ফ্লাইট ৯৩ যে কারণে সন্ত্রাসীদের মনমতো হামলায় ব্যর্থ হয়

বিজ্ঞাপন
default-image

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। এই দিন চারটি যাত্রীবাহী বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ ছিনতাই করে যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালায় আল-কায়েদার সন্ত্রাসীরা। এই চারটি উড়োজাহাজের একটি ছিল ফ্লাইট ৯৩। বাকি তিনটি উড়োজাহাজ নিয়ে সন্ত্রাসীরা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হলেও, ফ্লাইট ৯৩ পারেনি। আর এই না পারার কারণ ছিল উড়োজাহাজটির যাত্রীরা। যাঁরা কিনা নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দিয়ে বাঁচিয়েছিলেন অগণিত প্রাণ।

১১ সেপ্টেম্বর ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের দুটি উড়োজাহাজ নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে আঘাত হেনেছিল। এ দুটি ছিল ফ্লাইট ১১ ও ফ্লাইট ১৭৫। তৃতীয় উড়োজাহাজটি ছিল ফ্লাইট ৭৭। এটি ওয়াশিংটন ডিসির বাইরে মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন ভবনের পশ্চিম অংশে আঘাত হেনেছিল। বিশ্লেষকদের ধারণা, অন্য উড়োজাহাজটি অর্থাৎ ফ্লাইট ৯৩ দিয়ে হোয়াইট হাউস বা মেরিল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের অবকাশযাপন কেন্দ্র ক্যাম্পডেভিড বা কিছু পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আঘাত হানার পরিকল্পনা করছিল সন্ত্রাসীরা। সেটি সফল হলে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বেড়ে যেত। তবে সঠিক সময়ে ফ্লাইট ৯৩-এর যাত্রীরা এমন এক সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যাতে তাঁদের নিজেদের প্রাণের বিনিময়ে বেঁচে গিয়েছিল অগণিত জীবন।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

হিস্ট্রি ডট কম এক প্রতিবেদনে বলেছে, ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৯৩ স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৪২ মিনিটে উড্ডয়ন করে। নিউজার্সি থেকে ক্যালিফোর্নিয়াগামী এই উড়োজাহাজে ৩৩ জন যাত্রী ও ৭ জন ক্রু ছিলেন। এ ছাড়া ৪ জন সন্ত্রাসীও ছিলেন। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে প্রথম বিমান হামলার কিছুক্ষণ আগে এটি উড্ডয়ন করে। সব মিলিয়ে উড়োজাহাজটিতে মানুষের সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতার অর্ধেক। তাঁরা ছুরি ও অন্যান্য অস্ত্র নিয়েই উড়োজাহাজে চড়ে বসতে পেরেছিলেন। তবে নির্ধারিত সময়ের চেয়েও ৪৫ মিনিট পর উড্ডয়ন করেছিল ফ্লাইট ৯৩। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এ কারণে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী নির্ধারিত স্থানে ও সময়ে হামলা চালাতে পারেনি সন্ত্রাসীরা।

default-image

ফ্লাইট ৯৩-এর পাইলট, ক্রু ও যাত্রীরা তাই উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই জেনে গিয়েছিলেন যে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হয়ে গেছে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা। তারপরও আনুমানিক সকাল ৯টা ২৮ মিনিটের দিকে ওই ফ্লাইটটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। ফ্লাইট রেকর্ডার থেকে জানা গেছে, ৯টা ৩২ মিনিটে ককপিট থেকে যাত্রীদের হুড়োহুড়ি না করে বসে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। তখন আরও বলা হয় যে উড়োজাহাজে একটি বোমা আছে।

এই সময় উড়োজাহাজের ক্রু ও যাত্রীরা মোবাইল ফোনে নিজেদের পরিচিতজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে থাকেন। অনেকে পরিবারের সদস্যদের ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানান যে তাঁদের বহনকারী উড়োজাহাজ ছিনতাই করেছে সন্ত্রাসীরা। এরপর যাত্রী ও ক্রু সবাই মিলে ঠিক করেন যে এমনিতেও তাঁদের মৃত্যুর মুখোমুখিই হতে হবে। পরিণতি যেহেতু এমনই হবে, তার আগে সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করার চেষ্টা করা উচিত।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এতে করে অন্তত প্রাণহানির সংখ্যা কমানো যাবে। কারণ, সন্ত্রাসীদের নির্ধারিত স্থানে উড়োজাহাজটি হামলা চালাতে সক্ষম হলে ক্ষয়ক্ষতি আরও বেশি হতে পারে। যাত্রীদের এসব পরিকল্পনা ও আলোচনার প্রমাণ পাওয়া যায় ফ্লাইট নাইন্টিথ্রির ব্ল্যাক বক্স বা ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার থেকে। এ থেকে জানা গেছে, সংক্ষিপ্ত আলোচনার পর একটি ভোটাভুটি করেন ক্রু ও যাত্রীরা। পরে ভোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ছিনতাইকারীদের প্রতিহত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

default-image

জানা যায়, ৯টা ৫৭ মিনিটে ক্রু ও যাত্রীরা পাল্টা আক্রমণ শুরু করেন। আর এ কারণেই শেষে ১০টার কিছু পরই পেনসিলভানিয়ার শাঙ্কসভিলেতে একটি খালি মাঠে বিধ্বস্ত হয় ফ্লাইট নাইন্টিথ্রি। ওই সময় উড়োজাহাজটির গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৫৮০ মাইল। ধারণা করা হয়, ক্রু ও যাত্রীদের প্রতিরোধের কারণেই হোয়াইট হাউস বা ক্যাম্পডেভিডের মতো স্থাপনার কাছাকাছি উড়োজাহাজটি নিয়ে যেতে পারেনি সন্ত্রাসীরা।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ফ্লাইট ৯৩ পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল। বাঁচেনি কেউ। ধ্বংসযজ্ঞ এতটাই ভয়ানক ছিল যে ব্ল্যাক বক্সটি পাওয়া গিয়েছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে ২৪ ফুট নিচে। তবে উদ্ধারকারীরা নিহত সবাইকে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করেন, উড়োজাহাজের ক্রু ও যাত্রীরা প্রতিরোধ গড়ে না তুললে হয়তো আরও ভয়ানক কিছুই দেখতে হতো যুক্তরাষ্ট্রকে। তবে শেষ পর্যন্ত নিজেদের প্রাণের বিনিময়ে তা ঠেকিয়ে দেন ফ্লাইট ৯৩-এর যাত্রীরা।

নাইন-ইলেভেনের হামলা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে হওয়া সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা। এ হামলায় ১৯ জন হামলাকারীসহ মোট ২ হাজার ৯৯৬ জন নিহত হন। এর মধ্যে শুধু ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে চালানো দুটি বিমান হামলায় মারা যান ২ হাজার ৭৬৩ জন। আটকে পড়া লোকজনকে উদ্ধার করতে গিয়ে ৩৪৩ জন ফায়ার সার্ভিস কর্মী এবং ৬০ জন পুলিশ সদস্যও নিহত হন। চারটি হামলায় সম্মিলিতভাবে ৭৮টি দেশের মানুষ নিহত হয়েছিলেন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন