজন বছরের শেষ প্রান্তে এসে উৎসবের মৌসুমে পৌঁছেছে। গত সপ্তাহে থ্যাংকস গিভিং দিয়ে শুরু হওয়া এ উৎসব চলবে নতুন বছর পর্যন্ত। স্বাস্থ্যসেবীরা আগে থেকেই সতর্ক করে দিচ্ছিলেন। আশঙ্কাকে সত্য প্রমাণ করে বিপদ এখন দোরগোড়ায়। প্রতিটি হাসপাতাল ভরে উঠছে। নিউইয়র্কের মতো নগরীর হাসপাতালগুলোয় বেডের সংখ্যা বৃদ্ধি করার নির্দেশনা দিয়েছেন রাজ্য গভর্নর।

যুক্তরাষ্ট্রে এখন প্রতিদিন গড়ে এক লাখ ৬২ হাজারের বেশি মানুষের সংক্রমণ শনাক্ত হচ্ছে। প্রকৃত সংক্রমণের সংখ্যা আরও বেশি হবে বলে মনে করা হচ্ছে। গত এক সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৪৩০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। গত রোববার এক দিনে ৯৩ হাজারের বেশি মানুষ কোভিড-১৯ সংক্রমণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ পরিস্থিতিকে নাজুক মনে করছেন স্বাস্থ্যসেবীরা। আসছে কয়েক সপ্তাহ আরও নাজুক হতে পারে আমেরিকার করোনা পরিস্থিতি—এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে। চরম এ সংকটের সময় রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনো নির্দেশনা নেই। হোয়াইট হাউসের করোনা টাস্কফোর্সকে নিয়ে সংবাদ ব্রিফিং নেই। দেশের মানুষ নিজেকে রক্ষা করার জন্যও কোনো কেন্দ্রীভূত নির্দেশনা পাচ্ছে না সংকটের এ সময়ে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর পরাজয় মেনে না দেওয়ার ভূমিকায় অনড়–অটল অবস্থানে রয়েছেন। ওয়াশিংটন ডিসির পাশের রাজ্য ভার্জিনিয়ায় নিজের গলফ ক্লাবে গিয়ে গলফ খেলছেন আর টুইটার ও ফেসবুকে বার্তা দিচ্ছেন। নির্বাচনে ভোট জালিয়াতি হয়েছে বলে ভুয়া দাবি করছেন প্রতিদিন। আমেরিকার জনগণ তাঁদের এ দুঃসময়ে ট্রাম্পের এমন দাবির প্রতি বিকারহীন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত তিন সপ্তাহে আর কোনো রাষ্ট্রীয় কাজ করেননি। শুধু একদফা সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, টিকা চলে আসছে। টিকার জন্য তাঁর নিজের কৃতিত্বের কথা বলছেন।

বিজ্ঞাপন

করোনা টাস্কফোর্সের অন্যতম সদস্য অ্যান্থনি ফাউসি বলেছেন, টিকা ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে এলেও আমেরিকার লোকজনের সামনে দীর্ঘ শীতকাল। টিকা সর্বত্র পৌঁছানোর পর ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে টিকা দিতে শীতকাল চলে যাবে। এ সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে।

গত মার্চ মাসে পুরো আমেরিকা লকডাউনে চলে যাওয়ার পর অধিকাংশ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েন। কর্মহীন মানুষের মধ্যে অর্ধেকের বেশি কাজে ফিরে যেতে পারেননি। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে পড়েছে। নাগরিক প্রণোদনা ও বেকার ভাতা দিয়ে শুরুতে সামাল দেওয়া হয়েছিল। লোকজনের বেকার ভাতার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। করোনা পরিস্থিতির জন্য আরেক দফা অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে হোয়াইট হাউস, কংগ্রেস এবং সিনেট বারবার কথা বললেও কিছুই করা হয়নি।

নির্বাচনের পর হোয়াইট হাউস যেমন অচল, তেমনি অচল ভূমিকা কংগ্রেসের। নির্বাচনে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাট পার্টি কয়েকটি আসন হারালেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রেখেছে; যদিও কংগ্রেস সদস্যদের মন ভালো নেই। সিনেটে জর্জিয়ার দুই প্রার্থীর নির্বাচন ঝুলে আছে। জর্জিয়ার রিপাবলিকান দুই প্রার্থীকে হারাতে পারলে সিনেটে ডেমোক্র্যাট পার্টি ভারসাম্য পাবে। ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের ভোটের মাধ্যমে ডেমোক্র্যাট পার্টি নিজেদের উদ্যোগগুলো সফল করতে পারবে। এমন আশার মধ্যে কংগ্রেস সদস্যরা নির্বাচনপরবর্তী সময়ের অধিবেশনের জন্য এ সপ্তাহে ওয়াশিংটনে ফিরছেন। তাঁদের জরুরি কার্যতালিকায় নাগরিক প্রণোদনার বিষয় নেই। ১১ ডিসেম্বরের মধ্যে ফেডারেল ব্যয় নির্বাহ বাজেট তাঁদের পাস করতে হবে।

নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আগামী ২০ জানুয়ারি ক্ষমতা গ্রহণ করবেন। এর মধ্যে তিনি তাঁর প্রশাসনে লোক মনোনয়ন দিচ্ছেন। ক্ষমতা গ্রহণ করার আগে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট দেশের উদ্বিগ্ন জনগণকে মাস্ক পরার আর সামাজিক ব্যবধান মেনে চলার আহ্বান ছাড়া তেমন কিছুই করতে পারছেন না। যদিও নিজের প্রশাসনের জন্য কোভিড-১৯ টাস্কফোর্স গ্রহণ করেছেন। ক্ষমতা গ্রহণের পর কীভাবে আমেরিকার মানুষের চরম এ সংকট সামাল দেওয়ার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়বেন, এ নিয়ে সলাপরামর্শ করছেন। দেশের মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যার জন্য কংগ্রেস ও হোয়াইট হাউসকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জো বাইডেন। যদিও তাঁর এমন আহ্বানে কোথাও কেউ নড়েচড়ে বসার লক্ষণ নেই।

বিজ্ঞাপন

চলমান অসহনীয় বাস্তবতায় মার্কিন সার্জন জেনারেল জেরোম অ্যাডামস বলেছেন, ‘আমি আমেরিকার সব জনগণকে সরাসরি বলতে চাই, আসছে কয়েকটি সপ্তাহ পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। তিনি নাগরিকদের নিজেদের রক্ষা করার জন্য আহ্বান জানান। নাগরিকেরা নিজেরা সতর্ক থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার কথা বলেছেন জেরোম অ্যাডামস।

করোনাভাইরাসে যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর রাজ্য নিউইয়র্কের গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমো গতকাল সোমবার রাজ্যের সব হাসপাতালকে অতিরিক্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। রাজ্যের করোনা পরিস্থিতি ক্রমে আরও নাজুক হতে থাকলে নতুন করে বিধিনিষেধ জারি করার আভাস দিয়েছেন তিনি। পুরো রাজ্যে লকডাউন না দিয়ে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়া এলাকায় বা ওই এলাকা থেকে অন্যত্র চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে। ক্যালিফোর্নিয়াসহ অন্যান্য রাজ্যে এর মধ্যেই এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

মন্তব্য করুন