বাংলাদেশ

স্মৃতিজাগানিয়া ভাষা জাদুঘর

ভাষাশহীদ আবুল বরকত স্মৃতি জাদুঘর ও সংগ্রহশালা ঘুরে দেখছেন দর্শনার্থীরা। গত বৃহস্পতিবার তোলা ছবি l প্রথম আলো

‘সংগ্রহশালা দেখার সময় মনে হচ্ছিল যেন ১৯৫২ সাল দেখছি। অনেক কিছু জানতে পারলাম। মন খারাপ লাগছিল। আবার গৌরবও হচ্ছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ভাষাশহীদ আবুল বরকত স্মৃতি জাদুঘর ও সংগ্রহশালা’ ঘুরে মন্তব্য খাতায় এমন প্রতিক্রিয়া লিখেছে ঢাকায় বেড়াতে আসা চট্টগ্রামের বাঁশখালীর ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী আফরিন সোহানা।
আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএর ছাত্র রিপন মাহমুদ লিখেছেন, ‘বইপুস্তক পড়ে যা জেনেছি, জাদুঘরে এসে সব যেন পূর্ণতা পেল।’ আরেক ছাত্র রাশেদুল মিয়া লিখেছেন, ‘প্রতিটা মুহূর্ত যেন জীবন্ত।’ মুজাহিদুল ইসলাম লিখেছেন, ‘জাদুঘর ঘুরে শরীরে শিহরণ জাগছে।’
ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি চলছে। এমন সময়ে এই জাদুঘর ঘুরে শিহরিত হতে পারেন আপনিও। জানতে পারেন ১৯৪৮ থেকে শুরু করে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনের নানা ঘটনার কথা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলেন আবুল বরকত। তাঁর নামেই ২০১২ সালের ১২ মার্চ পলাশীতে জহুরুল হক হলের ভেতরে এই স্মৃতি জাদুঘর ও সংগ্রহশালার উদ্বোধন করেন ভাষাসৈনিক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি হাবিবুর রহমান। বরকতের ব্যক্তিগত ছবি, চিঠি, ব্যবহৃত জিনিসপত্র, মরণোত্তর একুশে পদক, বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ ছাড়াও ভাষা আন্দোলনের নানা সংগ্রহ আছে এই জাদুঘরে। দোতলায় আছে একটি পাঠাগার। সেখানে মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের ওপর বাংলাদেশে প্রকাশিত দলিল ও বইপত্রও রয়েছে। দর্শনার্থীদের জন্য রোববার থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত খোলা থাকে এই জাদুঘর।
পলাশীর মোড় থেকেই চোখে পড়ে দোতলা দৃষ্টিনন্দন প্রতিষ্ঠানটি। জহুরুল হক হলের পেছনের গেট দিয়ে ঢুকলেই হাতের বাঁয়ে এই জাদুঘর। গত বৃহস্পতিবার সকালে গিয়ে দেখা গেল ২১ ফেব্রুয়ারি সামনে রেখে ধোয়ামোছার কাজ চলছে। জাদুঘরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়বে ভাষাশহীদ বরকতের জীবনী।
১৯৫২ সালে স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে মহান ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হন আবুল বরকত। ওই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হওয়ার পর রাতে তিনি শাহাদতবরণ করেন।
এই স্মৃতিফলক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেই দেয়ালে বিশাল ক্যানভাসে আঁকা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ দাবিতে ছাত্রদের মিছিল। মিছিলে সরকারি বাহিনীর গুলিবর্ষণ। গুলিতে শহীদ ও তাঁদের স্মরণে প্রথম শহীদ মিনার এবং তারপর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, শ্রদ্ধাঞ্জলি ও প্রভাতফেরি। ডান পাশে নিদর্শন ও আলোকচিত্র। নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে ভাষাশহীদ আবুল বরকতের ব্যবহৃত একটি খেলনা, তিনটি কাপ-পিরিচ, বাবাকে লেখা বরকতের তিনটি চিঠি, বরকতের ডিগ্রির সনদ।
১৯৪৮ সালের ২ সেপ্টেম্বর লেখা চিঠিতে বরকত তাঁর বাবাকে বলছেন, ‘এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারিনি। দু-চার দিনের মধ্যে হয়ে যাব।’ ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় টাকা পাঠানোর তাগিদ দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আপনি যে টাকা দিয়েছেন উহাতে হইবে না। কারণ ভর্ত্তি হইতে প্রায় ৬০/৭০ টাকা লাগিবে। তার ওপর একখানি তক্ত...লণ্ঠন ও আরও দু’একটা জিনিসপত্রও কিনিতে হইবে। আপনি ৫০ টাকা ধার করিয়া পাঠাইয়া দিবেন...।’
এই সংগ্রহশালায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চের ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫২ সালের আন্দোলন, ২১ ফেব্রুয়ারি বরকতের কবরে তাঁর বাবা-মায়ের শ্রদ্ধাঞ্জলি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের প্রভাতফেরি, মাওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রভাতফেরির ছবি, একুশের গানসহ নানা ঘটনার আলোকচিত্র রয়েছে। ঐতিহাসিক এসব ছবি যে কারও মনে শিহরণ জাগাবে।
জাদুঘর ঘুরতে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইমরান হোসেন বলেন, ‘এই জাদুঘর ঘুরলে যে কারও মধ্যেই দেশপ্রেম জেগে উঠবে। তিনি জানতে পারবেন অতীতের গৌরবের কথা। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর এই জাদুঘর ঘোরা উচিত।’ একই রকম মন্তব্য করলেন এস এম মোরশেদ ও আমিনুল ইসলাম।
মাতৃভাষা বাংলার জন্য আত্মোৎসর্গের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০০ সালে আবুল বরকতকে একুশে পদকে (মরণোত্তর) ভূষিত করে সরকার। সেই পদকও আছে এখানে।
ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক এবং ভাষাশহীদ আবুল বরকত স্মৃতি জাদুঘর ও সংগ্রহশালার পরিচালক আবু মো. দেলোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বরকতের ব্যবহার করা একটি ঘড়ি ও দোনলা বন্দুক দিতে চায় তার পরিবার। কিন্তু এগুলোর ঐতিহাসিক মূল্য অনেক। এখানে সেই নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই। সে কারণে এখনই নেওয়া যাচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘জাদুঘর থেকে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, ভাষাসৈনিকদের সাক্ষাৎকার ও ভাষা আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা নিয়ে তিনটি তথ্যচিত্র নির্মাণের কাজ চলছে। ১৯৪৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ভাষা আন্দোলন নিয়ে প্রকাশিত সব খবর সংগ্রহ করা হচ্ছে। ভাষা আন্দোলন নিয়ে যত বই আছে, সেগুলোর তালিকা হবে।’