default-image

আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় নির্বাচন। শুধু প্রেসিডেন্ট নয়, সমগ্র প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ এই দিনের ভোটে নির্ধারিত হবে। কিন্তু সময়মতো নির্বাচনের ফলাফল পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, ৩ তারিখ রাতে তো নয়ই, কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস লেগে যেতে পারে ফলাফল পেতে।

এটি একদম শূন্যগর্ভ হুমকি নয়। অধিকাংশ পর্যবেক্ষক মনে করেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে এবারের নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক মানুষ ডাক মারফত ভোট দেবেন। অনেক ক্ষেত্রে ৩ তারিখ পর্যন্ত ডাক মারফত ভোট দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। ভোট গ্রহণ শেষে এই ভোট গণনা শুরু হলে কত দ্রুত তা শেষ হবে, তা বলা কঠিন। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ডাক মারফত ভোট হলে তাতে বিপুল কারচুপির আশঙ্কা রয়েছে। এ কথার কোনো প্রমাণ নেই, কিন্তু তাঁর কথার প্রতিধ্বনি করে রিপাবলিকান নেতৃত্ব একই কথা বলা শুরু করেছেন। ফলে, ডাক ভোট গণনা শেষ হলেও তার ফলাফল নিয়ে উভয় পক্ষই আপত্তি জানাবে। শেষ পর্যন্ত এই বিবাদ আদালত পর্যন্ত গড়াতে পারে, যা একাধিক ধাপ কাটিয়ে হয়তো সুপ্রিম কোর্টের কাছে আসবে চূড়ান্ত রায়ের জন্য। ২০০০ সালে আল গোর বনাম জর্জ বুশের নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করতে এক মাসের অধিক বিলম্ব হয়, যা কেবল সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে নিষ্পত্তি হয়।

২০০০ ও ২০২০ সালের মধ্যে ফারাক বিস্তর। যুক্তরাষ্ট্র এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক বিভক্ত। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে অবিশ্বাস, এমনকি ঘৃণা এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য। ২০০০ সালে আল গোর সুপ্রিম কোর্টের রায়ের প্রতি সম্মান দেখিয়ে পরাজয় মেনে নিয়েছিলেন। এবার ট্রাম্প তো নয়ই, জো বাইডেনও বিতর্কিত ফলাফল মানবেন না—এ কথা নিশ্চিত। ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন, তাঁর পরাজিত হওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। শুধু কারচুপির মাধ্যমে তাঁকে পরাস্ত করা সম্ভব। তাঁর সমর্থকেরাও তেমন ফলাফল মানবেন না বলে তিনি জানিয়েছেন

বিজ্ঞাপন

ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জো বাইডেন অবশ্য ঠিক এই ভাষায় নির্বাচনী ফলাফল প্রত্যাখ্যানের কথা বলেননি। তবে তাঁর দলের অনেকেই কোনোভাবেই পরাজয় মানতে প্রস্তুত নন। যেমন হিলারি ক্লিনটন তাঁকে পরামর্শ দিয়েছেন, ফলাফল বিপরীত হলে পরাজয় যেন কিছুতেই মেনে নেওয়া না হয়। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘এই নির্বাচনের ফল নিয়ে টানাটানি হবে, তবে অবশেষে জো বাইডেনই বিজয়ী হবেন। কিন্তু সে সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত তাঁর উচিত হবে এক ইঞ্চি জমিন না ছেড়ে দেওয়া।’ হিলারি পরামর্শ দিয়েছেন, ডেমোক্রেটিক পার্টির উচিত হবে এখন থেকে আদালতে লড়াই করার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।

জো বাইডেন ও তাঁর শিবির ঠিক সে কাজটাই শুরু করেছে। তাঁরা রীতিমতো একটি ‘যুদ্ধ কক্ষ’ প্রস্তুত করছেন, যার কাজ হবে কোনো সন্দেহ দেখা দিলে অবিলম্বে আদালতের আশ্রয় নেওয়া। এই কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দুজন সাবেক সলিসিটর-জেনারেল, তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন কয়েক শ ঝানু আইনজীবী। বস্তুত, এই আইনজীবীরা ইতিমধ্যে অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে ভোটাধিকার সংকোচনে রিপাবলিকান চেষ্টার প্রতিবাদে একের পর এক মামলা করে চলেছেন। কোথাও তাঁরা জিতেছেন, কোথাও হেরেছেন। যেমন ফ্লোরিডায় রিপাবলিকান গভর্নর জেলফেরত ব্যক্তিদের ভোটাধিকারে বাধা দিয়েছিলেন। আদালত তাঁর যুক্তি মেনে কয়েক লাখ জেলফেরত ব্যক্তির ভোটাধিকার রদ করেছেন। আবার উইসকনসিনে ডেমোক্র্যাটদের আবেদনে গ্রিন পার্টির প্রার্থীর নাম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ব্যালট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অনেকে ভয় পাচ্ছেন, ফলাফল ঘোষণায় যত বিলম্ব হবে, রাজনৈতিক পরিবেশ তত অশান্ত হয়ে উঠতে পারে। এমনকি ‘সশস্ত্র বিদ্রোহের’ আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই এই অভিযোগে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। গত বছর কংগ্রেস যখন তাঁকে অভিশংসনের উদ্যোগ নেয়, সে সময় তিনি ঘোষণা করেছিলেন, এমন কিছু ঘটলে দেশে গৃহযুদ্ধ বেধে যাবে। তাঁর সমর্থকেরা কখনোই এটা সহ্য করবেন না। বাস্তবে তা ঘটেনি, তিনি অভিশংসিত হলেও সিনেটে সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় তাঁকে ক্ষমতা থেকে হটানো সম্ভব হয়নি।

ট্রাম্পের নিকট মিত্র হিসেবে পরিচিত স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী সেক্রেটারি মাইকেল কাপুটো রিপাবলিকান সদস্যদের এক অনলাইন বৈঠকে অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্প জিতবেন এ কথা নিশ্চিত, কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা সে ফলাফল মানার বদলে সশস্ত্র বিদ্রোহে নেমে পড়বেন। তিনি বলেছেন, ‘শপথ গ্রহণের দিন ট্রাম্প সরে দাঁড়াতে অস্বীকার করলে গুলি ছুটবে। এখন পর্যন্ত যা দেখছেন তা যা হতে যাচ্ছে তার তুলনায় নস্যি।’

অভ্যন্তরীণ সহিংসতাবিষয়ক একাধিক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রে ডান ও বামপন্থী রাজনীতির অনুসারীদের মধ্যে তিক্ততা এখন এতটাই তীব্র যে নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে রক্তাক্ত হানাহানি প্রায় অনিবার্য। এসব বিশেষজ্ঞের একজন হলেন ডেভিড কুলকিলেন। ওয়েব পত্রিকা ‘স্লেট’-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ডান ও বাম—উভয় পক্ষই সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। দুই পক্ষেই ‘চূড়ান্তবাদীরা’ রয়েছে। ইতিমধ্যে একাধিক শহরে এই দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে, মানুষের মৃত্যুও হয়েছে।

ছোটখাটো সংঘর্ষের ঘটনা থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে। কুলকিলেন বলেছেন, কী কারণে বা কে সংঘর্ষের সূচনা করল, সেটি বড় কথা নয়। ‘একবার আগুন ধরলে তা থামানো কঠিন হবে।’

মন্তব্য পড়ুন 0