বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

২.

গত বছরের শেষের দিকে অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোতে কোভিড-১৯ পরিস্থিতির সামগ্রিক উন্নতি হলে পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা শুরু।

ডিসেম্বরের শেষের দিকটায় বাচ্চাদের স্কুল ছুটি আর নিজেদের অফিস ছুটির কারণে বড়দিনের সময়টা ঘুরে বেড়ানোর অনুকূল। স্থান হিসেবে ঠিক হলো উত্তর-পূর্বের রাজ্য কুইন্সল্যান্ডের গোল্ডকোস্ট শহর, বাচ্চারা সেখানে থিম পার্কের রাইডগুলোতে অনেক মজা করবে বলে। ক্যানবেরা থেকে গোল্ডকোস্ট প্রায় ১১০০ কিলোমিটার দূরত্বে উত্তর দিকে অবস্থিত। সেই অনুযায়ী আমরাসহ আরও দুই বন্ধুর পরিবার মিলে ড্রাইভ করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো, যাতে গাড়ি নিয়ে যাত্রাপথের আশপাশের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখা যায়।

পথে যাত্রাবিরতীর স্থান নিউ ক্যাসেলসহ গোল্ডকোস্টে অবস্থানের জন্য কয়েক দিনের হোটেল বুকিং দেওয়া হলো। গোল্ডকোস্টে অবস্থানরত এক ভাইয়ের বাসায়ও কয়েক দিন থাকার পরিকল্পনা করা হলো। আরেক বন্ধু নিউ ক্যাসেল থেকে চার ঘণ্টার দূরত্ব থেকে আমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করল। একসঙ্গে থাকার জন্য সে হোটেলও বুক করে ফেলল। গোল্ডকোস্ট থেকে পাঁচ ঘণ্টার দূরত্ব থেকে এক ছোট ভাইয়ের দেখা করতে আসার পরিকল্পনাও চূড়ান্ত হলো। বাচ্চাদের আনন্দগুলো এতক্ষণে কুঁড়ি থেকে পাপড়ি হয়ে দেখা দিতে শুরু করেছে। প্রতিদিন কী কী মজা করবে, তার পরিকল্পনা করে কাগজে লিপিবদ্ধ করে ফেলল তারা। তাদের আনন্দ দেখে নিজেরাও আনন্দিত। নিজেদের আনন্দগুলো রূপ পাল্টে এখন বাচ্চাদের আনন্দে রূপান্তরিত নিঃসন্দেহে। বাচ্চাদের আনন্দের চূড়ান্ত রূপও দেওয়া হলো গোল্ডকোস্টের থিম পার্কের টিকিটগুলো অগ্রিম বুকিং দেওয়ার মাধ্যমে। পরিকল্পনার আর কী? সব তো শেষ। শুধু ড্রাইভ করে যাওয়া বাকি!
কথায় আছে, একের ওপরে দেড়, দেড়ের ওপরে দুই,...। হ্যাঁ, করোনাভাইরাস বলে কথা।

তার পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন। তার মনের কথা বোঝা বড় দায়। ভ্রমণের ঠিক এক সপ্তাহ আগে কুইন্সল্যান্ডে অনেক দিন পর নতুনভাবে আবার কোভিডে আক্রান্ত শনাক্ত হতে শুরু হলো। একটা–দুইটা করে এক জায়গা দুই জায়গা হয়ে বিভিন্ন দিকে বিস্তার করা শুরু করল। করোনার খবরে প্রতিদিন চোখ রেখে বাচ্চাদের কথা ভেবে ভেতরে মুষড়ে যাওয়া আশাগুলোকে যেন নুয়ে পড়া গাছের সঙ্গে পাতলা কঞ্চি লাগিয়ে কোনোমতে সোজা রাখার চেষ্টা চলতে থাকল। তা কি আর করোনা শোনে। সে তো বধির। তার কোনো কান নেই। শুধু বিষাক্ত দাঁত আছে, গতিময় পা আছে। কয়েক দিনের মধ্যে নতুন সংক্রমণের সংখ্যা বাড়তে থাকায় কোয়ারেন্টিন আর বিধিনিষেধের ঝুঁকি এড়াতে সবাই মিলে আলোচনা করে পুরো ভ্রমণটাই বাতিল করতে হলো। বাচ্চাদের চোখ প্লাবিত হলো অঝোর ধারায়। অনেক কষ্টে বোঝানো গেল যে সামনে পরিস্থিতি ভালো হলে সবাই মিলে আবার গোল্ডকোস্টে যাওয়ার চেষ্টা করব।

ইতিমধ্যে কয়েক মাস পার হয়ে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি ভালো হওয়ার সঙ্গে ইস্টারের ছুটি আসন্ন হলো এপ্রিল মাসে। আবার গোল্ডকোস্ট যাওয়ার পরিকল্পনা। আবারও সব বুকিং দেওয়া হলো। সবকিছু আগের মতোই। একই ভাবে। শুধু ডিসেম্বরের জায়গায় এপ্রিল। এ সময়ও বিধিবাম। ভ্রমণের আগে আগে আবারও করোনাভাইরাস পরিস্থিতির অবনমন হলো। আগের মতো একইভাবে আবারও ভ্রমণ বাতিল করতে হলো।

৩.

স্নোয়ি মাউন্টেন ক্যানবেরা থেকে দক্ষিণ দিকে নিউ সাউথ ওয়েলস অঙ্গরাজ্যে। অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ চূড়া মাউন্ট কোসিউস্কো এই স্নোয়ি মাউন্টেন রেঞ্জেরই অংশ। স্নোয়ি মাউন্টেন জুন-জুলাই-আগস্ট মাসে ভ্রমণকারীদের জন্য অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান, মূলত বরফের ওপর স্কি করার জন্য। এর সঙ্গে স্নো নিয়ে বাচ্চাদের খেলা, স্নোর ওপর ঘুরে বেড়ানোর জন্য। বছরে কমপক্ষে একবার পরিবার নিয়ে রুটিন কাজকে দূরে ঠেলে আনন্দঘন কিছু সময় কাটানোর একটা সুন্দর জায়গা এটি। ইতিমধ্যে জুন মাস শুরু হলেও এ বছর ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করাটা তখনো বাকি। এ পর্যায়ে প্রতিটি বাড়ির মুখ্যমন্ত্রীরা, মানে ভাবিরা, স্নোয়ি মাউন্টেন ঘুরতে যাওয়ার অগ্রিম পরিকল্পনা করাতে আমাদের ছেলেদের কাজ অনেক হালকা হয়ে গেল। ভ্রমণের তারিখ জুন মাসের ২৬। পাঁচ পরিবার একসঙ্গে। মজা করার আর কী লাগে! স্নোতে খেলার জন্য টুকটাক যেসব পোশাকের দরকার, সেগুলোও কেনা শেষ। বরাবরের মতোই বাচ্চাদের আনন্দের যেন শেষ নেই। আগের দুবার করোনাভাইরাস পরিকল্পনা ভেস্তে দিলেও এবার তারাও খুব আশাবাদী। কারণ, স্নোয়ি মাউন্টেন ক্যানবেরা থেকে গোল্ডকোস্টের দূরত্বের চাইতে অনেক কাছে। মাত্র ২০০ কিলোমিটারের মতো দূরে অবস্থিত। এক দিনের ভ্রমণ মাত্র। করোনা পরিস্থিতিও খুব খারাপ নয়। করোনা ধরার আগেই পালিয়ে আসা যাবে, এমন মনোভাব। কিন্তু সফরসঙ্গী দুই পরিবারের বাচ্চারা পরপর দুই সপ্তাহে অসুস্থ হওয়ার কারণে ঘুরতে যাওয়াটাও দুই সপ্তাহ পিছিয়ে জুলাই মাসের ১০ তারিখ করা হলো। কিন্তু হায়! পুড়লে কপাল, হয় কি আর সকাল! ঘুরতে যাওয়ার ঠিক দুই দিন আগে পার্কে খেলতে গিয়ে গোড়ালিতে মোচড় খেল ছেলেটা। কোনোভাবেই পা ফেলতে পারে না সে। চিকিৎসক দেখানো হলে কয়েক দিন পুরো বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দিলেন। বাকি বন্ধুরা আমাদের ছাড়া যেতে না চাইলেও পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে আমাদের অনিশ্চয়তার কথা জেনে শেষ পর্যন্ত তাঁরা ঘুরতে যেতে রাজি হলেন।

আমাদের বাচ্চারা তাদের বন্ধুদের সঙ্গে স্নোতে খেলা মিস করায় শুধু অশ্রু ঝরিয়ে গেল।

এক সপ্তাহ পর ছেলের গোড়ালির ব্যথা কিছুটা ভালো হলে প্রতি সপ্তাহেই স্নোয়ি মাউন্টেনে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করে গেলাম। কিন্তু কপাল আর খুলল না। কপাল খারাপ হলে নাকি গাছের যে ডালই ধরা যায়, সেটাই ভাঙে। আমাদের অবস্থাও তা–ই। প্রতি সপ্তাহের শেষেই স্নোয়ি মাউন্টেন এলাকাজুড়ে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার পূর্বাভাস—অত্যাধিক বৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়া, বন্যা। এভাবে পুরো জুলাই শেষ হয়ে আগস্ট মাসের প্রায় এক–তৃতীয়াংশও শেষ। নিজে অনেক খেলাধুলার মধ্য দিয়ে বড় হওয়ার কারণে ম্যাচ ছেড়ে দেওয়াটা সহজে মনের মধ্যে আসে না। জেদটা আরও বেড়ে যায় না হওয়াকে হওয়ানোর জন্য। মনে ভাবি, আগস্ট শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহের শেষেই চেষ্টা চলতে থাকবে।

ইতিমধ্যে ক্যানবেরার চারদিকে নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যে মহামারি আকার ধারণ করেছে করোনাভাইরাস। পরিস্থিতি দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। আর ক্যানবেরার চারদিকে নিউ সাউথ ওয়েলস বলে ক্যানবেরাতে করোনাভাইরাসের নতুন কেস শুধু সময়ের ব্যাপার, তা–ই হলো। ক্যানবেরাতে করোনাভাইরাসের ডেলটা ভেরিয়েন্টের একটা কেস ধরা পড়ল। ধরা পড়ার প্রথম দিনই ক্যানবেরায় সরকার কর্তৃক বিধিনিষেধ ঘোষণা করা হলো। স্নোয়ি মাউন্টেনে ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছা, পরিকল্পনা, জেদ—সব পরাজিত হলো করোনাভাইরাসের কাছে। সেই বিধিনিষেধ এখনো চলছে এবং ঘোষণা অনুযায়ী আপাতত ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে।

default-image

৪.

জেলখানায় কখনো যাওয়া হয়নি, থাকা হয়নি। মনে হচ্ছে জেলখানাকেই প্রতিটা বাড়িতে নিয়ে এসেছে এই বিধিনিষেধ। তার তিক্ত স্বাদ সবাইকে পাইয়ে দিচ্ছে। বাসা আর অফিসের মধ্যের দেয়াল করোনার লালায় তলিয়ে গেছে। বাসাটাই এখন অফিস হয়েছে। শুক্রবার এলে মনের মধ্যে সপ্তাহের শেষে দুই দিন ছুটি কাটানোর আনন্দের যে ঢেউ খেলা করত, সেটা হারিয়ে গেছে। অফিস সময়ের বাইরে বাংলা নাটক ও সিনেমা দেখা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটানোটা নিত্যদিনের বিষয় হয়েছে। বাচ্চাদের স্কুলও হয়েছে বাসাতেই। অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে তাদের লেখাপড়াটা কোনোভাবে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। মোবাইল, টেলিভিশন, ল্যাপটপ সঙ্গী হয়েছে বাচ্চাদের। লুডু, ক্যারম, ইউনো খেলে সময় অতিবাহনের চেষ্টা অবিরত।

সরকার কর্তৃক অনুমোদিত দিনে দুই ঘণ্টা ব্যায়ামের সময় বাচ্চাদের নিয়ে বাসার পাশে বের হয়ে হাঁটাহাঁটি করা, সাইকেল চালানো, প্রকৃতি দেখে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাসায় ফিরে আসাটা দৈনন্দিনের রুটিন হয়েছে। মাস্ক নামক মোটা মলাটের ক্ষুদ্র ছিদ্র দিয়ে নাকের মধ্যে অক্সিজেন প্রবাহের অভিজ্ঞতা হচ্ছে। বেঁচে থাকার জন্য দুর্দিনে দরকারি শক্ত মানসিকতার বড় পরীক্ষা চলছে। দিনগুলো পার হচ্ছে স্রোতের বিপক্ষে সাঁতার দিয়ে। এর মধ্যে বন্ধুদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে ফোনে কথা বলা, ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে দেখা ও মনের ভাব আদান–প্রদানের মাধ্যমে মানসিক চাপকে দূরে ঠেলে রাখার চেষ্টা অবিরত। বোঝা গেল, কোনো জেলখানাই সুখকর নয়। মানুষ মাত্রই আবেগপ্রবণ। কমবেশি প্রত্যেকটা মানুষই আবেগ দিয়ে পরিচালিত। যখন দেখা যায় কনকনে শীতকে ঠেলে বাইরে বসন্ত এসেছে, গাছে ফুল ফোটা শুরু হয়েছে, নীল আকাশ হাসছে, ঝিরঝির আরামদায়ক বাতাস বইছে, তখন মনে এই জেলখানার চাপ আরও বেড়ে যায়। আহা! মাত্র বছর দুয়েক আগে এই সময়ে কত না বসন্ত অবগাহন হয়েছে।

৫.

কয়েক মাস আগে দেশে কোভিড-১৯ পরিস্থিতির যে অবনতি হয়েছিল, তা আপাতদৃষ্টে কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। মানুষজনও হয়তো আগের থেকে করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে কিছুটা সচেতন। ভালো লাগে, যখন শুনি অনেকেরই কোভিড-১৯–এর টিকা নেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত পরিমাণে যা মোট জনসংখ্যার ১৭ শতাংশের মতো, যাঁরা কমপক্ষে এক ডোজ টিকা নিতে পেরেছেন। যদিও সংখ্যাটা অনেক কম মূলত টিকার অপ্রতুলতার জন্য।

মনে হচ্ছে, করোনাভাইরাস এসেছে একেবারেই না যাওয়ার বা সহজে না যাওয়ার নিশ্চিত পণ করে। সে বহুরূপী হয়ে এসেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের রূপ পরিবর্তন করে ডেলটা ভেরিয়েন্ট হয়ে আরও সংক্রামক হয়েছে। সামনে আরও কী কী রূপ নেয় সেটিই দেখার বিষয়। তবে সে হয়তো জানে না, মানুষ নামক জীবটি এত বছর ধরে বেঁচে আছে তার বুদ্ধিমত্তাকে ক্রমাগত সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন করে। শত বছর আগে স্প্যানিশ ফ্লু নামক প্রাণঘাতী ভাইরাসও মানুষকে নিশ্চিহ্ন করতে পারেনি। করোনার বিপক্ষে বেঁচে থাকার জন্য মানুষের শারীরিক, আর্থিক অবস্থাসহ শক্ত মানসিকতার এক চূড়ান্ত পরীক্ষা চলছে নিঃসন্দেহে। অনেক জটিল বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে সবার প্রতিক্ষণ অতিবাহিত হচ্ছে। এটি যেন বিজ্ঞানের কোনো স্বীকৃত আবিষ্কারের জন্য ৫ সিগমা (5 Standard Deviation) ডেটা বিশ্লেষণের চাইতেও কঠিন। এসব সত্ত্বেও করোনা ইতিমধ্যে বুঝতে শুরু করেছে যে মানুষ তার বুদ্ধিমত্তা ও বিশ্লেষণী শক্তি দিয়ে তার বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা তৈরি করে ফেলেছে। মানুষ আস্তে আস্তে ৭০–৮০ শতাংশ ভ্যাকসিনেশনের মাধ্যমে হার্ড ইমিউনিটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে অস্ট্রেলিয়াও হার্ড ইমিউনিটির পরিসীমার মধ্যে ঢুকে যাবে হয়তো। করোনাভাইরাস এভাবেই একসময় নিশ্চয় নির্মূল হবে সারা পৃথিবী থেকে। আজকের দিনটা করোনার হলেও আগামীটা নিশ্চিত আমাদেরই হবে! মানুষেরই হবে!

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন