বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মার্কিন আইন অনুসারে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ। মার্কিন সরকারের অফিস অব গভর্নমেন্ট এথিকসের সাবেক পরিচালক ওয়াল্টার শ্যব এই ব্যবহারকে ‘ঘৃণিত একটি কাজ’ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, ব্যক্তিগত স্বার্থে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহারের এর চেয়ে বড় নজির আর নেই।

তবে রিপাবলিকান কনভেনশনের এটিই একমাত্র অভিনব ব্যাপার ছিল না। ট্রাম্প ছাড়াও এই সম্মেলনে ভাষণ দেন তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য। এমনকি তাঁর বড় ছেলে ডোনাল্ড জন ট্রাম্প জুনিয়রের বান্ধবীও ভাষণ দেওয়ার সুযোগ পান। একজন ভাষ্যকারের কথায়, এটি ছিল ট্রাম্প কর্তৃক প্রযোজিত ট্রাম্প পরিবারের একটি ‘রিয়েলিটি শো’। সম্মেলনের চার দিন অধিকাংশ বক্তা পরবর্তী চার বছর এই দল কী অ্যাজেন্ডা অনুসরণ করবে, অথবা দলের সামনে কী চ্যালেঞ্জ, তার ফিরিস্তি দেওয়ার বদলে শুধু ট্রাম্পের অপরিহার্যতা বর্ণনায় ব্যয় করেন। এই প্রথম কোনো দলের নির্বাচনী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো যেখানে কোনো নির্বাচনী ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়নি। তার বদলে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ কর্মসূচিকে বাস্তবায়নই হবে এই দলের লক্ষ্য।

সবাইকে টেক্কা দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স। ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ পত্রিকা তাঁর বক্তব্যের মূল কথা বর্ণনায় লিখেছে, সম্মেলনে মাইক পেন্স যা বললেন তা হলো ট্রাম্প মহান, তিনি মহান এবং তিনি আবারও মহান। ট্রাম্পের রানিং মেট হিসেবে পেন্স আগামী নির্বাচনে অংশ নেবেন।

অধিকাংশ পর্যবেক্ষক একমত, আগামী নির্বাচন হবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চার বছরের ওপর একটি রেফারেনডাম বা গণভোট। তিনি নিজেই অভিযোগ করেছেন, মিডিয়ার নেতিবাচক প্রচারণার কারণে ‘আমাকে কেউ পছন্দ করে না’। বস্তুত, গত সাড়ে তিন-চার বছরে ট্রাম্পের প্রতি জনসমর্থন কার্যত একই জায়গায় রয়েছে। ৪০ শতাংশের মতো মানুষ তাঁর কাজে সন্তুষ্ট, ৫২ শতাংশ মানুষ তাঁর বিরোধী। প্রধানত শ্বেতকায় ও কৃষিনির্ভর অঞ্চলগুলোতেই তাঁর সমর্থন সীমাবদ্ধ। শহর ও শহরতলির নারী ভোটার ও সংখ্যালঘুদের মধ্যে তাঁর প্রতি প্রবল বিতৃষ্ণা রয়েছে। জিততে হলে তাঁকে এই ভোটারদের একাংশকে নিজের পক্ষে পেতে হবে। কিন্তু কনভেনশনের কোনো পর্যায়েই এঁদের পক্ষে টানার কোনো চেষ্টা তিনি করেননি। পক্ষান্তরে, নিজের শ্বেতকায় সমর্থকদের খুশি করবে, এমন বক্তব্যেই তাঁকে আগ্রহী দেখা গেছে।

আমেরিকার সামনে এই মুহূর্তে প্রধান সমস্যা তিনটি—বল্গাহীন করোনাভাইরাস, অর্থনীতির মন্দাবস্থা ও দেশজুড়ে পুলিশি ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে আফ্রিকান-আমেরিকানদের তীব্র ক্ষোভ। আমেরিকায় ইতিমধ্যে করোনার কারণে ১ লাখ ৮৫ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এখনো প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। রিপাবলিকানরা করোনাভাইরাসকে কার্যত একটি ‘বিগত সমস্যা’ হিসেবেই উপস্থাপন করে। ট্রাম্প ঘোষণা করেন, এ বছর নাগাদই করোনার টিকা আবিষ্কৃত হবে এবং ‘আমরা তাকে গুঁড়িয়ে দেব’। অর্থনীতি প্রশ্নে বলা হয়, ট্রাম্প ইতিহাসের সবচেয়ে সফল অর্থনীতি গড়েছেন। ক্ষমতায় ফিরে এলে আগের চেয়েও শক্তিশালী অর্থনীতি গড়বেন তিনি। বর্ণ-সংশ্লিষ্ট সমস্যাটিও পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া হয়। উল্টো তিনি দাবি করেন, আফ্রিকান-আমেরিকানদের স্বার্থ রক্ষায় প্রেসিডেন্ট লিংকনের পর তাঁর মতো এত কাজ আর কেউ করেননি।

কনভেনশনে অধিকাংশ সময় ব্যয় করা হয় বাইডেন ও ডেমোক্রেটিক পার্টির বিরুদ্ধে তুমুল বিষোদগারে। বক্তাদের চোখে ডেমোক্রেটিক পার্টি একটি ভয়ানক বামপন্থী দল, যারা ক্ষমতায় ফিরে এলে আমেরিকা ভেনেজুয়েলা বা কিউবার মতো ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হবে। বাইডেন নিজে মধ্যপন্থী, তাঁকে কমিউনিস্ট বলে চালানো সহজ নয়, সে কারণে বাইডেনকে দলের বামপন্থীদের হাতে জিম্মি হিসেবে বর্ণনা করা হয়। ট্রাম্প জানান, বাইডেন হলো ট্রয়ের ঘোড়া, নির্বাচিত হলে তাঁর দলের বামপন্থীদের চাপে আমেরিকায় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে।

ট্রাম্প আরও বলেন, বাইডেন মোটেই আমেরিকার রক্ষাকর্তা নন, সুযোগ পেলে তিনি এই দেশের মহত্ত্ব ধুলায় মিশিয়ে দেবেন।

বাইডেন ও ডেমোক্রেটিক পার্টি তাদের সম্মেলনে আফ্রিকান-আমেরিকানদের বিক্ষোভের প্রতি স্পষ্ট সহানুভূতি দেখানোর পাশাপাশি পুলিশ প্রশাসনের সংস্কারের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন। ট্রাম্প ও রিপাবলিকান দলের অবস্থান ছিল ঠিক বিপরীত। অব্যাহত বিক্ষোভ কোথাও কোথাও রক্তাক্ত সংঘর্ষে পরিণত হয়েছে এবং শ্বেতকায় ভোটারদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করেছে। সে কথা মাথায় রেখে ট্রাম্প বাইডেনকে অরাজকতার সমর্থক হিসেবে চিত্রিত করেন।

‘বাইডেন ক্ষমতায় এলে সহিংস অরাজকতাকারী, বিক্ষোভকারী ও দুষ্কৃতকারীদের হাতে দেশের নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে এবং তারা আমাদের পরিচিত মার্কিন জীবনব্যবস্থা ধ্বংস করবে’, সাবধান করে দেন ট্রাম্প।

এই সম্মেলনে ট্রাম্প ও রিপাবলিকান বক্তাদের কথায় সত্য ও মিথ্যার কোনো ভেদচিহ্ন ছিল না। ন্যাশনাল পাবলিক রেডিওর একজন ভাষ্যকার বলেছেন, স্বাস্থ্যসেবা থেকে অর্থনীতি, বৈদেশিক নীতি থেকে পুলিশ প্রশাসনের সংস্কার প্রশ্নে একের পর এক মিথ্যা বলে যাওয়া হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন হিসাব করে বলেছে, এক ট্রাম্পই তাঁর ভাষণে কমপক্ষে ২০টি মিথ্যা বলেছেন। সাবেক সোভিয়েত ভাষ্যকার পমেরানৎসিয়েফ মন্তব্য করেছেন, এই সম্মেলনে ট্রাম্পের কথা শুনে তাঁর মনে হয়েছে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নে ফিরে গেছেন, ‘যেখানে সত্য বলার বদলে নিজ সমর্থকেরা যা শুনতে চান তা-ই বলা হয়।’

সবচেয়ে কঠোর সমালোচনাটি করেছে মধ্যপন্থী হিসেবে পরিচিত ‘ইউএসএ টুডে’ পত্রিকা। এক বিশেষ সম্পাদকীয়তে পত্রিকাটি মন্তব্য করেছে, ‘২০১৬ সালে ট্রাম্প অশুভের হাত থেকে আমেরিকাকে উদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অথচ বাস্তবে তিনি আমেরিকাকে অশুভের পথে ঠেলে দিয়েছেন।’

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন