default-image

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সর্বশেষ বিতর্কে মুখোমুখি হয়েছিলেন গত বৃহস্পতিবার। এ বিতর্কে বাইডেন মুখ ফসকে বলে ফেলেছেন, নির্বাচিত হলে তাঁর প্রশাসন ক্রমান্বয়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার থেকে সৌরশক্তি ও বাতাসের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারের দিকে মনোযোগ দেবে। এটা নতুন কোনো প্রস্তাব নয়। বাইডেন অনেক দিন থেকেই ‘সবুজ অর্থনীতি’র অংশ হিসেবে তেল-গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে আনার প্রস্তাব করছেন। ২০৫০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি কার্বনমুক্ত হবে—এটি তাঁর পরিকল্পনার অংশ।

কাগজে-কলমে এই প্রস্তাব করলেও বাইডেন বা তাঁর রানিং মেট কমলা হ্যারিস ঠিক এ মুহূর্তে পেনসিলভানিয়া, টেক্সাস বা ওহাইওর ভোটারদের এই পরিকল্পনা মনে করিয়ে দিতে আগ্রহী নন। এই অঙ্গরাজ্যগুলোয় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ জ্বালানি শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। ২০১৬ সালের নির্বাচনে পেনসিলভানিয়া মাত্র ৪৪ হাজার ভোটে হেরেছিলেন তৎকালীন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন। জনসমর্থনের দিক থেকে বাইডেন এবার এই অঙ্গরাজ্যে ট্রাম্পের চেয়ে ৭ পয়েন্টে এগিয়ে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, জ্বালানিশিল্পের ব্যাপারে তাঁর ‘সমালোচনাপূর্ণ’ অবস্থান এ সময়ে এখানকার ভোটারদের একাংশের মধ্যে বিরূপ মনোভাবের সৃষ্টি করতে পারে।

বিজ্ঞাপন

বিতর্কের সময় ভুল করে বসেছেন—এ কথা বাইডেন প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পেরেছিলেন। বিতর্কের পরপরই তাই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি জোর দিয়ে বলেন, তাঁর প্রশাসন তেল-গ্যাসের ব্যবহার বন্ধ করবে না। তিনি শুধু এই খাতে ভর্তুকি বন্ধের কথাই বলেছেন। বাইডেন বলেন, ‘না, না, আরও অনেক দিন তেল-গ্যাসের ব্যবহার থাকবে।’ এর আগে বাইডেন পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ফ্রাকিং নামে পরিচিত তেল-গ্যাস আহরণপ্রক্রিয়া বন্ধের কথা বলেছিলেন। বিতর্কে সে প্রসঙ্গ তুলে ট্রাম্প তাঁকে আক্রমণ করলে বাইডেন জোর দিয়ে বলেন, তিনি ফ্র্যাকিংয়ের বিরুদ্ধে নন। তিনি শুধু কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রাণাধীন এলাকায় ফ্রাকিংয়ের বিরোধী।

জ্বালানি প্রশ্নে বাইডেনের অবস্থানের দুর্বলতা টের পেয়ে ট্রাম্প শিবির গত শুক্রবার সারা দিন তেল-গ্যাস নিয়ে প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছে। ভোটারদের মনে ভয় সৃষ্টিই তাদের লক্ষ্য। রিপাবলিকান জাতীয় কমিটির প্রধান স্টিভ গেস্ট এক বিবৃতিতে বলেছেন, বাইডেনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে জ্বালানি খাতের প্রায় ২ কোটি মানুষের রুটি–রুজি হুমকিতে পড়বে। বাইডেন এখন যেভাবেই নিজের কথার ব্যাখ্যা দিন না কেন, তাঁর এই ভুল শোধরানো যাবে না।

বিতর্কে বাইডেনের ওই মন্তব্যে ঠিক কতটা ক্ষতি হলো, তা এখনো স্পষ্ট নয়। পেনসিলভানিয়ার ডেমোক্রেটিক পার্টি অবশ্য এ নিয়ে তেমন উদ্বিগ্ন নয়। এই অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাটদলীয় লেফটেন্যান্ট গভর্নর জন ফেটারম্যান বলেছেন, এই প্রশ্নে যার যার অবস্থান অনেক আগে থেকেই স্থির হয়ে আছে। বাইডেন কী বললেন, তাতে অবস্থার কোনোই পরিবর্তন হবে না।

আগাম ভোটে এগিয়ে ডেমোক্র্যাটরা

দ্বিতীয় বিতর্কের প্রতিক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা যতটা উদ্বিগ্ন, দেশের ভোটাররা ততটা নন—এমন কথাই বলেছেন জনমত জরিপকারীরা। ইতিমধ্যে ৫ কোটির বেশি মানুষ আগাম ভোট দিয়ে ফেলেছেন, যাঁদের অধিকাংশই ডেমোক্র্যাট সমর্থক। অবশ্য শেষ পর্যন্ত কারা বেশি সংখ্যায় ভোট দেবেন, এই হিসাব এখন করা কঠিন। উভয় পক্ষই স্বীকার করছে, শেষ মুহূর্তে ভোটার তালিকাভুক্তির ব্যাপারে রিপাবলিকানরা এগিয়ে। তাদের মধ্যে ট্রাম্পের ব্যাপারে উৎসাহও তুলনামূলকভাবে বেশি। আফ্রিকান-আমেরিকান ও হিস্পানিক ভোটারদের মধ্যে বাইডেনের ব্যাপারে অনাগ্রহ চোখে পড়ার মতো।

এই সংকট এড়াতে ডেমোক্রেটিক পার্টি তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে মোক্ষম জায়গামতো ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগের নিয়মকানুন ভেঙে ওবামা এই প্রথম সরাসরি বাইডেনের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছেন। আফ্রিকান-আমেরিকানদের কাছে ওবামার জনপ্রিয়তা এখনো আকাশচুম্বী। তাঁর আহ্বান অশ্বেতকায় ভোটারদের সজাগ করবে, দলের নেতারা সে আশা করছেন।

আগাম ভোটে সুবিধাজনক অবস্থান ডেমোক্র্যাটদের আশান্বিত করেছে। পেনসিলভানিয়ায় রিপাবলিকানদের তুলনায় আগাম ভোট দিয়েছে এমন ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যা ৪৬ শতাংশের বেশি। উইসকনসিন ও মিশিগানেও তারা রিপাবলিকানদের চেয়ে ২০ শতাংশের বেশি ভোট দিয়েছে। রিপাবলিকান পার্টির নির্বাচনী বিশেষজ্ঞ ক্রিস উইলসন মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকো–কে বলেছেন, আগাম ভোটের চলতি ব্যবধান তাঁর দলের জন্য অশনিসংকেত। তিনি বলেন, ‘এখন পিছিয়ে থাকা মানে ভোটের দিন আমাদের দ্বিগুণ সংখ্যায় ভোট দিতে হবে, যা মোটেই সহজ ব্যাপার নয়।’

এদিকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল শনিবার ফ্লোরিডার অঙ্গরাজ্যের ওয়েস্ট পাম বিচের একটি নির্বাচনকেন্দ্রে আগাম ভোট দিয়েছেন। গত বছর তিনি নিউইয়র্ক থেকে তাঁর স্থায়ী ঠিকানা ফ্লোরিডায় স্থানান্তর করেন। ভোট দেওয়ার পর স্মিত হেসে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি ট্রাম্প নামের এক ব্যক্তিকে ভোট দিয়েছি।’ ভোট দেওয়ার সময় তাঁর মুখে মাস্ক ছিল।

বিজ্ঞাপন

তহবিল সংগ্রহে এগিয়ে বাইডেন

শুধু আগাম ভোটেই নয়, তহবিল সংগ্রহেও এগিয়ে ডেমোক্র্যাটরা। রিপাবলিকানদের তুলনায় তাদের তহবিলের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ। নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতে ট্রাম্পের মোট প্রচার তহবিল প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ছিল, এখন তা ১০০ মিলিয়নেরও কম। ওয়াশিংটন পোস্ট–এর হিসাব অনুযায়ী, ট্রাম্পের তুলনায় বাইডেনের হাতে ১১৮ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ জমা আছে। তহবিলে টান পড়ায় ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচার শিবিরকে কয়েকটি নির্বাচনী এলাকায় বিজ্ঞাপন প্রচার হয় বাদ দিতে হয়েছে, নতুবা কমিয়ে আনতে হয়েছে। টিভি বিজ্ঞাপন থেকে ট্রাম্পের অনুপস্থিতি শুধু তাঁর নিজের জন্য নয়, কংগ্রেসে পুনর্নির্বাচনে লড়ছেন এমন রিপাবলিকানদের জন্যও খারাপ সংবাদ।

শেষ অস্ত্র অ্যামি কোনি ব্যারেট

জনমতে পিছিয়ে থাকা ট্রাম্প তাঁর ভাগ্য পরিবর্তনে দুটি সম্ভাব্য অস্ত্র ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছিলেন—অর্থনৈতিক দুরবস্থা কাটাতে একটি নতুন প্রণোদনা বরাদ্দ এবং একজন রক্ষণশীল বিচারপতিকে সুপ্রিম কোর্টে নিয়োগ। প্রণোদনা প্রশ্নে হোয়াইট হাউস ও মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির মধ্যে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে। তবে সিনেটে রিপাবলিকান নেতৃত্ব বড় ধরনের কোনো প্রণোদনা বরাদ্দের ব্যাপারে আপত্তি করেছে। এ অবস্থায় নির্বাচনের আগে এই বরাদ্দ গৃহীত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় অস্ত্র, রক্ষণশীল অ্যামি কোনি ব্যারেটের সুপ্রিম কোর্টে নিয়োগ, যা প্রায় নিশ্চিত।

সিনেটের রিপাবলিকান নেতা মিচ ম্যাককনেল জানিয়েছেন, ব্যারেটের নিয়োগ প্রশ্নে শনিবার ও রোববার সিনেটে বিতর্ক শেষে সোমবার চূড়ান্ত ভোট হবে। কংগ্রেসের এই উচ্চকক্ষে রিপাবলিকানদের ৫৩-৪৭ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় অ্যামি কোনির নিয়োগ প্রায় চূড়ান্ত বলেই ধরে নেওয়া যায়। মাত্র দুজন রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স ও লিসা মুরকাউস্কি জানিয়েছেন, তাঁরা এই নিয়োগের বিরোধিতা করবেন। কিন্তু তাতে ভোটের ফলাফলে কোনো হেরফের হবে না বলেই মনে করা হচ্ছে।

ট্রাম্প আশা করছেন, অ্যামি কোনি ব্যারেটের সুপ্রিম কোর্টে নিয়োগ চূড়ান্ত হলে তা শ্বেতকায় রক্ষণশীল ভোটারদের মধ্যে তুমুল আগ্রহের সৃষ্টি করবে। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর ইভানজেলিক্যাল সমর্থন-ভিতে চিড় ধরেছে। ফ্লোরিডা ও পেনসিলভানিয়ার শ্বেতকায় ইভানজেলিক্যালদের বাদ দিয়ে তাঁর পক্ষে এই দুই রাজ্যে জয় অসম্ভব। সে কারণে ভাগ্য পরিবর্তনে তিনি এই নতুন রক্ষণশীল বিচারকের দ্বারস্থ হয়েছেন।

বিচারপতি ব্যারেট আরও একভাবে ট্রাম্পকে সাহায্য করতে সক্ষম হবেন। ট্রাম্প আশা করছেন ব্যালটে নয়, সুপ্রিম কোর্টেই নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারিত হবে। ব্যারেটের নিয়োগের ফলে সুপ্রিম কোর্টে রক্ষণশীল ও উদারনৈতিক বিচারপতিদের অনুপাত দাঁড়াবে ৬: ৩। মনোনয়ন প্রশ্নে শুনানিকালে ডেমোক্রেটিক সিনেটররা ব্যারেটের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁদের দাবি ছিল, সুপ্রিম কোর্টে নির্বাচনী প্রশ্ন উত্থাপিত হলে তাঁকে সিদ্ধান্ত প্রদানের ব্যাপারে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিতে হবে। কিন্তু ব্যারেট এ নিয়ে আগাম কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে অস্বীকার করেন। তিনি শুধু এটুকু আশ্বাস দেন যে সিদ্ধান্ত প্রদানে অসম্পৃক্তি বিষয়ে যে আইন রয়েছে, তা তিনি অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলবেন।

মন্তব্য পড়ুন 0