দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকে এক দফার আন্দোলন

মোশতাক আহমেদ ও নুতন শেখ, গোপালগঞ্জ থেকে
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১১:৩০
আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০১৯, ১৩:৫১

খোন্দকার নাসিরউদ্দিনবিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভেবেছিল, ছুটি ঘোষণা করলেই আন্দোলন থেমে যাবে। কিন্তু হয়েছে উল্টো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন একটাই স্লোগান, ‘উপাচার্যের পদত্যাগ চাই’।

কেন এই অস্থিরতা? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জানালেন, এ পরিস্থিতি এক দিনে তৈরি হয়নি। টানা দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পালন করে যাওয়া বর্তমান উপাচার্য খোন্দকার নাসিরউদ্দিনের বিরুদ্ধে নিয়োগ ও ভর্তি থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা কাজে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ একের পর এক উঠছে। এ ছাড়া শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দমিয়ে রাখতে বহিষ্কার, গালাগাল, শোকজ করার প্রবণতা তাঁকে সমালোচিত করেছে। 

শুধু তা–ই নয়, উপাচার্যের মতো একটি ‌‌‌সম্মানিত পদে থাকা খোন্দকার নাসিরউদ্দিনের বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারির মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে। উপাচার্য তাঁর বাসভবনের কাছে একটি বিউটি পারলারের অনুমোদন দিয়েও আলোচিত–সমালোচিত হয়েছেন। আর সবশেষ অভিযোগ হলো, ‌‌গুন্ডা দিয়ে তিনি আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছেন। হামলার প্রতিবাদে তাঁরই প্রশাসনের একজন সহকারী প্রক্টর হুমায়ুন কবির পদত্যাগ করেছেন। হুমায়ুন কবির প্রথম আলোকে বলেন, প্রশাসনের নির্দেশেই এই হামলা হয়েছে।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বলছেন, সাড়ে চার বছর ধরে উপাচার্য নানা কাণ্ড করে যাচ্ছেন। এ কারণে নতুন এ বিশ্ববিদ্যালয়টির সুনাম যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি অগ্রযাত্রাও পিছিয়ে পড়ছে।

এসব অভিযোগ নিয়ে এত দিন শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) দৃশ্যমান তৎপরতা না থাকলেও গত সোমবার মন্ত্রণালয়ের এক চিঠি পেয়ে তদন্তে নামছে ইউজিসি। ইউজিসির তদন্ত দল আজ বুধবার গোপালগঞ্জে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে সরেজমিনে আসছে। ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক দিল আফরোজ বিষয়টি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন।

তবে উপাচার্য খোন্দকার নাসিরউদ্দিন তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন। গতকাল প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘যে ১৪ দফা দাবি করা হয়েছিল, তা তো মানা হয়েছে। এখন পদত্যাগের দাবি কতটা যৌক্তিক? আর নিয়োগ নিয়ম মেনেই হয়েছে। ভর্তিতে বিশেষ কোটা ইউজিসির অনুমোদন নিয়েই করা হয়েছে।’ এক নারী কর্মচারীর অভিযোগ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য, এটা অনেক আগের। সেই অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন ওই নারী।

জাতির জনকের নামে গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়টি শিক্ষা কাযর্ক্রম শুরু করে ২০১১ সালে। এখন ৩৪টি বিষয়ে মোট শিক্ষার্থী ১২ হাজারের মতো।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক খোন্দকার নাসিরউদ্দিন ২০১৫ সালে দ্বিতীয় উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান। তিনি গোপালগঞ্জের বাসিন্দা হওয়ায় চলতি বছর দ্বিতীয় মেয়াদেও উপাচার্যের দায়িত্ব পেতে তাঁর বেগ পেতে হয়নি।

অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেছে, তিন বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ‌‘বিশেষ কোটা’ (১ শতাংশ) নামে এক ধরনের ভর্তি কোটা চালু করেছেন উপাচার্য। ভর্তি পরীক্ষায় ন্যূনতম ২৫ পেলেই এই কোটায় ভর্তির সুযোগ পাওয়া যায়। 

উপাচার্যের বিরুদ্ধে নিয়োগ ও ভর্তি থেকে শুরু করে বিস্তর অভিযোগ। পদত্যাগের দাবি শিক্ষার্থীদের।

কয়েকজন শিক্ষক জানান, এই কোটা উপাচার্য নিজেই ঠিক করেন। এ সুযোগে যেনতেন ছাত্রও ভর্তি হয়েছেন। ফার্মাসি বিভাগে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে এমন কিছু শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন, যাঁদের ফরমের ওপর বিভিন্ন সাংকেতিক চিহ্ন রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য বলেন, সাধারণ কোটার বাইরেও বিভিন্নজনের সুপারিশের ভিত্তিতে বিশেষ কোটায় ভর্তি করা হয়।

অভিযোগ উঠেছে, যোগ্যতায় ঘাটতি থাকার পরও উপাচার্যের ভাতিজা খন্দকার মাহমুদ পারভেজকে প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিয়ে পরে আবার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে শিক্ষক করা হয়েছে। অথচ স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর দুটিতে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা দ্বিতীয় শ্রেণি। এখন আবার এই বিভাগের প্রধানও উপাচার্যের ভাতিজা।

একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করেন, উপাচার্য প্রথমে বেশ কয়েকজনকে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। পরে পছন্দের শিক্ষকদের চূড়ান্তভাবে নিয়োগ দেন। নিচের স্তরের কিছু পদেও নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। 

এ ছাড়া অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা ইউজিসির এক সদস্যের ছেলেকে ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। গণিতসহ কয়েকটি বিভাগে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বিভাগীয় সভাপতি করার অভিযোগ উঠেছে। পরিসংখ্যানসহ কয়েকটি বিভাগের একাধিক সহকারী অধ্যাপক সহযোগী অধ্যাপক হওয়ার মতো যোগ্যতা অর্জন করলেও পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে না, যা নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ আছে।

আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ

শিক্ষার্থীদের টাকায় দুর্যোগ ও ত্রাণকল্যাণ তহবিল রয়েছে। কিন্তু এই টাকা বণ্টনে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গ্রামবাসীর মারামারির ঘটনায় ছাত্রদের আপ্যায়ন বাবদ ৪০ হাজার টাকা খরচ দেখানো হয়েছে এই তহবিলের টাকায়। শুধু তা–ই নয়, ঈদ উপলক্ষে শিক্ষার্থীদের খাবার পরিবেশনের জন্য ১ লাখ টাকার খরচ দেখানো হয়েছে এই তহবিলের টাকায়। অথচ ঈদে সাধারণত শিক্ষার্থীরা হলে থাকেন না।

ভর্তি ফরমের আয় থেকে ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। আবার বই কেনাসহ কিছু কাজের কেনাকাটায় ক্রয়প্রক্রিয়া যথাযথভাবে মানা হয়নি বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব শাখার একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। 

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু ম্যুরাল করার কথা থাকলেও সেটি করা হয়নি। তখন এর খরচ ধরা হয়েছিল প্রায় আড়াই কোটি টাকা। কিন্তু এত দিনে না হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই ব্যয় বাড়বে। এখানেই শেষ নয়, কাজ না হলেও এই খাতের রাখা টাকা ব্যয়ের হিসাবে রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। অন্যদিকে একটি শহীদ মিনার করার কথা থাকলেও এখনো কাঠের শহীদ মিনারই রয়েছে। সেটির অবস্থাও করুণ। শহীদ মিনারের জন্য বরাদ্দ টাকার একটি বড় অংশ ব্যয়ের হিসাবে রাখা হয়েছে। 

ইউজিসির পরিচালক ফেরদৌস জামান প্রথম আলোকে বলেন, কাজ শেষ না করে টাকা ব্যয়ের হিসাবে দেখানোর নিয়ম নেই।

তুচ্ছ ঘটনায় শোকজ

ফার্মাসি ও গণিতের দুজন শিক্ষক জানান, তুচ্ছ ঘটনায় তাঁদের শোকজ করা হয়েছে। এই তালিকায় বাদ যাননি বিশ্ববিদ্যালের একমাত্র নিয়মিত অধ্যাপক মো. শাহজাহানও। ফার্মাসির শিক্ষক শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, খেলার মাঠে শিক্ষার্থীদের কথা–কাটাকাটির বিষয়ে তাঁকে শোকজ করা হয়েছে। আর তাতে আপত্তিকর শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।

এ ছাড়া আট শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করে পরে আবার প্রত্যাহার করা হয়। সর্বশেষ আইন বিভাগের ছাত্রী ফাতেমা-তুজ-জিনিয়াকে বহিষ্কারের পর শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। আন্দোলনের মুখে এই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। শিক্ষার্থীরা এক সপ্তাহ ধরে আন্দোলন করে যাচ্ছেন। গতকাল বিকেলে তাঁরা ক্যাম্পাসে ঝাড়ুমিছিল বের করেন। 

 বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগের শিক্ষক সোলাইমান হোসাইন বলেন, এই আন্দোলন দীর্ঘদিনের জমানো ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) গোপালগঞ্জ জেলার সভাপতি রবীন্দ্রনাথ অধিকারী প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তা থেকে পরিত্রাণের একমাত্র সমাধান উপাচার্যের পদত্যাগ বা অপসারণ।