হার মানতে রাজি নয় কেউ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আজ ৩ নভেম্বর, মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিক ভোট গ্রহণ করা হবে। তবে এর আগেই ৯ কোটির বেশি ভোটার ডাকযোগে অথবা সশরীরে আগাম ভোট দিয়েছেন। ভোট পড়ার এই ধারা অব্যাহত থাকলে এ বছরের নির্বাচনে হয়তো আগের সব রেকর্ড ভেঙে যাবে। কেউ কেউ বলছেন, এবারের নির্বাচনে ৭০ শতাংশ বা তার বেশি ভোটার ভোট দেবেন। গত এক শতাব্দীতে অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচনেই এমন ঘটনা ঘটেনি।

এই প্রবল উৎসাহের একটি কারণ স্পষ্ট। আর তা হলো, রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক—উভয় পক্ষই মনে করছে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। ৬০ বছর বয়সী ভোটার ম্যারিলিন ক্রাউডার নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, ‘ভোট দেব। কারণ, এই ভোটের ফলাফলের ওপর আমার নিজের জীবন নির্ভর করছে।’

বিজ্ঞাপন
default-image
পরাজয় মেনে নিতে রাজি নয় কোনো পক্ষই। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন–পরবর্তী সহিংসতার আশঙ্কা থাকছে।

প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, আগাম ভোটের ৫৪ শতাংশ ডেমোক্রেটিক এবং ৪৫ শতাংশ রিপাবলিকানদের ঝুলিতে পড়েছে। এ পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য–উপাত্ত থেকে স্পষ্ট, ডাকযোগে ভোটে ডেমোক্র্যাটরা অল্প-বিস্তর সুবিধা পেলেও সশরীরে ভোটে রিপাবলিকানরা এগিয়ে। এর কারণ, গুরুত্বপূর্ণ ও অনিশ্চিত এমন ১১টি অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় রিপাবলিকানদের মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি অনেক ভালো ছিল। করোনাভাইরাসের সংক্রমণকে অগ্রাহ্য করে তারা ঘরে ঘরে গিয়ে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছে। এর ফলে পেনসিলভানিয়া, ফ্লোরিডা ও আইওয়াতে রিপাবলিকান প্রচার শিবির উদ্দীপনা সঞ্চারে এগিয়ে। তারা আশা করছে, আজ এই শ্রম ও বিনিয়োগের সুফল পাবে তারা।

জাতীয় জনমত জরিপে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী জো বাইডেন এখনো ট্রাম্পের চেয়ে গড়ে ১০ পয়েন্টে এগিয়ে। কিন্তু এ মুহূর্তে জাতীয় গড় হিসাবের চেয়ে বেশি জরুরি পেনসিলভানিয়ার মতো ‘অনিশ্চিত’ অঙ্গরাজ্যগুলোর ভোটারদের মতিগতি। ট্রাম্প ও বাইডেন উভয়েই জানেন, এসব অঙ্গরাজ্যের ভোটের ফলাফলের ওপর বহুলাংশে নির্ভর করছে তাঁদের রাজনৈতিক ভাগ্য। কাগজে-কলমে বাইডেনের জন্য ২৭০টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট পাওয়ার একাধিক পথ রয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প যদি পেনসিলভানিয়া হারান, তাহলে ২৭০-এ পৌঁছানো তাঁর জন্য কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে। সে কারণেই উভয় প্রার্থী গত দুই সপ্তাহ পেনসিলভানিয়া চষে বেড়িয়েছেন। বাইডেন মনোযোগ দিচ্ছেন শহুরে এলাকায়, ট্রাম্প কৃষিপ্রধান গ্রামীণ এলাকায়।

মঙ্গলবার রাতেই ফলাফল চান ট্রাম্প

ট্রাম্প অনেক আগে থেকেই বলে আসছেন, নির্বাচনে তিনি জিতবেনই। তাঁর দাবি, তিনি যদি হেরে যান, তাহলে বুঝতে হবে ডেমোক্র্যাটরা ভোটে কারচুপি করেছেন। তিনি ডাকযোগে ভোটের ব্যাপারে তাঁর অনাস্থা ব্যক্ত করেছেন। কোনো কোনো অঙ্গরাজ্যে যেমন পেনসিলভানিয়া ও নর্থ ক্যারোলাইনায় ৩ নভেম্বরের পরেও ডাকযোগে ভোট গণনার যে সুযোগ রয়েছে, ট্রাম্প তার তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, ‘এর ফলে মহা গন্ডগোল হবে।’ ট্রাম্পের মতো এর আগে কোনো প্রেসিডেন্টই নির্বাচনের আগেই ভোটের ফলাফল নিয়ে সন্দেহের বীজ বপন করেননি। এ কারণে বিপক্ষ ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাঁদের ধারণা, নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করতে এটি ট্রাম্পের একটি কৌশল।

শুধু ট্রাম্প নন, রিপাবলিকান নেতৃত্বও নানাভাবে চেষ্টা করেছেন ভোট গণনার সময়সীমা ৩ তারিখের পর না বাড়াতে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট নর্থ ক্যারোলাইনা ও পেনসিলভানিয়ায় তাঁদের সে চেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেছেন। অবশ্য উইসকনসিনের বেলায় আদালত ভোট গণনার সময়সীমা ৩ তারিখের মধ্যে বেঁধে দিয়েছেন। ডাকযোগের ভোট গণনার সময় নিয়ে অন্যান্য অঙ্গরাজ্যেও মামলা চলছে, যার কোনো কোনোটি হয়তো সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়াবে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি চান, ৩ তারিখেই নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হোক। তিনি বলেছেন, ‘এভাবেই আগে হয়েছে, এবারও হবে।’ তাঁর এই দাবি অবশ্য সত্য নয়। রেডিও-টিভিতে ৩ তারিখ রাতের ফলাফল ঘোষণার প্রবণতা থাকলেও সরকারি ফল ঘোষণা সব সময়ই বিলম্বিত হয়। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী এ বছর পেনসিলভানিয়ায় ৩ তারিখের পর অতিরিক্ত তিন দিন পর্যন্ত ভোট গণনা চলবে। সেই গণনা শেষ হওয়ার আগেই যদি ফলাফল ঘোষিত হয়, তাহলে ডাকযোগে পড়া হাজার হাজার ভোট মূল্যহীন হয়ে পড়বে।

ডেমোক্র্যাটরা ভয় পাচ্ছেন, চূড়ান্ত গণনার আগেই ট্রাম্প হয়তো নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করে বসবেন। এ কথা ভাবার একটা কারণ, পেনসিলভানিয়ায় সশরীরে পড়া ভোটে হয়তো ট্রাম্প এগিয়ে থাকবেন, তবে ডাকভোটে পরাস্ত হবেন। ট্রাম্পের অন্যতম উপদেষ্টা জেইসন মিলার এবিসি টিভিকে বলেছেন, নির্বাচনের রাতে ট্রাম্প সম্ভবত ২৮০ ইলেকটোরাল কলেজ ভোট পেয়ে এগিয়ে থাকবেন। এরপর ডেমোক্র্যাটরা ভোট চুরির মাধ্যমে সে ফলাফল পাল্টে দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। তাঁর এ কথার অর্থ, ডাকযোগে পড়া ভোটের হিসাব যোগ হলে সম্ভবত পিছিয়ে পড়বেন ট্রাম্প।

বাইডেন এবং তাঁর রানিংমেট কমলা হ্যারিস তীব্র ভাষায় সব ভোট গণনার আগে বিজয়ী ঘোষণার যেকোনো চেষ্টার বিরোধিতা করেছেন। বাইডেন বলেছেন, চুরি করে নির্বাচনে জিততে দেওয়া হবে না। কমলা হ্যারিস বলেছেন, ‘আমাদের বিশ্বাস, এত বিশাল ব্যবধানে আমরা জিতব যে চুরি করে জেতার কোনো সুযোগই থাকবে না।’

নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা অবশ্য মনে করেন, জনমত জরিপ অনুসারে যদি ভোট পড়ে, তাহলে সম্ভবত ব্যাপক ব্যবধানে বাইডেনই জিতবেন এবং মঙ্গলবার শেষ রাতেই ফলাফল জানা যাবে। এর কারণ, অন্য অনেক অঙ্গরাজ্যের তুলনায় নর্থ ক্যারোলাইনা, অ্যারিজোনা ও ফ্লোরিডায় আগেভাগেই সব ধরনের ভোট গণনা শেষ হয়। এই তিন অঙ্গরাজ্যে যদি বাইডেন বিজয়ী হন, শেষ রাতের মধ্যেই নির্বাচনের ফলাফল নির্দেশ করা মোটেই কঠিন হবে না। ট্রাম্প যদি এই তিন অঙ্গরাজ্যে পরাস্ত হন, তাহলে হোয়াইট হাউস দখলে রাখতে তাঁকে অন্য যেকোনো একটি অঙ্গরাজ্যের ইলেকটোরাল কলেজ ভোট পেতে হবে। আপাতত কোথাও সেই সম্ভাবনা নজরে আসছে না বলেই তাঁর সব মনোযোগ পেনসিলভানিয়ায়। ২০১৬ সালে ট্রাম্প এই অঙ্গরাজ্যের ২০টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট দখলে এনেছিলেন মাত্র ৪৪ হাজার ভোটের ব্যবধানে।

বিজ্ঞাপন

সুপ্রিম কোর্টে গড়াতে পারে মামলা

২০০০ সালের নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী আল গোর ও রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী জর্জ ডব্লিউ বুশের মধ্যে ভোটযুদ্ধের সিদ্ধান্ত ভোট গণনার মাধ্যমে হয়নি। হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আশা করছেন, এবারও সে ঘটনাই ঘটবে। সেই সম্ভাবনা মাথায় রেখেই তিনি ও সিনেটে তাঁর সমর্থকেরা তড়িঘড়ি করে রক্ষণশীল বিচারপতি অ্যামি কোনি ব্যারেটকে সর্বোচ্চ আদালতের ৯ নম্বর সদস্য হিসেবে নিয়োগ চূড়ান্ত করেছেন। তবে ব্যারেট নয়, এ ক্ষেত্রে ট্রাম্পের সম্ভাব্য মিত্র হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন আরেক রক্ষণশীল বিচারপতি ব্রেট ক্যাভানা। উইসকনসিনে ৩ তারিখের পর পাওয়া কোনো ভোট গণনা করা হবে না, আদালতের এই সিদ্ধান্তের পক্ষে ক্যাভানার যুক্তি ছিল, ভোটের ফলাফল যাতে উল্টে না যায়, সে জন্য সেই রাতের মধ্যে অথবা যত দ্রুত সম্ভব সব ভোট গণনা করতে হবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও ঠিক সে কথাই বলেছেন।

২০০০ সালে সুপ্রিম কোর্টে আল গোর বনাম বুশ মামলায় ক্যাভানা বুশের অন্যতম আইনজীবী ছিলেন। অনেকেরই আশঙ্কা, এবারও হয়তো তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী ট্রাম্পের পক্ষে শুধু বিচারপতি হিসেবেই নন, আইনজীবীর ভূমিকাতেও অবতীর্ণ হবেন। ডেমোক্র্যাটরা তেমন কোনো বিপর্যয় ঠেকাতে পর্যাপ্ত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।

সহিংসতার আশঙ্কা

ফলাফল যা–ই হোক, পরাজয় মেনে নিতে রাজি নয় কোনো পক্ষই। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন–পরবর্তী সহিংসতার আশঙ্কা থাকছে। এ কথা ডান-বাম সব পক্ষের ভাষ্যকারেরাই বলছেন। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সংঘর্ষ এড়াতে তারা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশের যে ইতিহাস, তা থেকে তাদের নিরপেক্ষ ভূমিকা অনেকেই আশা করে না।

ট্রাম্পের সমর্থক হিসেবে পরিচিত একাধিক শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী মিলিশিয়া গ্রুপ জানিয়েছে, তারা গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা করছে। এসব গ্রুপের কয়েকটি ভোটকেন্দ্রে অস্ত্র হাতে পাহারা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ট্রাম্পের প্রচার শিবির থেকেও জানানো হয়েছে, তারা ৫০ হাজার ‘ভোট পরিদর্শক’ পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এদের উপস্থিতি বাইডেনের অনেক অশ্বেতকায় সমর্থককে ভোট দিতে নিরুৎসাহিত করতে পারে।

তবে ডেমোক্রেটিক সমর্থকেরাও পিছিয়ে নেই। অরেগনের সংগঠন ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট অব আমেরিকার যুগ্ম সভাপতি অলিভিয়া কাটবি স্মিথ ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছেন, ‘ভয় না পেলে ডানপন্থীরা ক্ষমতা ছাড়বে না। আমরা মনে করি, দাঙ্গা হলো অশ্রুত মানুষের ভাষা। ভূসম্পত্তির ওপর হামলা মোটেই কোনো সহিংসতা নয়।’

হানাহানির এই আশঙ্কা থেকে মনে হয়, নির্বাচন নিয়ে বিবাদ সহজে মিটবে না। ভাষ্যকার চার্লস ব্লোর মতে, নির্বাচনের পরের সপ্তাহগুলো হবে উনিশ শতকে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যে গৃহযুদ্ধের পর সবচেয়ে ভয়াবহ সময়। এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি না হলেই যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ বেশি খুশি হবে।

মন্তব্য পড়ুন 0